সিংহ শয্যার গৌতম বৌদ্ধের সোনারাঙা মূর্তি

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৮, ২০২৩; সময়: ১২:০৮ pm |
সিংহ শয্যার গৌতম বৌদ্ধের সোনারাঙা মূর্তি

জাবেদ আবেদীন শাহীন, কক্সবাজার : প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে নির্মিত রামু বৌদ্ধ বিহারের নজরকাড়া দর্শনীয় স্থান দিন দিন পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে। ভ্রমন পিপাসু প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে মন ছুঁয়ে দেওয়ার মত মুগ্ধকর দর্শনীয় স্থান এটি ।

শুধু দেশের পর্যটকদের জন্য নয়, বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের কাছে এখন কক্সবাজারের রামুর ১০০ ফুট দৈঘ্যর্ বিশিষ্ট বুদ্ধমূর্তি ও ভাবনা কেন্দ্র অত্যন্ত পছন্দের একটি। যেখানে পাখির কুহুতান, সবুজের মাখামাখি আর অসংখ্য নৃগোষ্ঠী এই জনপদকে দিয়েছে ভিন্ন এক রূপ। এখানকার প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অদেখা এক ভূবন বিশেষ করে পর্যটকদের জন্য অপেক্ষা করছে নয়নাভিরাম দৃশ্যপট।

রামু কক্সবাজারের একটি উপজেলা। জেলা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার কম দূরত্ব হওয়ায় পর্যটকরা সকাল-সন্ধ্যা ছুটে যান রামুর বৌদ্ধ মন্দির ও ১০০ ফুট সিংহ শয্যা বুদ্ধ মূর্তি অবলোকন দেখতে। ঘুরে দেখার মনে ইচ্ছে জাগলে কক্সবাজার শহর থেকে মাইক্রোবাস, সিএনজি, অটো রিকসা, ব্যাটারী চালিত টমটমে করে রামু বৌদ্ধ বিহারে যাওয়া যায়। রামু রাবার বাগান স্টেশন থেকে সোজা পশ্চিমে (চা-বাগান) এ বৌদ্ধবিহারটি অবস্থিত। ভাড়া হবে জনপ্রতি ৪০ টাকা। আর রিজার্ভ গেলে ভাড়া পড়বে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। রিজার্ভ মাইক্রো হাজার ১২০০টাকা।

বুদ্ধের এই মূর্তিটি কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার উত্তর মিঠাছড়ি গ্রামের বৌদ্ধবিহারে অবস্থিত। ঘড়ির কাটা ১১.০৫ মিনিট। কাধে ব্যাগ, ক্যামেরা নিয়ে গন্তব্যেস্থলে পৌছলাম শনিবার। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ বৌদ্ধবিহারের মূল গেইট দিয়ে প্রবেশ করে জুতা রেখে নগ্ন পায়ে সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গেলাম। ৮৮ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই দেখা মিলবে ভাবনাকেন্দ্র বিহারে উঠানে স্থাপন করা হয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম ১০০ ফুট দৈর্ঘের সিংহশয্যার গৌতম বৌদ্ধের মূর্তি। ডান হাতের কনুইয়ের ভর করে হাতে মাথা রেখে দুই পা টান করে কাত হয়ে বিশ্রামরত শুয়ে আছেন।

চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন সব প্রাণীর প্রতি সুদৃষ্টি রেখে আশীর্বাদ দিচ্ছেন। এ সময় অনেক পর্যটককে দেখা গেল ১০০ফুট দৈর্ঘ্যরে সোনারঙা বুদ্ধমূর্তিটির ছবি তুলতে। বিহার প্রাঙ্গনের চারপাশের পরিবেশ নানা ফুল-ফলের গাছ রোপণে বিহারের সৌন্দর্য যেন আরো বেড়েছে। ছুটি কিংবা বিশেষ দিনে এর সুন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য অন্যতম হচ্ছে স্থানটি । বলার চেয়ে ভ্রমন পিপাসুরা নিজ চক্ষে অবলোকন করলে এখানকার পরিবেশ চিত্রানুগ মনে হবে।

বিশালাকৃতির এই মূর্তি স্থাপন প্রসঙ্গে শ্রীমৎ করুণাশ্রী ভিক্ষু বলেন, অহিংসা, সাম্য ও মৈত্রীর বাণী নিয়ে বৌদ্ধ জাতিকে আলোর পথ দেখান মহামানব গৌতম বুদ্ধ। তিনি শান্তির প্রতীক, বৌদ্ধদের পথ প্রদর্শক। তাই এ মূর্তির নাম দেওয়া হয়েছে বিশ্বশান্তি সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তি। ২০০৬ সালে সোনালি রঙের বৌদ্ধমূর্তিটি একেবারেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরির কাজ শুরু করি নিজেই। ২০০৯ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হয়। পাশ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের কারিগর থোয়াইংছি রাখাইন দীর্ঘ সাড়ে তিনবছর কাজ করে বৌদ্ধমূর্তিটি তৈরি করেন।

প্রায় কোটি টাকা খরচে নির্মিত এটি। এটি এশিয়ার সর্বৃহৎ বৌদ্ধ মূর্তি যার দৈর্ঘ্য ১০০ফুট এবং উচ্চতা ৬০ ফুট। এটি দেখতে প্রায় সময় শ্রীলঙ্কা, বার্মা, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশের লোকজন ছুটে আসেন। প্রায় দুই একর জায়গায় ২০০২ সালে বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র বৌদ্ধবিহারটি প্রতিষ্ঠা হয়। ২০১২ সালে রামু সহিংসতার পর প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় বৌদ্ধ বিহারটি পুনঃনির্মাণ করা হয়।

সোনালি রঙে কেন বৌদ্ধমূর্তিটি তৈরি এর কারণ জানাতেই তিনি বলেন, সোনা মূল্যবান ও সবচেয়ে বেশি দামি। বৌদ্ধ যেহেতু সবচেয়ে মহান তাই এই সোনার রঙেই বুদ্ধের মূর্তিটি রঙিন করে বানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে, ছবি তোলা এক ফাঁকে নিজের পরিচয় দিয়ে গাছের ছায়ার নীচে বসে আলাপচারিতায় মেতে উঠি, ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ইমতিয়াজ আহম্মদ তার পরিবার নিয়ে দেখতে এসেছে তিনি বলেন , টিনা ৩দিনের ছুটি হওয়ায় গত শুক্রবার কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছি। পরে শনিবার রামুতে এসেছি। তিনি বলেন, ১০০ফুট মূর্তিটি বিশাল সোনারঙা বুদ্ধমূতিটি দেখার অনেক শখ ছিল। ছায়াঘেরা সবুজের মাঝে চমৎকার পরিবেশ।

এই বৌদ্ধ মন্দির দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক পর্যটক এসেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় কোন হৈ চৈ নেই, পরিবেশটা কত শান্ত। সবার মত এই বৌদ্ধমূর্তিটির সঙ্গে আমরাও কিছু স্মৃতি রাখতে ছবি তুলেছি। বিহারের চারিদিকে ঘুরে ফিরে দেখেছি। এখানকার দায়িত্বে থাকা একজন ভিক্ষুকের থেকে অনেক কিছু অজানা তথ্য জানলাম। কখনও সময় সুযোগ হলে আবার আসার কথা জানাল তিনি।

স্থানীয বাসিন্দা মিলন বড়ুয়া, দীপঙ্কর বড়ুয়া, প্রেমা বড়ুয়া, অধীর বড়ুয়ার কাছে এখন অতীত কেবলই স্মৃতি, তারা বলেন , রামুতে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কালরাতে ঘটে গেছে এক ধ্বংসযজ্ঞ। যে ধ্বংসযজ্ঞে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে রামুর প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী বারটি নিদর্শন। পুড়ে গেছে মহামূল্যবান বুদ্ধের ধাতু, তাল পাতার উপর বিভিন্ন ভাষায় লেখা ত্রিপিটক, অনেকগুলো বুদ্ধমূর্তিসহ প্রাচীন প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনসহ হাজার বছরের গর্বের ধন-সম্প্রীতি।

তারা আরো বলেন, রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার,উত্তর মিঠাছড়ি বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র, রামু মৈত্রী বিহার, লাল চিং, সাদা চিং,অপর্ণাচরণ চিং, জাদী পাড়া আর্য্যবংশ বৌদ্ধ বিহার,উখিয়াঘোনা জেতবন বৌদ্ধ বিহার, উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বন বিহার, চাকমারকুল অজান্তা বৌদ্ধ বিহারসহ নব নির্মিত এসব বৌদ্ধ বিহার যেন এখন নতুন ইতিহাস। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রচেষ্টায় মাত্র এক বছরে বদলে যায় রামুর দৃশ্যপট। বিশেষ করে, বিহারে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনে যেন সমস্যা না হয, সে ব্যাপারে দর্শনার্থীরা যেন সজাগ থাকে।

রামু কেন্দ্রীয সীমাবিহারের আবাসিক পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ১০০ ফুট দৈর্ঘর বিশিষ্ট বুদ্ধমূর্তিটি দেখতে শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশের পর্যটকরা নিয়মিত আসেন এখানে। এই বৌদ্ধবিহার ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পরিদর্শনে সারাবছর দেশী ও বিদেশী পর্যটকর সরব উপস্থিতি চোখে পড়ে। কক্সবাজার পর্যটন নগরী হওয়ায় পর্যটকদের কাছে এগুলোর আকর্ষণও বেশী থাকে। তবে সরকারের পৃষ্টপোষকতায় প্রাচীন নিদর্শনবৌদ্ধ পূরার্কীতিগুলো রক্ষনাবেক্ষন করার উদ্যোগ নিলে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা রাখবে ।

রামুর কেন্দ্রীয সীমাবিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তরুণ বডুয়া বলেন, রামুতে দেশি-বিদেশি পর্যটকের ঢল নামে। নবরূপের সজ্জিত রামুর বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে দেশিবিদেশি পর্যটকদের উচ্ছ্বাসের কমতি নেই, এই বৌদ্ধ বিহারগুলো দেখার জন্য প্রতিদিনই বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ এখানে আসছেন। শীতের সময়টাতে পর্যটকদের আনাঘোনা বেশী থাকে। এই বৌদ্ধবিহারের চমৎকার নির্মাণ শৈলী দারুনভাবে করা বিশেষ করে একশ ফুট দীর্ঘ বিশালাকার বুদ্ধমূর্তিটি। রামুতে গৌতম বুদ্ধের সিংহ শয্যা ছাড়াও আরো ২৫টি বৌদ্ধ মন্দির ও প্যাগোডা রয়েছে। যা হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য বহন করে আছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে