ডিবির ‘ডিপ ফ্রিজে’ বিএম ডিপোর মামলা

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩, ২০২৩; সময়: ৯:৫৯ am |
ডিবির ‘ডিপ ফ্রিজে’ বিএম ডিপোর মামলা

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : প্রায় চার দিন স্থায়ী ওই অগ্নিকাণ্ডে নিভে গেছে ৫১ জনের প্রাণ। হাসপাতালের মর্গে এখনও পড়ে আছে মরদেহের ১০টি অংশ। শনাক্ত না হওয়ায় সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা যায়নি। একই ঘটনায় অঙ্গহানি হয়েছে অনেকেরই। সবমিলিয়ে ফায়ার সার্ভিসকর্মী ও ডিপোতে কর্মরত দুই শতাধিকের বেশি শ্রমিক আহত হয়েছিলেন।

সীতাকুণ্ডের আলোচিত বিএম ডিপোর আগুনের ঘটনাটি চট্টগ্রামের স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ বলে ধরা হচ্ছে।

দেশজুড়ে আলোচিত ওই ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের হয়। তবে, মামলার কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি থানা পুলিশ। শেষে মামলাটি তদন্তের জন্য জেলা গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) স্থানান্তরিত হয়। সেখানেও মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ঘটনার প্রায় সাত মাস পার হলেও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ঠিক কবে নাগাদ তদন্ত কার্যক্রম শেষ হতে পারে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর নেই তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। শুধুমাত্র ‘তদন্ত চলমান আছে’ বলে কোনোমতে দায় সারছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফলে আলোচিত মামলাটি আদৌ আলোর মুখ দেখবে কি না-তা নিয়ে সংশয় আইনজীবী ও বিশিষ্টজনদের। তাদের মতে, যাদের অবহেলায় এত প্রাণ হারাল, অথচ মামলায় তাদের কাউকেই আসামি করা হয়নি। এতে শুরু থেকে গলদ তৈরি হয়েছে। আবার নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে পুলিশের ইচ্ছা আছে কি না- সেই প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। কারণ, ঘটনার সাত মাস পার হলেও মামলাটির তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। সবমিলিয়ে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার, না কি লোক দেখানো বিচার পাবে— সেই প্রশ্নও অনেকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

গত বছরের ৪ জুন রাতে সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় অবস্থিত বিএম ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুন লাগার ঘণ্টা খানেকের মধ্যে সেখানে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এরপর টানা ৮৬ ঘণ্টা আগুন জ্বলতে থাকে। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

ওই দুর্ঘটনায় আশপাশে থাকা ফায়ার সার্ভিসকর্মী ও শ্রমিকসহ ৫১ জন নিহত হন। এছাড়া আহত হন প্রায় দুই শতাধিক। পাশাপাশি ১৫৬টি আমদানি-রপ্তানি কনটেইনার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার পরপরই বন্ধ করে দেওয়া হয় ডিপোর কার্যক্রম। এরপর আলাদাভাবে ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করে প্রশাসন, বন্দর কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে সীতাকুণ্ড থানায় ডিপোর আট কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করা হয়।

পুলিশের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন সীতাকুণ্ড থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আশরাফ সিদ্দিকী। ওই মামলায় ডিপোর জিএম (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) নাজমুল আকতার খান, ডিজিএম (অপারেশন) নুরুল আকতার, ম্যানেজার (অ্যাডমিন) খালেদুর রহমান, সহকারী অ্যাডমিন অফিসার আব্বাস উল্লাহ, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মো. নাসির উদ্দিন, সহকারী ব্যবস্থাপক (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) আবদুল আজিজ, কন্টেইনার ফ্রেইট স্টেশনের ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম ও সহকারী ডিপো ইনচার্জ নজরুল ইসলামকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ডিপোটিতে অন্যান্য সাধারণ কনটেইনারের পাশাপাশি ড্রামভর্তি কেমিক্যাল ছিল। অগ্নিকাণ্ডের কিছুক্ষণের মধ্যেই কেমিক্যালের কারণে বিস্ফোরণ হয় এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলেও তাদের কেমিক্যালের বিষয়টি জানানো হয়নি। এতে সাধারণ আগুন ভেবে পানি দিয়ে তা নেভানোর চেষ্টা করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। যার কারণে আগুন নেভেনি এবং উল্টো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

বিস্ফোরণে আশপাশের দুই-তিন কিলোমিটারের মধ্যে থাকা অনেক ভবনের কাচ টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে। আগুন নেভাতে যথেষ্ট সময় লাগে, এমনকি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও বাড়ে। এছাড়া ডিপোর দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও কর্তব্যরতদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়।

বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন চট্টগ্রাম জেলা ডিবির পরিদর্শক মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী। বুধবার (২৮ ডিসেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে তাকে ফোন করা হয়। পরে তিনি ছুটিতে আছেন জানিয়ে আরও ১০ দিন পর যোগাযোগ করতে বলেন। তবে একইদিন দুপুর ১টার দিকে জেলা ডিবির কার্যালয়ে গেলে তাকে পাওয়া যায়। যদিও তিনি ছুটিতে আছেন এবং একটি কাজে অফিসে এসেছেন বলে দাবি করেন।

এসময় আবার মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার আগে এই মামলাটি অনেকে তদন্ত করেছেন। আমার হাতে আসছে মাসখানেক হলো। তবে এতে নতুন করে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। মামলায় বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। আসামিরা পলাতক রয়েছেন।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানতে ফায়ার সার্ভিসের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। তারা এখনও দেয়নি। ফরেনসিক রিপোর্ট কিছু পাওয়া গেছে, আর কিছু পেন্ডিং আছে। যথাযথ নিয়মে মামলার তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি হচ্ছে। কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হতে পারে-জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, এটি নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

মামলার প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, বিএম ডিপোতে যাদের অবহেলায় অগ্নিকাণ্ড হয়েছে তাদের কাউকে আসামি করা হয়নি। মামলার নামে একধরনের ‘আইওয়াশ’ করা হয়েছে। ডিপোতে কেমিক্যাল থাকায় তাতে হতাহতের ঘটনা অবধারিত ছিল। যারা কেমিক্যাল রেখেছেন অর্থাৎ ডিপোর নিয়ন্ত্রকদের কাউকে মামলার আসামি করা হয়নি। কারণ, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের হাত রয়েছে।

‘দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতরা রাষ্ট্রের তেমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন। তাই আমার মনে হয় না তারা ন্যায়বিচার পাবেন। লোক দেখানো বিচার পায় কি না-তেমন সন্দেহও রয়েছে। আমার মনে হয় না ঘটনাটি নিয়ে পুলিশও সঠিকভাবে তদন্ত করবে। সবমিলিয়ে এ মামলা আলোর মুখ দেখে কি না, যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।’

এদিকে, মামলার কোনো অগ্রগতি না হলেও দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) গঠিত তদন্ত কমিটি। জুন মাসের শেষ সপ্তাহে দাখিল করা ওই প্রতিবেদনে দায়িত্বে অবহেলার জন্য ডিপো কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়। চবকের টার্মিনাল ম্যানেজার কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিটি ২৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি তৈরি করেন। প্রতিবেদনে ডিপোতে ফায়ার হাইড্রেন্ট না থাকা, বিপজ্জনক ও রাসায়নিক দ্রব্য হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনা দুর্বল এবং ডিপোর কর্মীরা যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত ছিলেন না বলে উল্লেখ করা হয়।

অগ্নিকাণ্ডের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া বিএম ডিপোর নানা সংস্কার করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সংস্কার কার্যক্রম শেষে গত বছরের ২২ আগস্ট ডিপোটিতে শুধুমাত্র খালি কনটেইনার সংরক্ষণের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২৫ অক্টোবর নয়টি শর্তারোপ করে সেখানে রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এর কয়েক দিনের মাথায় ১৩ ডিসেম্বর ডিপোতে ফের আগুনের ঘটনা ঘটে। তবে, সেবার কোনো হতাহত ছাড়াই দুই ঘণ্টার মধ্যে আগুন নেভাতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে