সৈকতে প্লাস্টিক দানবের রুদ্রমূর্তি

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২০, ২০২২; সময়: ৬:৫৫ pm |
সৈকতে প্লাস্টিক দানবের রুদ্রমূর্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার : দিন দিন এই প্রাকৃতিক সম্পদ প্লাস্টিকের মতো ভয়াবহ দূষণের গ্রাসে পরিণত হচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। প্লাস্টিক এমন একটি রাসায়নিক, যা পরিবেশের সঙ্গে মিশ্রিত হতে বা কারখানায় পুনর্ব্যবহার করতে দীর্ঘ সময় নেয়। বিভিন্ন প্লাস্টিকের সামগ্রী, বিশেষত পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিকের বোতল, গৃহস্থালির প্লাস্টিক কিংবা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহƒত প্লাস্টিকগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশে পুনর্ব্যবহার না করে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে সমুদ্র দূষণ।

তাইতো প্লাস্টিক মানুষ ও প্রকৃতির জন্য হুমকি-এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে নির্মিত জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সহায়তায় সৈকতের সীগাল পয়েন্টে প্রদর্শিত হয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্যে তৈরী বিশাল আকৃতির দানব। সৈকতে দাঁড়িয়ে এই দানব প্লাস্টিক দূষণে প্রাণ-প্রকৃতির বিরূপতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

প্লাস্টিক বর্জ্যরে দূষণে বিপর্যস্ত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের পরিবেশ। এইসব পণ্য ব্যবহারের পর শেষ গন্তব্য যেন সমুদ্র সৈকত। তাই সবচেয়ে বেশি দায়ী, ওয়ান টাইম প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার। বর্তমানে প্লাস্টিক দূষণ মানবস্বাস্থ্যের সঙ্গে সঙ্গে সামুদ্রিক পরিবেশের জন্যও মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভয়াবহ পরিস্থিতির শঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে সারা দেশ থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ বেড়াতে আসে। তবে ছুটির দিন আর পর্যটন মওশুমে লক্ষাধিক মানুষের আগমন ঘটে। কিন্তু তাদের ফেলে যাওয়া ময়লায় সৈকতের পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর হচ্ছে প্রতিদিন। বিশেষ করে চিপসের প্যাকেট থেকে শুরু করে নানা প্লাস্টিক বর্জ্য, কাঁচের বোতল, ছেঁড়া জুতা, ছেঁড়া জালসহ নানা আবর্জনা যত্রতত্র ফেলায় মারাত্ন ক্ষতি হচ্ছে সৈকতের পরিবেশ। প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে স্বাভাবিক রঙ হারাচ্ছে সাগরের পানি। ফলে সৈকত দিন দিন সৌন্দর্য হারাচ্ছে আর হুমকির মুখে পড়েছে সাগরের জীববৈচিত্র্য।

এদিকে, সোমবার সকালে সৈকতে সরেজমিনে দেখা যায়, সৈকতের সীগাল পয়েন্টের বালিয়াড়ীতে বলিষ্ঠ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে ভয়ংকর এক দানব। সমুদ্র বালুচরে প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে বানানো ৪২ ফুট উচ্চতার হয়েছে বর্জ্য দানব। এটা বানাতে সময় লেগেছে ৭ দিন। প্লাস্টিক ব্যবহৃত দানবটি রক্ত-মাংসহীন প্রতীকি হলেও যার হিং¯্র থাবায় প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত মানবদেহ, প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য। দানবটির দেহাবয়বে বয়ে বেড়ানো প্লাস্টিক দূষণে প্রাণ-প্রকৃতির ক্ষতির মাত্রা। সৈকতেই আগত পর্যটকরা এ প্লাস্টিকের তৈরি দানব টি দেখছন।

আয়োজক বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের দায়িত্বরত স্বেচ্ছাসেবক নেছার আহম্মদ জানান, প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজার সৈকতে ভ্রমণ করতে প্রতিদিনই সমাগম ঘটে লাখো পর্যটকের। যারা সৈকতের বালিয়াড়ী ও সাগরের পানিতে ফেলছে প্লাস্টিক পণ্য সামগ্রীর বর্জ্য। এতে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে দূষণ এবং হুমকির মুখে পড়ছে সামুদ্রিক জীব ও মানবজীবন। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের বিষয়ে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের একদল স্বেচ্ছাসেবী গেল কয়েক দিন ধরে কক্সবাজার সৈকতে প্রচারণা চালিয়ে বর্জ্য সংগ্রহে ব্যাপক সাড়া পেয়েছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ভাষ্কর্য্য শিল্পী আবীর কর্মকার জানান, বিদ্যানন্দের ভিন্নধর্মী উদ্যোগ প্লাস্টিক দানবটি তৈরী করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের একদল শিল্পী। উচ্চতা ৩৮ ফুট ও প্রস্থ ১৪ ফুটের প্লাস্টিক দানবটি তৈরি করতে ১৬ জন লোকের ৭ দিন লেগেছে। সৈকতের বিভিন্ন স্থান থেকে ময়লা সংগ্রহ করে এটি তৈরি করা হয়েছে। এতে প্লাস্টিক বর্জ্যরে পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে কাঠ, পেরেক ও আঁটা (গাম) সহ আরও কয়েকটি উপকরণ। ভাষ্কর্য্য শিল্পীদের দাবি, এটি এশিয়া মহাদেশের সর্বোচ্চ প্লাস্টিক দানব।

কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটক ইকবাল হাসান, ইকরাম আলী মনছুর আলমসহ অনেকে জানান, এটি দেখতে এসে মানুষ দৈত্য-দানবের ভয়ংকর রূপের মত প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন হবেন। পাশাপাশি নিজেরাও প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে সজাগ থাকবেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী জানে আলম বলেন, কক্সবাজার সৈকতে বেড়াতে নামলে ময়লা আবর্জনা চোখে পড়ে। কিন্তু এই প্লাস্টিক দানবটি প্রদর্শনী হওয়ায় সবাই এখন নিজ নিজ গিয়ে নির্দিষ্ট বক্সে ময়লা ফেলছে। এতে করে সৈকত এখন আর্বজনহীন হয়ে উঠেছে । যারা এমন উদ্যোগ নিয়েছে তারে ধন্যবাদ জানাই।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজারে প্রতি বছর পর্যটন মৌসুমে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। তখন সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ-প্রতিবেশ হুমকিতে পড়ে। হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে সাগরের নীল জল। প্লাস্টিক বর্জ্যে বিপন্ন হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণী। মারা পড়ছে গভীর সমুদ্র থেকে ডিম পাড়তে আসা মা কচ্ছপ, দ্বীপের চতুন্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাল-শৈবাল। এমন অবস্থায় দ্বীপের প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। বিদ্যানন্দের ভিন্নধর্মী এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এতে মানুষ প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত হবেন। বিদ্যানন্দের মত অন্যান্য সংগঠন ও সংস্থাগুলোকে এ ধরণের কর্মকান্ডে এগিয়ে আসার আহবান তাদের।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান জানান, প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশের জন্য হুমকি। তাই সবাই যত্রযত্র প্লাস্টিক বর্জ্য না ফেলে এখানে এসে যেন ফেলে এবং পরিবেশ সুন্দর রাখে, সেই মেসেজ দিতে দানবটি তৈরি করা হয়েছে। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় যে কোন মহৎ উদ্যোগে প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে। বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটক ও স্থানীয়দের মাঝে প্লাস্টিক বর্জ্যরে দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে ভিন্নধর্মী এ উদ্যোগ।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে