প্রায় সাড়ে চারশ বছরের প্রাচীন পুরাকৃতি কুসুম্বা মসজিদ

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৬, ২০২২; সময়: ১২:৪৯ pm |
প্রায় সাড়ে চারশ বছরের প্রাচীন পুরাকৃতি কুসুম্বা মসজিদ

মনীষা আক্তার :  প্রায় সাড়ে চারশত বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে সুলতানি আমলের এই পুরাকীর্তি। বর্তমানে এটি পাঁচ টাকার নোটে মুদ্রিত। যা নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলায় অবস্থিত। রাজশাহী মহাসড়কের মান্দা ব্রিজের পশ্চিম দিকে ৪০০ মিটার উত্তরে অবস্থিত সুলতানি আমলের এই নিদর্শনটির নাম কুসুম্বা মসজিদ।

কুসুম্বা মসজিদ সবরখান বা সোলায়মান নামে ধর্মান্তরিত এক মুসলমান মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের দুটি শিলালিপির প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে মানুষের মনে অনেক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। তবে মূল প্রবেশপথে শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয়, এই মসজিদটি ৯৬৬ হিজরি বা ১৫৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি। শের শাহের বংশধর আফগান সুলতান প্রথম গিয়াস উদ্দীন বাহাদুরের শাসনামলে (১৫৫৪-১৫৬০ সালে) নির্মিত। সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে তার মন্ত্রী বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা রামন দল ৯০৪ হিজরি বা ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন।

কুসুম্বা মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৫৮ ফুট লম্বা, ৪২ ফুট চওড়া। চারদিকের দেয়াল ৬ ফুট পুরু। তার ওপর বাইরের অংশ পাথর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। মসজিদের সামনের অংশে রয়েছে তিনটি দরজা। আকারে দুটি বড়, অন্যটি অপেক্ষাকৃত ছোট। দরজাগুলো খিলানযুক্ত মেহরাব আকৃতির। মসজিদের চার কোনায় রয়েছে চারটি মিনার। মিনারগুলো মসজিদের দেয়াল পর্যন্ত উঁচু ও আট কোনাকার। ছাদের ওপর রয়েছে ছয়টি গম্বুজ। যা দুটি সারিতে তৈরি।

কুসুম্বা মসজিদ দ্বিতীয় সারির গম্বুজগুলো আকৃতির দিক দিয়ে ছোট। ১৮৯৭ সালের এক ভূমিকম্পে তিনটি গম্বুজ নষ্ট হয়েছিল। পরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি সংস্কার করে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। এর আরেক নাম কালা পাহাড়।

মসজিদের ভেতর দুটি পিলার রয়েছে। উত্তর দিকের মেহরাবের সামনে পাথরের পিলারের ওপর তৈরি করা হয়েছিল একটি দোতলা ঘর। এই ঘরটিকে বলা হতো জেনানা গ্যালারি বা মহিলাদের নামাজের ঘর। এখানে মহিলারা নামাজ পড়তেন।

মসজিদের ভেতর পশ্চিমের দেয়ালে রয়েছে তিনটি চমৎকার মেহরাবের ওপর ঝুলন্ত শিকল, ফুল ও লতাপাতার কারুকাজ করা। এ কারুকার্যগুলো খুব উন্নতমানের। দক্ষিণ দিকের মেহরাব দুটি আকারে বড়। উত্তর দিকের মেহরাবটি ছোট। মসজিদটির উত্তর-দক্ষিণ দিকে দুটি করে দরজা ছিল। মসজিদের সম্মুখভাগে রয়েছে খোলা প্রাঙ্গণ ও পাথর বসানো সিঁড়ি, যা দিঘিতে গিয়ে নেমেছে। মসজিদের প্রবেশপথের একটু দূরে বাক্স আকৃতির এক খণ্ড কালো পাথর দেখা যায়। এটিকে অনেকে কবর বলে মনে করেন।

মসজিদ সংলগ্ন উত্তর-দক্ষিণ দিকে রয়েছে ৭৭ বিঘার একটি বিশাল দিঘি। দিঘিটি লম্বায় প্রায় ১২০০ ফুট ও চওড়ায় প্রায় ৯০০ ফুট। গ্রামবাসী ও মুসল্লিদের খাবার পানি, গোসল ও অজুর প্রয়োজন মেটানোর জন্য দিঘিটি খনন করা হয়েছিল। এই দিঘির পাড়েই নির্মাণ করা হয়েছে ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ।

মসজিদ ঘুরতে আসা তারেক জামান বলেন,পাঁচ টাকার নোটে এই মসজিদ দেখে এখানে ঘুরতে আসার ইচ্ছা ছিলো অনেক দিনের।অবশেষে আসতে পেরেছি। খুবই ভালো লাগছে।

তিনি আরও বলেন, এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বেশ ভালো। তবে দর্শনার্থীদের জন্য থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। যদি কোন রেস্ট হাউস থাকতো তাহলে আমার মতো যারা দূর থেকে থেকে আসছে তাদের সুবিধা হতো বলে আমি মনে করি

কুসুম্বা মসজিদের মুয়াজ্জিন মাওলানা ইসরাফিল আলম বলেন, প্রতিদিনই দূর দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ আসেন কুসুম্বা মসজিদ দেখতে। এখানে এসে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও নামাজ আদায় করেন। পাশেই দিঘি রয়েছে। তাই ওযু করতেও সমস্যায় পড়তে হয় না। তবে সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় শুক্রবার জুমার সময় বেশি মুসল্লির আগমন ঘটে।

কথা হয় এখানে ঘুরতে আসা হিন্দু দর্শনার্থী জয়া রানীর সাথে। তিনি বলেন,এই মসজিদটিতে মুসলিমের পাশাপাশি অনেক হিন্দুধর্মের লোকজন ও আসে তাদের মনবাসনা পূরণের জন্য । আমি আমার ছেলের জন্যএকটা মানত রেখেছিলাম।সেটাই পূরণ করতে এসেছি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে