খুনির দল যেন আর ক্ষমতায় না আসে : শেখ হাসিনা

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৪, ২০২২; সময়: ১০:৩৬ pm |
খুনির দল যেন আর ক্ষমতায় না আসে : শেখ হাসিনা

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : বিএনপি-জামায়াতকে খুনির দল আখ্যায়িত করে তারা যেন আর ক্ষমতায় আসতে না পারে, সেজন্য দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, “এই বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে আর ছিনিমিনি খেলতে আমরা দেব না। কারণ ওই জামাত-বিএনপি খুনির দল, যুদ্ধাপরাধীর দল, জাতির পিতার হত্যাকারীদের মদদদানকারীর দল। এমনকি আমাকেও তো বারবার হত্যার চেষ্টা করেছে। কাজেই এরা যেন বাংলাদেশের মানুষের রক্ত চুষে খেতে না পারে, আর যেন তারা এদেশে আসতে না পারে।”

রোববার বিকালে বন্দরনগরীর পলোগ্রাউন্ড মাঠে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনের এক বছর বাকি থাকলেও পলোগ্রাউন্ডের এ জনসভা কার্যত নির্বাচনী জনসভায় পরিণত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে শেখ হাসিনা কেন দেশে ফিরেছিলেন, সেই ব্যাখ্যা করেন জনসভায়।

তিনি বলেন, “আজকে বাবা, মা, ভাই- সব হারিয়ে ফিরে এসেছি বাংলার মানুষের জন্য। কেন? এই দেশের মানুষ দুবেলা পেট ভরে ভাত খাবে, তাদের বাসস্থান হবে, চিকিৎসা হবে, শিক্ষা হবে, উন্নত জীবন পাবে, সেজন্য। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনকারী দেশ; সেই বিজয়ী জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে চলব- আমরা যেন সেইভাবে বাংলাদেশকে গড়তে পারি।”

বর্তমান সরকারের আমলেই যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে, সে কথা মনে করিয়ে দেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, আপনাদের সহযোগিতা চাই যে- এই বাংলার মাটিতে আবার যেন ওই যুদ্ধাপরাধী, খুনির দল ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিতে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। তার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভায় বক্তব্য দেন।

জনসভা থেকে চট্টগ্রামের ২৯টি উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন এবং ছয়টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে শেখ হাসিনা বলেন, “এসব উন্নয়ন প্রকল্প আমার কাছ থেকে উপহার।”

চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকার ‘ব্যাপক’ কাজ করেছে এবং আরও প্রকল্প গ্রহণ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, “যাবার আগে শুধু আপনাদের কাছে চাই একটা ওয়াদা। বলেন, আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন। সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। আগামীতে আপনারা ভোট দেবেন নৌকা মার্কায়? হাত তুলে বলেন।” লাখো জনতা সরকার প্রধানের কথায় হাত তুললে তিনি বলেন, “আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”

বিএনপি-জামায়াকে ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, “ওই খুনি, গ্রেনেড হামলাকারী, মানুষ হত্যাকারী- এদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। এদের হাত থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হবে।”

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর বিএনপি-জামাত অগ্নি সন্ত্রাস করে মানুষকে হত্যা করেছে, বোমাবাজি করেছে এবং আওয়ামী লীগ মানুষের কোনো ক্ষতি করতে না দিয়ে বরং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে।

“ওরা ধ্বংস করে, আমরা সৃষ্টি করি। ওরা ক্ষতি করে, আমরা মানুষের মঙ্গল করি। এটাই হচ্ছে বিএনপি আর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তফাৎ। ওদের সাথে যুদ্ধাপরাধী, খুনি; আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাস করে, তাদের সাথে আছি। আমরা শান্তি চাই। আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি। দেশের উন্নতিতে বিশ্বাস করি।”

টানা তিন মেয়াদে সরকারের দায়িত্ব সামলে আসা আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, “আজকে একটানা সেই ২০০৯ থেকে ২০২২ গণতান্ত্রিক ধারা আছে বলেই- আজকে বাংলাদেশ উন্নতি করেছে। আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। এই বাংলাদেশকে আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলব।”

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অধিকার নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আইন করে দিলেও বিএনপি সে আইন বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, জিয়ার জন্ম হয়েছে কলকাতায়। পড়াশোনা করেছে করাচিতে। করাচির থেকে কমিশন পেয়ে সেনাবাহিনীতে ঢুকে বাংলাদেশে পোস্টিংয়ে এসেছিল। কাজেই এরা তো জানার কথা না। আর ওই জ্ঞানও তাদের নাই। একটা তো মেট্রিক ফেল, আরেকটা এইট পাস আর আরেকটা বোধ হয় ইন্টারপাস। এই তো? তারা জানবে কোত্থেকে বাংলাদেশ? আর সমুদ্রসীমা আইন তাইবা জানবে কোত্থেকে? আওয়ামী লীগ সরকারের আসার পর সমুদ্রসীমায় অধিকার নিশ্চিত করেছে বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কেন আদালত সাজা দিয়েছে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “বিদেশ থেকে টাকা এসেছে এতিমের জন্য। সেই এতিমের টাকা এতিমের হাতে আর যায় নাই। সব নিজেরা পকেটস্থ করেছে। তার জন্য ২০০৭ সালে কেয়ারটেকারের সময় মামলা হয়েছে, আর সেই মামলায় ১০ বছরের সাজা।

“আর তার ছেলে একটা তো মারা গেছে যে অর্থ পাচার করেছিল, সিঙ্গাপুর থেকে সেই অর্থ কিছু আমরা উদ্ধার করে আনতে পেরেছিলাম। আর একজন কুলাঙ্গার বানিয়ে রেখে গেছে জিয়াউর রহমান, সে এখন লন্ডনে বসে আছে।”

খালেদার বড় ছেলে তারেক রহমানের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, “সে গেল কেন লন্ডনে? ২০০৭ সালে তখন কেয়ারটেকার সরকারের কাছে ‘আর কোনদিন রাজনীতি করবে না’ বলে মুচলেকা দিয়ে দেশ থেকে চলে গিয়েছিল। দেশ থেকে পালিয়েছিল। আর এখন সেখানে বসে রাজার হালে থাকে আর দেশের ভেতরে যত বোমাবাজি, যত খুনখারাবি, যত রকমের নাশকতার কাজ সেগুলো পরিচালনা করে।”

২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি মিছিলে গ্রেনেড হামলায় ২২ জন নিহত হলেও নেতাকর্মীরা সেদিন মানবঢাল তৈরি করায় নিজে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “সরকারি পৃষ্ঠকোষকতা ছাড়া এই গ্রেনেড হামলা হতে পারে না। খালেদা জিয়ারা পারে মানুষ হত্যা করতে। তার কারণ আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ছিল, গণহত্যা চালিয়েছে, এই আপনাদের চট্টগ্রামেই তো যেভাবে মানুষ হত্যা করেছে, সেই দলের সাথেই তারা এক হয়ে এই দেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। আর আওয়ামী লীগ শান্তিতে বিশ্বাস করে। তাই আওয়ামী লীগ এলে দেশের মানুষ শান্তিতে থাকে।”

২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বলে আগে থেকে ‘অগ্নিসন্ত্রাস শুরু করেছিল’ মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, “লঞ্চে, ট্রেনে, বাসে আগুন দেওয়ার পাশপাশি রাস্তায় গাছ কেটে ফেলে এবং চারদিকে অগ্নিসন্ত্রাস শুরু করেছিল। তিন হাজার মানুষ অগ্নিসন্ত্রাসে আহত হয়েছে, পাঁচশ মানুষ নিহত হয়েছে, সাড়ে তিন হাজার গাড়ি বিএনপি পুড়িয়েছে। তার সাথে লঞ্চ, ট্রেন এসব তো আছেই। যাদের মধ্যে এতটুকু মনুষ্যত্ব আছে, তারা কি এভাবে মানুষ হত্যা করতে পারে? পারে না। তাদের আন্দোলন হচ্ছে মানুষ খুন করা।”

বিএনপির দুটো ‘গুণ’ আছে মন্ত্যব্য্য করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, “ভোট চুরি আর মানুষ খুন। ওইটা পারে। তারা জানে ইলেকশন হলে জনগণ ওই খুনিদের ভোট দেবে না। তাই তারা আলেকশন চায় না। চায় সরকার উৎখাত করে এমন কিছু আসুক, যারা একবারে নাগরদোলায় করে ক্ষমতায় বসায় দেবে বা পালকিতে করে ক্ষমতায় বসায় দেবে বিএনপিকে।”

দেশে যে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে, সেই প্রসঙ্গ টেনে সরকারপ্রধান বলেন, “কোনো মানুষ কর্মহীন থাকবে না।”

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে এখনও ‘মজবুত’ মন্তব্য করে বিশ্বব্যাপী খাদ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের অভাবের কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “আমরা তার পরও চেষ্টা করে যাচ্ছি আমাদের দেশের মানুষ যেন ভালো থাকে। কিছু দিন বিদ্যুতের জন্য কষ্ট হয়েছে। আল্লাহর রহমতে আর কোনো কষ্ট ভবিষতে থাকবে না। কিন্তু আপনাদেরকে একটা অনুরোধ- আপনাদের সাশ্রয়ী হতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করতে হবে।”

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।

তিনি বলেন, “বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি তেল ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। নিজেদের সাশ্রয় করতে হবে। আর যার যত জমি আছে, এক ইঞ্চি জমি খালি ফেলে রাখবেন না। যে- যা পারেন উৎপাদন করেন, যে যা পারেন আপনারা নিজেরা তৈরি করেন; যেন আমাদেরকে পরমুখাপেক্ষি হতে না হয়। আমরা যেন অন্যের কাছে হাত পেতে না চলি।’’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম জনসভায় বক্তব্য রাখেন।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে জনসভা সঞ্চালনা করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে