চুরির অপবাদ দিয়ে ঘর পুড়লো তিনকন্যার জননী কনার

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯, ২০২২; সময়: ২:১৫ pm |
চুরির অপবাদ দিয়ে ঘর পুড়লো তিনকন্যার জননী কনার

নিজস্ব প্রতিবেদক : টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে পরস্পর তিন কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়ায় কপাল পুড়ছে কামরুন নাহার কনার। পাশ্চাত্য যুগ পার হলেও বর্তমান আনুধিক যুগে এসেও এমন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানার কেশবপুর এলাকার পুর্লিশ লাইন ২ নম্বর গেটের সামনে।

জানা গেছে, কনা নগরীর বহরমপুর এলাকার ট্রাক চালক কামাল হোসেন। প্রায় ৭ বছর আগে রাজপাড়া থানাধীন কেশবপুর এলাকার ২ নং পুলিশ লাইন গেটের সামনে পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়েছিলো মুদি দোকানদার চঞ্চলের সাথে। এর পরই তার জীবনে নেমে আসে দুর্বিষহ যন্ত্রণা।

কনা জানান, তার বয়স মাত্র ২৬। এরই মধ্যে হয়েছেন তিন সন্তানের মা। বড় মেয়ে সুরাইয়া বয়স ৫, মেজো মেয়ে ৩ ও ছোট মেয়ে আফিয়ার মাত্র ১০ মাস। এর ভেতর স্বামির কথামত লাইগেশন করিয়েছেন ছোট মেয়ের জন্মদানের সময়। তবে সুখ মেলেনি। সর্বশেষ ছোট সন্তানটি মেয়ে হওয়ায় কপাল পুড়ে কনার। দ্বিতীয় সন্তান মেয়ে হওয়ার পর থেকে অত্যাচার শুরু হয় আর তৃতীয় সন্তান মেয়ে হওয়ায় সেটি চরম পর্যায়ে বেড়ে যায়।

চার বোনের মধ্যে সে সবার বড়। বাবার আয় দিয়ে সংসারের অভাব সেভাবে পূরণ না হওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষার পর পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় কনার। বিয়ের সময় জানানো হয়নি চঞ্চলের আগে বিয়ে হয়েছিলো। তার পরেও সব মেনে নিয়ে সংসার শুরু করেন । তবে সেখানে সুখের বিন্দু মাত্র ছোয়া মেলেনি। সংসারে শাশুড়ি প্রায় পাঁচ মাস আগে মারা যান। তবে মারা যাওয়ার আগে চঞ্চলের আরো কয়েকভাই থাকলেও সেখানে খাবার ও থাকার জায়গা জোটেনি। ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়ে সবার ছোট ছেলে মাকে তার ঘরে রাখতে বাধ্য হন। এদিকে বিয়ের পরপরই একের পর এক সন্তান হওয়ায় সংসারের অন্যান্য কাজগুলো সময় মত করতে পারেনি কারন তিন সন্তানই ছোট। ফলে প্রায় প্রতিদিনই চলতো মারধর।

কনা আরো বলেন, বেশ কিছুদিন আগে চঞ্চলের আরেক ভাই মারা গেলে সেই ভাইয়ের বৌয়ের সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত হোন তিনি। প্রতিদিনই মুখ বুজে সহ্য করতে হতো আমাকে। এগুলো জানার পরও প্রতিবাদ করিনি কারন ঘরে আমার তিন কন্যা সন্তান। এভাবে দিনের পর দিন মার খেয়ে চললেও সংসার ছাড়তে চাইনি। তবে পরকীয়ায় আসক্ত হওয়া চঞ্চলের মায়ের মৃত্যুর পর কুলখানির দিনকে বেছে নেন তাকে তাড়িয়ে দেয়ার চুড়ান্ত রুপ দিতে।

হঠাৎ করে তার রুমে দরজার সামনে একটা কৌটায় কিছু টাকা পাওয়া যায়। এর আগে সেখানে কৌটা ছিলনা । সেটা খুলে দেখতেই টাকা দেখে তার দেবর উজ্জলকে জানায়। কারন সেসময় তার স্বামি দোকানে ছিলো। এর পরেই শশুর বাড়ির লোকজন দাবি তোলে সেখানে আরো দুই লাখ টাকা ছিলো সেগুলো কোথায়। এই অভিযোগ তুলে প্রায় ছয় মাস আগে তাকে ঘর থেকে বের করে দেয় শশুর বাড়ির লোকজন।

কনা তিন কন্যা সন্তানের দিকে তাকিয়ে ঘর করতে চান। কারন বাবার ঘরে আরো দুই মেয়ে অবিবাহিত। সেখানে সেসহ তার তিন মেয়ের খরচ চালানো একেবারেই অসম্ভব। তাই আইনের সহায়তা নেননি। এর মধ্যে তার পিতা বাইরে থাকা অবস্থায় সরকারি নোটিশ আসে। তবে তারা বুঝতে না পারায় সেটি গ্রহণ করেননি বলে জানান তিনি। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন সেটি তালাকের নোটিশ।

কনার পিতা কামাল হোসেন জানান, মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে মারধর চলতো। তবে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু কিছু টাকা দিতাম। পরে তালাকের নোটিশ পেয়ে মহিলা আইন সহায়তা কেন্দ্রে যাই আমরা। সেখানে সব কিছু খুলে বললে তারা আমাদের সহায়তা দেন। জামাই চঞ্চলকে সেখান থেকে তাদের সাথে এ মাসের ৯ তারিখ সকালে শুনানীর জন্য ডাকা হলে সেদিন শুনানীর পরেই বাইরে এসে হুমকি দেয় তারা।

এর মধ্যে ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রুহুল আমিন টুনু বিচারের কথা বলে আইন সহায়তা কেন্দ্রের এক ম্যাডামের সাথে কথা বলে শুক্রবার সন্ধ্যায় আপোষ মিমাংসা করে দিতে চান। সে হিসেবে আমরা গেলে কথাবার্তার এক পর্যায়ে চঞ্চল কোন ভাবেই মেয়েকে গ্রহণ না করা ও দুই লাখ টাকা চুরির বিষয় তুললে আমরা প্রতিবাদ করে বাইরে চলে আসি। এমন অবস্থায় কাউন্সিলরের অফিসের সামনে আমার বড় মেয়ে কনা ও ভাগ্নে নাহিদকে রিকশা থেকে নামিয়ে কয়েকজন এলাপাতারি মারতে থাকে। এসময় নাহিদের চোখের উপরে ঘুষি লাগে ফুলে যায় সাথে সাথে। আর কনাকে চঞ্চলের ভাই উজ্জল,নূরনবী,বীনা,রকি,আহাদ ইচ্ছা মত মারতে থাকে। তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আর নাহিদকে চিকিৎসা জন্য হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তারা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রাজপাড়া থানায়। মেডিকেল রিপোর্ট পেলে তারা মামলা করবেন বলে জানান।

কামাল হোসেন আরো জানান,আগে যে বিয়ে হয়েছিলো সেটি আমরা বিয়ের দিন জানতে পারি লোকমুখে। সেই মেয়ে ৭ মাসের পেটে বাচ্চা থাকা অবস্থায় মারা গেছে শুনেছি। আমি সন্দেহ করছি সেই মেয়েকেও তারা মেরে ফেলেছে। কারন আশেপাশের বাড়ির মানুষদের কাছ থেকে শুনেছি তাকেও অত্যাচার করতো তারা।

এ বিষয়ে কাউন্সিলর রুহুল আমিন টুনু জানান, উভয় পক্ষকে ডেকে আমার অফিসে মিমাংসা করার জন্য আনলে চঞ্চল কোনভাবেই এসংসার করবেনা বলে জানিয়ে দেই। এসময় মেয়ে পক্ষের পিতা ও এক ছেলে আইনের মাধ্যমে সমাধান চেয়ে বেরিয়ে আসার সাথে সাথে চেম্বারের সামনে রিকসা থেকে নামিয়ে মারধর করে। এটা করা একদম ঠিক হয়নি ছেলে পক্ষের।

এবিষয়ে রাজপাড়া থানার ওসি এএসএম সিদ্দিকুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি একটু ঝামেলায় ছিলাম। অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে জানাতে পারবো বলে জানান।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে