সিলেটে বিএনপির গণসমাবেশ ধর্মঘটের বাধা পেরিয়ে নেতাকর্মীদের ঢল

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৯, ২০২২; সময়: ১২:০০ pm |
সিলেটে বিএনপির গণসমাবেশ ধর্মঘটের বাধা পেরিয়ে নেতাকর্মীদের ঢল

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : পরিবহণ ধর্মঘট আমলেই নিচ্ছেন না সিলেট বিভাগের বিএনপি নেতাকর্মীরা। বাস বন্ধ থাকলেও তারা নৌকা, ট্রেন, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, এমনকি হেঁটে ছুটছেন। লক্ষ্য-সিলেট শহরের আলিয়া মাদ্রাসার মাঠ। গণসমাবেশের একদিন আগেই বিশাল এই মাঠ কানায় কানায় ভরে গেছে। কোন্দল-বিভেদ ভুলে একমেরুতে সব নেতা।

এদিকে শুক্রবার রাতে সিলেটে পৌঁছেই জনসভাস্থলে আসেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তিনি সেখানে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। ২০১৩ সালের অক্টোবরে সিলেট শহরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সর্বশেষ জনসভা করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এক দশক পর আজ একই স্থানে, প্রায় একই প্রেক্ষাপটে বিএনপির গণসমাবেশ। যেখানে মূল দাবি-নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন।

সিলেট বিভাগীয় গণসমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির প্রধান উপদেষ্টা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান শুক্রবার সন্ধ্যায় সমাবেশ প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে বলেন, সিলেট শহরে আজ অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। এটা জোর করে হয় না, দেশের মানুষ আজ জেগে উঠেছে। কারণ, সরকারের দুঃশাসনে জনজীবন অতিষ্ঠ।

তিনি বলেন, দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সবাই আজ ঐক্যবদ্ধ। মানুষের চাপা ক্ষোভ আজ প্রকাশ পাচ্ছে বিএনপির শান্তিপূর্ণ গণসমাবেশের মাধ্যমে। সেই ধারাবাহিকতায় সিলেটে সফল ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হবে। আমরা অপেক্ষা করছি গণমানুষের ঢল নামবে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে। আজ দুপুর ১২টায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে গণসমাবেশ। সমাবেশে বিএনপির সিনিয়র নেতারা বক্তব্য দেবেন। সমাবেশের প্রধান অতিথি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার রাতে সিলেটে এসে পৌঁছেছেন।

এদিকে শুক্রবার সকাল থেকে বিভাগের তিন জেলায় চলছে ৩৬ ঘণ্টার পরিবহণ ধর্মঘট। আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সিলেট জেলায়ও চলবে এ ধর্মঘট। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সমাবেশকে কেন্দ্র করে কিছুটা রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

বৃহস্পতিবার ছাত্রলীগ শহরে মোটরসাইকেল মহড়া দেয়। কিন্তু শুক্রবার ক্ষমতাসীনদের মাঠে দেখা যায়নি। তবে বিভিন্ন জেলা থেকে আসার পথে কিছু জায়গায় নেতাকর্মীদের বাধা দেওয়া হয় বলে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। পরিবহণ ধর্মঘট ঘোষণার পর বুধবার থেকে সিলেট বিভাগের চার জেলা থেকে নেতাকর্মীরা বিভিন্ন বাহন নিয়ে আসতে থাকে।

বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে বাঁধভাঙার আওয়াজ উঠছে সিলেট শহরজুড়ে। ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে নগরীর অলিগলি। মুহুর্মুহু মিছিল, স্লোগান, প্রচার-প্রচারণা, রাজনৈতিক আড্ডা চলছে নগরের প্রতিটি জনপদে। নেতাকর্মীরা স্লোগান ও গানে গানে মুখরিত করে রেখেছেন সমাবেশস্থল।

মাঠের প্যান্ডেলে তরুণ নেতাকর্মীরা বড় বড় সাউন্ডবক্স ও স্পিকারে কাজী নজরুল ইসলামের রণসংগীত, শাহ আব্দুল করিম, রাধারমন দত্ত ও দেশাত্মবোধক গানের তালে নেচে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। সুযোগ পেলেই নেতাকর্মীরা ছুটে আসছেন আলিয়া মাঠে। এভাবেই চলছে গত কয়েকদিন ধরে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এ সমাবেশকে ঘিরে সিলেটজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। অনেকেই সঙ্গে করে লেপ, তোশক, বালিশ ও কম্বল নিয়ে এসেছেন। মাঠেই রাত কাটিয়েছেন বিএনপির হাজারো নেতাকর্মী। আনন্দ, গল্পগুজব, রান্নাবান্না করেই সময় পার করছেন তারা। রাতে মাঠেই খাওয়াদাওয়া চলে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন। নেতারা মাঠেই টানানো তাঁবুতে কাটাচ্ছেন রাত, চলছে গল্পগুজব আর ঘুম।

বিভাগের বিভিন্ন এলাকার নেতাদের উদ্যোগে মঞ্চের তিন পাশে নির্মাণ করা হয়েছে ক্যাম্প। ক্যাম্পে ক্যাম্পে চলছে রান্না ও খাবারের আয়োজন। এগুলোয় মজুত রাখা হয়েছে চালের বস্তা, তেল ও রান্নার সামগ্রী। কয়েকজন নারীকে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ কাটতে দেখা যায়।

প্রতিটি ক্যাম্পেই বড় বড় ডেকচিতে হচ্ছে রান্নাবান্না। কেউ রান্না করেছেন ভাত, মাছ-মাংস আবার কেউ রান্না করছেন খিচুড়ি। মাঠের প্রবেশমুখে করা হয়েছে ‘ডা. জোবায়দা রহমান ফ্রি ফুড ক্যাম্প’। এ ক্যাম্প থেকে সমাবেশস্থলে আসা নেতাকর্মীদের পানি ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

শুক্রবার বিকালে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ পরিদর্শনে এসে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সিলেটে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশ শনিবার (আজ)। তবে শুক্রবারই সিলেট নগর জনসমুদ্রে পরিণত হয়ে গেছে।

মেয়র বলেন, আমাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। মাঠের কাজও শেষ। সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী অভিযোগ করেন-সমাবেশ সামনে রেখে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি, হয়রানি ও বিভিন্ন বাধার মুখে ফেলা হচ্ছে। এরপরও স্মরণকালের বড় গণজমায়েত ঘটবে। আলিয়া মাঠে অবস্থান করা হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক পৌর মেয়র জি কে গউছ বলেন, ‘আমাদের অনেক নেতাকর্মী বৃহস্পতিবারই সিলেটে চলে এসেছেন। এখানে তাদের বিশ্রাম ও খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে।’

ব্যানার, ফেস্টুন-পোস্টারে ছেয়ে গেছে পুরো শহর : সমাবেশের একদিন আগেই ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারে ছেয়ে গেছে সমাবেশস্থল সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে শোভা পাচ্ছে পোস্টার-ফেস্টুন। দীর্ঘদিন পর বিভাগীয় এই গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে উজ্জীবিত বিএনপি নেতাকর্মীরা। স্থানীয়রা বলছেন, গত এক দশকে সিলেট নগরীতে এমন পোস্টার-ফেস্টুন শোভা পায়নি। দেওয়ালে, গাছের ডালে, বিদ্যুতের খুঁটিতে, দোকানপাটে সাঁটানো হয়েছে এসব পোস্টার-ব্যানার। নেতাকর্মীরা বলছেন, একদিনের সমাবেশ তিন দিনের সমাবেশে পরিণত হয়েছে।

সহস্রাধিক বাইকে শোডাউন : বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বিএনপির গণসমাবেশে যোগ দিতে গত শুক্রবার রাতেই জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা পৌঁছেছেন সভাস্থলে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার নেতাকর্মীদের অনেকেই মোটরসাইকেল নিয়ে মাঠে এসে পৌঁছেছেন। প্রতিটি মোটরসাইকেলেই নেতাকর্মীদের জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উঁচিয়ে উচ্ছ্বাস করতে দেখা গেছে।

পরিবহণ ধর্মঘটে দুর্ভোগের শুরু শুক্রবারই : সিলেটে পরিবহণ ধর্মঘটের ঘোষণা ছিল আজ শনিবারের। কিন্তু শুক্রবারেই অঘোষিত ধর্মঘটের কবলে পড়ে সিলেট। পরিবহণে সিট সংকট, যেখানে-সেখানে পুলিশি চেকপোস্ট, শিডিউল তছনছ আর প্রচণ্ড যানজটে চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীসাধারণ। ফলে কৌশলী বিএনপির নেতাকর্মীদের চেয়ে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয় বেশি।

বাস মালিকদের দাবি, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে শুক্রবারই ধর্মঘট শুরু হওয়ায় দূরপাল্লার বাসগুলো সিলেট ছেড়ে যেতে পারছে না। সিলেটেও আসতে পারছে না বাইরের জেলার বাস।

বাসযাত্রী আব্দুল কাদির শুক্রবার বিকালে বলেন, ঢাকায় জরুরি কাজ। কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে দুপুরে পৌঁছালেও স্ট্যান্ডে অস্থিরতা, দূরপাল্লার বাসের শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে বিকাল পর্যন্ত স্ট্যান্ডেই আছি। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। ধর্মঘটের আগেই বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সিলেট জেলা বাস, মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল কবির পলাশ যুগান্তরকে বলেন, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে একদিন আগে ধর্মঘট শুরু হওয়ায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের ধর্মঘট তো শনিবার। ৫ দফা দাবির কথা বলে আজ শনিবার সিলেটে ভোর ৬টা থেকে ২৪ ঘণ্টার বাস ধর্মঘট ডাকলেও বিএনপি বলছে সমাবেশে লোকসমাগম বন্ধের উদ্দেশ্যেই শাসক দল পরিবহণ ধর্মঘট ডাকতে বাধ্য করেছে।

জনগণের বিজয় হবেই-সিলেটে মির্জা ফখরুল : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার রাতে সিলেট পৌঁছে হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহ পরাণ (রা.) মাজার জিয়ারত করেন। পরে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বিএনপি মহাসচিব বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৪-১৫ বছরের অবৈধ বছরের শাসনামলে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ একটা দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অনির্বাচিত সরকার তাদের দুর্নীতির মাধ্যমে জাতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। যে কারণে আমরা আন্দোলন শুরু করেছি, সিলেটে শনিবার সপ্তম সমাবেশ করতে যাচ্ছি। এরপর আরও সমাবেশ আছে। আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় সর্বশেষ সমাবেশ।

তিনি আরও বলেন, এই সমাবেশগুলো থেকে জনগণের যে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি, মানুষ যে পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। যে কোনো মূল্যে এই সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করবে। মির্জা ফখরুল বলেন, তারপরও জনগণ দমে যাচ্ছে না। সিলেটের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার জমায়েত তার বড় প্রমাণ। জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কোনো ফ্যাসিবাদ কখনো টিকে থাকতে পারে না। জনগণের বিজয় হবেই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে