নবান্ন উৎসবে জামাইদের নিয়ে জয়পুরহাটে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০২২; সময়: ৮:২৫ pm |
নবান্ন উৎসবে জামাইদের নিয়ে জয়পুরহাটে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা

এস এম শফিকুল ইসলাম, জয়পুরহাট : নবান্ন উৎসব ঘিরে জয়পুরহাটের কালাই পাঁচশিড়া বাজারে বসেছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। ভোর থেকেই দূরদূরান্তের হাজার হাজার মানুষ এসেছেন মাছ কিনতে। বিভিন্ন জাতের বড় আকারের মাছের জন্য বিখ্যাত এ মেলায় দিনভর চলবে মাছের বেচাকেনা ।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নবান্ন উৎসব হলেও উপজেলার আহম্মেদাাবদ, পুনট, জিন্দারপুর, উদয়পুর, মাত্রাই উউনিয়ন ও কালাই পৌরসভার বিভিন্ন মহল্লাাবাসীর ঘরে ঘরে রয়েছে নানা আয়োজন। প্রতিটি বাড়িতেই মেয়েজামাইসহ আত্মীয়স্বজনদের আগে থেকেই নিমন্ত্রণ করা হয়। পরিবারের সবাইকে নিয়ে তারা নতুন ধানে নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠেন।

অগ্রাহয়ণের প্রথমদিন থেকে জয়পুরহাটের প্রত্যন্ত গ্রামঞ্চলে শুরু হয়েছে প্রাণের নবান্ন উৎসব। কৃষকদের ঘরে উঠেছে নতুন ধান। পিঠা-পায়েসসহ নানা আয়োজনে মেয়ে-জামাইসহ স্বজনদের নিয়ে পালিত হচ্ছে কৃষকের কাঙ্খিত প্রাণের সেই নবান্ন উৎসব। পুরো জেলাজুরে শুধুমাত্র জয়পুরহাটের কালাই পৌরশহরের পাঁচশিরা বাজারে এক দিনের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা জামাইদের উদ্যোর্শে জমজমাট ভাবেই বসেছে। এই দিনকে ঘিরে পাঁচশিরাতে ভোর ৪টা থেকে সারাদিন চলে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কেনা-বেচার উৎসব। অগ্রাহয়ণ মাসের প্রথম শুক্রবার দিনটির অপেক্ষার প্রহর গুনেন এ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের লোকজন। ক্যালেন্ডার নয়, পঞ্জিকা অনুসারে অগ্রাহয়ণ মাসের প্রথম শুক্রবার এ জেলায় একমাত্র পাঁচশিরা বাজারে প্রতিবছর বসে বৃহত মাছের মেলা।

শুক্রবার ভোররাত থেকেই মেলা জুড়ে ছিল ক্রেতা-বিক্রেতা আর কৌতুহলী মানুষের ঢল। প্রায় একশত বছর পূর্ব থেকে চলে আসা এই মেলায় নদী, দীঘি ও পুকুরের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা দেশীয় প্রজাতির টাটকা মাছে ছিল ভরপুর। সকাল থেকেই ক্রেতারা ভিড় জমায় এই মেলাতে। মাঠ থেকে নতুন ফসল কৃষকদের ঘরে উঠলেই অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম শুক্রবার দিনে আয়োজন করেন নবান্ন উৎসবের। এই অনুষ্ঠান পালন করতে আসেন সারাদেশে বসবাসরত তাদের জামায়-মেয়ে, বিয়াই-বিয়ানসহ নিকট আত্মীয়-স্বজনরা। মুলত প্রতিযোগীতা করেই মেলা থেকে জামাইরা মাছ ক্রয় করে শ্বশুর বাড়ীতে নিয়ে যান। তাইতো মেলার প্রতিটি দোকানে সাজানো রয়েছে দেশীয় জাতের বোয়াল, রুই, মৃগেল, কাতলা, চিতল, সিলভার কার্প, পাঙ্গাস, ব্রিগেট, বাঘাআইরসহ নানা ধরনের মাছ।

মেলায় সর্বোচ্চ ৩০ কেজি ওজনের একটি সিলভার কার্প মাছ বিক্রি হয়েছে ৩৬ হাজার টাকায় এবং ১৯ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ বিক্রি হয়েছে ২৭ হাজার টাকায়। এই মেলার আয়োজনও করতে হয়না। এই দিন আসলেই অটোভাবে বসে জেলার বৃহত মাছের এই মেলা। তবে স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ীরা প্রায় ১৫দিন আগে থেকে মেলার জন্য প্রস্তুতি নেন। আশপাশ এলাকায় তারা মাইকে প্রচারও করেন।

স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, পঞ্জিকা অনুসারে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম শুক্রবার দিনে এ মেলা বসে। এই দিনে নতুন ধান কাটার উৎসবে কৃষকদের প্রস্ততকৃত চালে প্রথম রান্না উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই নবান্ন উৎসব। প্রতি বছর নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠেন জেলার প্রান্তিক কৃষকেরা। সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত তাদের মেয়ে-জামায় ও আত্মীয়-স্বজনকে আমন্ত্রন করেন এই উৎসবে। এই অনুষ্ঠান পালন করতে যোগ দিতে আসেন জামায়-মেয়ে, বিয়াই-বিয়ান ও আত্মীয়-স্বজনরা। তাদের নিয়ে পাড়া-মহল্লায় বয়ে যায় উৎসবের আমেজ। সাথে চলে পিঠা-পুলি,পায়েস, ক্ষীর, খই ও মুড়ি খাওয়ার ধুম। তাইতো দিনটি উৎযাপন উপলক্ষে জেলার সর্ববৃহৎ মাছের মেলা বসেছে কালাই পৌরসভার পাঁচশিরা বাজারে। মাছ ব্যবসায়ীরা কয়েকদিন আগে থেকেই পাঁচশিরা বাজারে তাদের আড়ৎ ঘরে এলাকার বিভিন্ন দীঘি, পুকুর, নদী থেকে নানান জাতের বড় বড় মাছ সংগ্রহ করেন। মেলা উপলক্ষে এ দিনে এলাকার বিভিন্ন শ্রেনী, পেশাজীবি মানুষরা উচ্চ মুল্যে এসব মাছগুলো ক্রয় করেন। এ বছর বোয়াল, রুই, মৃগেল, কাতলা, চিতল, সিলভার কার্প, পাঙ্গাস, ব্রিগেট, বাঘাআইরসহ ৩ কেজি থেকে ৩০ কেজি ওজনের মাছের সমাগম চখে পড়েছে মেলায়। আগের তুলনায় এ বছর মেলায় লোকজনের উপস্থিতিও ছিল বেশী। মাছ ক্রয়-বিক্রয়ও হয়েছে প্রচুর। কাউকেই খালি হাতে মেলা থেকে ফিরে যেতে চখে পড়েনি। সাধ্যমত সবাই মাছ ক্রয় করেছেন।

মেলায় মাছ বিক্রি করতে আসা ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম ও উজ্জল চন্দ্র বলেন, মাছের মেলাতে পুকুর, দীঘি ও নদী থেকে নানান জাতের বড় বড় মাছ সংগ্রহ করা হয়েছে। কাতলা, রুই, মৃগেল ৭শ থেকে ১৫শ টাকা কেজিতে এবং বাঘাআইর, বোয়াল ও চিতল মাছ ১৩শ থেকে ২ হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। আর মাঝারি আকারের মাছ ৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। অন্য বছরের তুলনায় এবার ক্রেতা ছিল বেশী। তাই মাছও বিক্রি হয়েছে বেশী। দামও ছিল স্বাভাবিক। এবার মাছ নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়নি। লাভও হয়েছে মোটামুটি।

মেলায় মাছ কিনতে এসেছে কুষ্টিয়া জেলা থেকে আগত কালাই উপজেলার মাদাই গ্রামের জামাই আশরাফুল ইসলাম। কথা হয় তার মাথে। তিনি বলেন, এই মেলা উপলক্ষ্যে শশুর প্রতিবছরই দাওয়াত করেন। আমি প্রতিবছরই মেলায় আসি। যেহেতু এই মেলা জামাই-মেয়ে উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয়, সে কারনে মাছ একটা কিনতেই হয়। এবারও ১২ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ কিনেছি। অন্য বছরের চাইতে এবার মাছের দাম একটু বেশী। তারপরও আনন্দ লাগছে।

উপজেলার পুনট পাঁচপাইকা গ্রামের আলু ব্যবসায়ী মিঠু ফকির বলেন, এই দিনের অপেক্ষায় মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনি ও আত্মীয়-স্বজনরা চেয়ে থাকে। শত কষ্ট হলেও তাদের জন্য আয়োজন করতেই হয়। আজ মেলাতে এসেছি বড় মাছ কিনতে। প্রায় ২৬ হাজার টাকায় ১৩ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ এবং ১৮ কেজি ওজনের একটি সিলভার কার্প মাছ কিনেছি। মাছ কিনে আমিসহ আমার নাতি-নাতনিরা বেশ খুশি।

আমেরিকা থেকে দেশের বাড়িতে বেড়াতে থেকে আসা কালাই পৌর শহরের কলেজ পাড়ার সাবরিনা ইয়াসমিন এশা বলেন, ‘নবান্ন উপলক্ষে দেশে বেড়াতে এসেছি। হওেশ রকমের বড় বড় মাছ নিয়ে এমন মেলা আগে কখনও দেখিনি।’ তাই বড় ভাইয়ের সাথে এসেছি মাছের মেলা দেখতে। খুব ভাল লেগেছে এবং মাছও কিনেছি।

পাঁচশিরা বাজার ইজারাদার মোহাম্মদ জিয়া বলেন, এ মেলার কোন আয়োজক নেই। প্রতিবছর এই দিনে নবান্ন উৎসব উপলক্ষ্যে মাছের মেলা অটোভাবেই বসে। তবে মাছ ব্যবসায়ীরা মেলার আগে এলাকায় মাইকে প্রচার করে। এই দিনে প্রচুর মাছ আমদানি যেমন হয় তেমনি বিক্রিও হয়।

কালাই উপজেলা সহকারি মৎস কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, মেলায় ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ওঠেছে। বড় বড় মাছ দেখে এ এলাকার চাষীদের আগ্রহ বাড়ছে। আজকের এই মেলায় কমপক্ষে ১ থেকে সোয়া কোটি টাকার মাছ ক্রয়-বিক্রয় হবে। মৎস বিভাগ চাষীদের সবসময় মাছ চাষে পরামর্শ দিয়ে আসছে। আগামীতে এই মেলার পরিধি আরো বাড়বে বলে আমি আশাবাদি।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে