মাছ ধরে সংসার চলছেনা জেলেদের, পেশা ছেড়েছেন অনেকেই

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৪, ২০২২; সময়: ১২:১৭ pm |
মাছ ধরে সংসার চলছেনা জেলেদের, পেশা ছেড়েছেন অনেকেই

আব্দুল লতিফ মিঞা, বাঘা : নদীতে মাছ ধরে সংসার চলছেনা জেলেদের। অনেকেই বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পেশা। নদীই যাদের জীবিকার প্রধান উৎস্য, তাদের অনেকের এখন অনিশ্চিত জীবন। এখন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জেলেদের। এছাড়া ঋণের কিস্তি তো আছেই। যার ফলে প্রাণের স্পন্দন টের পাওয়া মুশকিল। এমন দৃশ্য দেখা গেছে বাঘা উপজেলার পদ্মার চরে।

জেলে আজগর আলী সেখ জানালেন, নিজের জাল ও নৌকা নেই তার। অন্যের সঙ্গে ভাগে মাছ ধরার সুযোগ পাওয়ার আশায় বসে থাকতে হয় তাকে। কিন্তু নদীতে জাল ফেলেও মাছ পাচ্ছেন না। ক্ষ্যাপলা জাল নিয়ে মাছ ধরার জন্য নদীর পাড় দিয়ে ঘুরছিলেন আরেক জেলে জামাল উদ্দীন। দুপুর ১টা পর্যন্ত কোন মাছই পাননি।

তিনি জানান, তার কোন কার্ড হয়নি। জেলে শাকিম আলী বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে বউ-বাচ্চা নিয়ে এখন না খেয়ে মরা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

নদীর পাড় দিয়ে যেতে দেখা গেল, কয়েকজন জেলে জাল ঠিক করছেন মাছ ধরার জন্য। তারই দলে জেলে মালেক বেপারি জানালেন, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি যখন স্বচ্ছ হয়ে ওঠে, আর সেই পানিতে যখন মাছ আসে, তখন নদীতেই সারা দিন কাটে তাদের। অন্য সময় কখনও হয়তো ভাড়ায় মাছ ধরতে যান কোনো পুকুর বা ঘেরে, অথবা কামলা খাটেন।

কোষা নৌকায় ভেসে কচাল পাতেন, মাইজাল ফেলে মাছ ধরেন কিশোরপুর গ্রামের জেলে অদৈত্য হোলদার। ভাগে মাছ ধরে কখনো ৫০০শ’ টাকার মাছ পান দিনে। কার্তিকের পর পানি নেমে গেলে সে সুযোগও চলে যায়। তিনি বলেন, কার্তিক গেলেই আজন্ম জেলে তখন হয়ে পড়েন পর নির্ভরশীল কামলা।

সরেজমিন শনিবার(১২-১১-২০২২) পদ্মার চরাঞ্চলের চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাশখালি এলাকার নদী পাড়ে গিয়ে দেখা গেল, কয়েকটা নৌকা নদীর পাড়ে তুলে রাখা। খুজতে খুজতে দুপুর পৌণে ২ টায় পাওয়া গেল ওই গ্রামের (কালিদাশখালি) জেলে মজনু ফকিরকে। তেমন মাছ না পেয়ে নিজের ডোঙা নৌকা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন।

তাকে জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, রাত ৩টায় নিজের ডোঙা নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে নেমেছিলেন। ১০০ গ্রাম ওজনের দেড় কেজি ইলিশ মাছ পেয়েছেন । বাজারে যা বিক্রি হবে ৫০০ থেকে ৬০০শ’ টাকায়। আর যে দিন মাছ পাননা, সেদিন সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারেননা। মাছ পওয়া যায়না বলে তার দলের ২ জেলে নদীতে নামেননা। তারা বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা।

মজনু ফকিরের ৪ সদস্যর সংসার চলে নদীতে ধরা মাছ বিক্রি করে। নিবন্ধিত জেলে হলেও প্রণোদনা পাননি। তিনি বলেন, জিনিস পত্রের যে দাম, তাতে মাছ ধরে সংসারের সব চাহিদা মেটাতে পারছেন না। কোন কোন দিন নুন ভাত খেয়ে জীবন চালাতে হচ্ছে।

‘নিজের জাল, নিজের নৌকা। নিজেই মাছ ধরেন। কিন্তু নদীতে মাছ না পেয়ে হতাশায় জেলে আতিয়ার রহমান। নিষেধাজ্ঞার ২২দিন নদীতে মাছ ধরার আগে ঋণ করেছেন ৩০ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে সংসারে খরচসহ জাল ও নৌকা মেরামতের কাজ করেছেন। ধারনা করছিলেন নদীতে ধরা মাছ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করবেন। কিন্তু নদীতে মাছ মিলছেনা। সারাদিনে যে মাছ পান,তাতে নৌকায় সেটিং করা ইঞ্জিনের তেলের খরচ আসেনা। তাই নদীতে নামছেন না। তার দলে যে ২জন ছিল, তারা এলাকার বাইরে কাজে গেছে।

কালিদাশখালি গ্রামের নদীর পাশের বাড়ি জেলে আতিয়ার রহমানের। বয়স ৩৫ বছর হবে। নিজের আয়ে সংসার চলে না বলে ১৩ বছর বয়সের ছেলে মজনু রহমানকে সেলুনে কাজে লাগিয়েছেন। ১৮ বছর বয়সে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ১ বছর আগে । ছোট ছেলে শান্ত ৪র্থ শ্রেণীতে লেখা পড়া করে। তিনি জানান, প্রনোদণার ২৫ কেজি চাল পেয়েছিলেন, নিষেধাজ্ঞার শেষ সময়ের দিকে। কিন্তু তার মতো চাল পাওয়া জেলের সংখ্যা হাতে গোনা।

মৎস্য দপ্তর সুত্রে জানা গেছে, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ হাজার ৩০৫ জন। এর মধ্যে ইলিশ আহরণকারি জেলের সংখ্যা ৮৮৫ জন। প্রনোদনা পেয়েছেন ৭৫৫ জন।

এলাকার জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওলিউর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ৩৬০ জন। এর বাইরেও অনেক জেলে রয়েছে। নদীতে মাছ না পাওয়ায় অনেক জেলে বাধ্য হয়ে এলাকার বাইরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন।

ইউপি চেয়ারম্যান ডি এম বাবুল মনোয়ার বলেন, এই গাঁয়ের ৩ ভাগের ২ভাগ ঘর-গৃহস্থালির সবটাই নদীতে। ভাঙনের কবলে পড়ে অনেকের মতো জেলেরাও ভিটে মাটি হারিয়েছেন। তারা এখন মানবেদর জীবন যাপন করছেন। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ ২৪৬ জনের তালিকা করেছি। কিন্তু মেলেনি সরকারি কোন সহায়তা।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে