রূপপুরে ১ ইউনিটের ডোম স্থাপন শুরু

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৩, ২০২২; সময়: ১০:১৯ am |
রূপপুরে ১ ইউনিটের ডোম স্থাপন শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঈশ্বরদী : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের রিয়্যাক্টর ভবনের বহি: কন্টেইনমেন্টে ডোম স্থাপনের কাজ গত ১০ নভেম্বর শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে এটির একটি অংশ স্থাপনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার রোসাটমের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা, যার ৯০ শতাংশই ঋণ সহায়তা হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া। বাকি অর্থ দিচ্ছে বাংলাদেশ। দুটি ১২০০ মেগাওয়াটের মোট ২৪০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে উৎপাদনে আসার কথা। এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদনে আসার কথা। সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ভারতীয় কোম্পানির ঢিলেমির কারণে সময় মত শেষ হবে না। এতে রূপপুর কেন্দ্রটি নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও উৎপাদনে যেতে পারবে না সঞ্চালন লাইনের অভাবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০০ টন ওজন এবং ৪৬.৩০ মিটার ব্যাসের এই বিশালাকার কাঠামোটি ৪৮.৮০ মিটার উচ্চতায় স্থাপনে সময় লেগেছে পাঁচ ঘণ্টার বেশি। পরে ডোমের অন্যান্য অংশ এবং কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ করা হবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্র নির্মাণের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক আলেক্সি ডেইরির বক্তব্য উদ্বৃত করে বলা হয়, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম অংশ এই বহিঃকন্টেইনমেন্ট। রেইনফোর্সড কংক্রিটের এই কাঠামোটি রিয়্যাক্টরকে বিভিন্ন বাহ্যিক প্রতিকূলতা যেমন, ভূমিকম্প, সুনামি বা হারিকেন থেকে সুরক্ষা প্রদান করে’।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাশিয়ার নকশায় নির্মিত ভিভিইআর ১২০০ রিয়্যাক্টরভিত্তিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো ডাবল কন্টেইনমেন্ট। বহিঃকন্টেইনমেন্ট ছাড়াও রিয়্যাক্টর বিল্ডিং সুরক্ষায় রয়েছে অত্যন্ত মজবুত আরেকটি অভ্যন্তরীণ কন্টেইনমেন্ট। প্রথম ইউনিটে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনমেন্ট স্থাপনের কাজ ২০২১ সালে সম্পন্ন হয়েছে। ডোমের সংযোজন এবং স্থাপনের দায়িত্ব পালন করছে রোসাটম প্রকৌশল শাখার অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেস্ট রোসেম।

সঞ্চালনে আটকে যাবে রূপপুর
ইউক্রেনে রুশ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা ‘দ্য সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন’ (সুইফট) থেকে বাদ দেয় রাশিয়াকে। এরপর থেকে বাংলাদেশের ঋণের কিস্তি পরিশোধ বন্ধ হয়ে গেলেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প নির্মাণ বন্ধ থাকেনি। তবে সঞ্চালন লাইনের বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণের যন্ত্রপাতি নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার ভয়ে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে পারছে না জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের দুটি কোম্পানি।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য উপকেন্দ্র নির্মাণের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ছিল জার্মানির সিমেন্স এবং সুইজারল্যান্ডের এবিবি। উপকেন্দ্র নির্মাণের যন্ত্রপাতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তারা আর শেষ করতে চাইছে না। সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি ইউক্রেনের পক্ষে থাকায় রাশিয়ার কোনো প্রকল্পে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করলে তা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় বাংলাদেশে উপকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা থেকে বিরত রয়েছে।

এ ছাড়া রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজও অত্যন্ত ধীর। কেন্দ্র নির্মাণ হয়ে গেলেও সেখানকার বিদ্যুৎ সরবরাহ করার মত সঞ্চালন লাইন নির্মাণের এখনো অর্ধেক কাজই শেষ হয়নি। বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।

পিজিসিবির প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, ভারতের ঋণে রূপপুর সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ হচ্ছে। ভারতের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো লাইন নির্মাণের কাজ করছে। ভারতের ঠিকাদাররা আবার দেশীয় ঠিকাদার দিয়ে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ করে। এসব ঠিকাদারকে গত চার মাসে কোনো বিল দেয়া হয়নি। এ কারণে ঠিকাদাররা কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। তাছাড়া এসব কাজ তারা ২০২০ সালে দিয়েছে। এরপর সিমেন্ট, পাথর, পরিবহন খরচ কয়েক দফা বেড়েছে। অন্তত ৪০ শতাংশ খরচ এসব খাতে বেড়েছে। অথচ ভারতীয় কোম্পানিগুলো স্থানীয় ঠিকাদারদের অর্থ বাড়িয়ে দেয়নি। এ কারণে নির্মাণ কাজে বাংলাদেশি ঠিকাদারদের অনীহা দেখা দিয়েছে।

পিজিসিবির প্রকৌশলীরা আরও জানিয়েছেন, ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেইল ও এলএনটির কাজের অগ্রগতি সবচেয়ে খারাপ। এর কারণ এলএনটি সবচেয়ে কমদামে স্থানীয় ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করানোর চেষ্টা করছে। আর ট্রান্সরেইল মাসের পর মাস বিল বকেয়া রেখে দেয়। এ কারণে সময়মত সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হবে না বলে দাবি পিজিসিবির প্রকৌশলীদের।

রাশিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সঙ্গে পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি সই হয় বাংলাদেশের। রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট কেন্দ্র নির্মাণের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। চুক্তির অংশ হিসেবে কেন্দ্রের নকশা, রিয়্যাক্টর ছাড়াও কেন্দ্রের যন্ত্রাংশ, নির্মাণ থেকে শুরু করে কেন্দ্র উৎপাদনে যাওয়ার বিষয়টি রাশিয়া দেখবে। তবে ২০১৭ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ভিন্ন আরেকটি চুক্তি হয়েছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী, রূপপুরের জন্য লোকবল প্রশিক্ষণ, কেন্দ্র পরিচালনা এমনকি কেন্দ্র নির্মাণের যন্ত্রপাতি তৃতীয়পক্ষ হিসেবে তারা বাংলাদেশকে আমদানি করে এনে দিতে পারবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা, যার ৯০ শতাংশই ঋণ সহায়তা হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া। রূপপুর প্রকল্পের জন্য দু’দফায় দুটি ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ৫০ কোটি ডলার ঋণ নেয়া হয়েছিল প্রকল্পের ভূমি উন্নয়নসহ প্রাথমিক খরচের জন্য। এর কিস্তি শুরু হয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। মূল প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে ঋণ নেয়া হয়েছিল ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন বা এক হাজার ১৩৮ কোটি ডলার। রূপপুর প্রকল্পের জন্য বছরে দুটি কিস্তি দিতে হয় বাংলাদেশকে। প্রকল্প শুরুর সময় যে ৫০ কোটি ডলার ঋণ নেয়া হয়েছিল তার কিস্তি দিতে হয় প্রতি বছরের মার্চ ও সেপ্টেম্বর মাসে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর পশ্চিমা দেশগুলো গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা ‘সুইফট’ থেকে রাশিয়াকে বাদ দেয়ার পর বাংলাদেশের ঋণের কিস্তি পরিশোধও বন্ধ হয়ে যায়। রাশিয়া তার নিজস্ব মুদ্রা রুবলে ঋণের কিস্তি চেয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনো এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে। ভিভিইআর ১২০০ মডেলের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে রূপপুরে। প্রতিটি ইউনিটে ১২০০ মেগাওয়াট করে মোট দুটি ইউনিটে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। রাশিয়ার বাইরে ভিভিইআর ১২০০ মডেল প্রথম বাংলাদেশেই স্থাপিত হতে যাচ্ছে।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে