মুমূর্ষু রোগীদের পাশে রাণীনগর ব্লাড ডোনার ক্লাব

প্রকাশিত: নভেম্বর ৮, ২০২২; সময়: ১১:১৯ am |
মুমূর্ষু রোগীদের পাশে রাণীনগর ব্লাড ডোনার ক্লাব

মনীষা আক্তার : ‘একজন মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজন।’ অপেক্ষায় থাকেন এমন একটি আহবানের। খবর পাওয়া মাএই অসুস্থ মানুষের রক্ত জোগাড়ে ছুটে বেড়ান একদল তরুণ তরুণী । যখন যার রক্ত প্রয়োজন, তখন তার জন্য রক্ত জোগাড় করে দিচ্ছেন তাঁরা।

রাতদিন যেকোনো মুহূর্তে রক্ত সংগৃহীত হয়ে যাচ্ছে। শুধু সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। সংগঠনটির নাম ‘রাণীনগর ব্লাড ডোনার ক্লাব’। সংগঠনের সদস্যরা রোগীর ঠিকানা নিয়ে পৌঁছে যান হাসপাতালে। রক্ত দিয়ে ফেরেন হাসিমুখে।

নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলার একদল তরুণদের এখন এটি মুখ্য কাজ। স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে গড়ে তুলেছেন এমন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। প্রথম দিকে ওই তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক) গ্রুপ তৈরি করে এক হয়েছেন।

‘রানীনগর ব্লাড ডোনার ক্লাব ( আরবিডিসি) নামের ওই গ্রুপের তরুণেরা রক্তদানে সাড়া দিয়ে ছুটে বেড়ান মানুষের জীবন বাঁচাতে। এমনও হয়েছে রোগীর নামধাম জানেন না, রক্ত দিয়ে চলে এসেছেন। এ রকম অনলাইনভিত্তিক একটি সংগঠন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে রক্তদাতা জোগাড় করে তাঁদের সমস্যা দূর করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

মানবতার টানে ভয় নাই রক্তদানে’ স্লোগানকে সামনে রেখে ২০২০ সালে এই সংগঠনের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে স্বল্পসময়ে সফলভাবে রক্তের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হওয়ায় ক্লাবটি অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বর্তমানে এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৮০ জনের মতো।

সংগঠনের প্রধান কাজ রক্ত সংগ্রহ করা হলেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় মানবতার সেবায় কাজ করে প্রশংসা কুড়িয়েছে। মুমূর্ষু রোগীদের জন্য রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়া, বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা সহায়তায় চ্যারিটি প্রোগাম আয়োজন, শীতার্তদের শীতবস্ত্র এবং ঈদে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে ঈদবস্ত্র বিতরণ করে থাকে সংগঠনটি। এছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ত্রাণসামগ্রীও বিতরণ করে সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবীরা।

সংগঠনটির এসব স্বেচ্ছাসেবীমূলক কাজে নবীনরা উৎসাহিত হয়ে পরবর্তীতে তারাও মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর অভিপ্রায়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে থাকে।

সংগঠনটির পরিচালক ডা.ফরিদ এইচ খান বলেন, আমি ঢাকায় থাকতে এলাকা থেকে এক বড় ভাই ফোন দিয়ে ৩ ব্যাগ বি নেগেটিভ রক্ত লাগবে বলে জানায়। যেহেতু আমি একজন ডাক্তার তাই তিনি বলেন তোমার পরিচিত রক্তদাতা থাকলে একটু সাহায্য করতে। আমি তখন কাকে জানাবো, কোথায় জানাবো খুজে পাচ্ছিলাম না। সেই রক্তের ডোনার ম্যানেজ করে দিতে পারি নাই।

এর পরেই চিন্তা করলাম যদি এমন কোন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যায়। যেখানে রাণীনগরের সকল মানুষ যুক্ত থাকবে এবং একজনের বিপদে অপর জন এগিয়ে আসবে। সেখান থেকেই আজকের আরবিডিসি(রাণীনগর ব্লাড ডোনার ক্লাব).

সংগঠনের সাধারন সম্পাদক সোয়াইব আহম্মেদ বলেন,আমরা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করি। অনেক সময় গভীর রাতে অনেকে রক্তের জন্য ফোন করেন। তখন রক্তদাতা সংগ্রহ করে দিতে হয়। রক্ত পাওয়ার পর রোগীকে যখন সুস্থ হতে দেখি, তখন সব কষ্ট ভুলে যাই।

সংগঠনের সদস্য হুমায়রা বলেন, আমি প্রথম থেকেই এই ক্লাবের সাথে যুক্ত আছি। আমার মতে, প্রত্যেক সুস্থ ব্যক্তির নির্দিষ্ট সময় পর পর রক্ত দেয়া উচিত।’ আরবিডিসিতে সহযোগীতায় আছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে থাকেন। তাছাড়া রাণীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ আরও অনেকেই আমাদের পাশে থাকেন।

উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের আব্দুল মান্নান বলেন, আমার অসুস্থ বাবার জন্য এ পজেটিভ রক্ত খুঁজছিলাম। তিন মাস আগে বাবা ব্রেইন স্ট্রোক করেন। রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ায় প্রতি মাসে দুইবার তাকে রক্ত দিতে হয়। এই নিয়ে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পরেছিলাম। পরে রাণীনগর ব্লাড ডোনার ক্লাবের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করলে তারাই রক্তের ব্যবস্থা করে দেন।

এ বিষয় ক্লাবের সভাপতি মারুফ আহম্মেদ বলেন,আমরা ভালো কাজের সাথে জড়িত থাকতে চাই। রানীনগর ব্লাড ডোনার ক্লাবটা আসলে নামের দিক থেকে রক্ত সংগ্রহের সাথে সম্পর্ক এটাই হয়ত বোঝায় কিন্তু আসলে এই ডোনার ক্লাব মুমূর্ষু রোগীদের রক্তের প্রয়োজনে রক্ত সংগ্রহ ছাড়াও অসহায়, নিম্নবিত্ত মানুষদের পাশে দাড়ায়।বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করে থাকে।

সংগঠন নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, রক্ত দেওয়া শরীরের জন্য কোন ক্ষতিকর দিক নয় রক্তদান করার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের মধ্যে অবস্থিত বোন ম্যারো প্রতিদিন ২০০ বিলিয়ন নতুন রক্ত কোষ তৈরি করে। এছাড়া আজকে অন্যের বিপদে রক্তদান করতে এগিয়ে আসলে কালকে নিজের বিপদেও রক্ত পাওয়া যাবে।

এ বিষয়গুলো জনগণের মধ্যে প্রচার করে সবাইকে রক্তদানে উৎসাহিত করা এবং সংগ্রহে সহযোগিতা করে হাজারো মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচানো এবং সুবিধা বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের প্রত্যাশা।

আরবিডিসি ইতিমধ্যেই রাণীনগর উপজেলা ছাড়িয়ে রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা বিভাগে তাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রত্যেক সদস্যদের ইচ্ছা ভবিষ্যতে সারা বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগে কাজ করার।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে