৫১ দিনের দুধের শিশুকে নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন মা

প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২২; সময়: ৬:৫৫ pm |
৫১ দিনের দুধের শিশুকে নিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন মা

এম এ আলিম রিপন, সুজানগর : শুরু হয়েছে ২০২২ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। পরীক্ষাকেন্দ্রের একটি কক্ষে মাঝের এক বেঞ্চে এক ছাত্রী বসে পরীক্ষা দিচ্ছেন। সাধারণ এক দৃশ্য কিন্তু একটু খেয়াল করলেই অসাধারণত্বটা চোখে পড়ে। তাঁর কোলে মাত্র ৫১ দিনের এক শিশু।

গত রবিবার পাবনার সুজানগর নিজাম উদ্দিন আজগর আলী ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্র্রে গিয়ে এই ঘটনা দেখা গেল। আমি পরীক্ষা দেব, এটাই ছিল আমার ইচ্ছা। তাই ৫১ দিনের নবজাতককে নিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছি বললেন পরীক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানা। প্রায় ২০ বছর বয়সী রাজিয়া সুলতানা এবারের রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। অদম্য তাঁর ইচ্ছাশক্তি। পরীক্ষার পর কথা বলে জানা গেল, গত সেপ্টেম্বর মাসের ১৪ তারিখ রাতে পাবনার একটি বেসরকারী ক্লিনিকে এই মায়ের কোল আলো করে আসে এক কন্যা সন্তান।

সন্তান জন্মের ৫১ দিন পর পরীক্ষা। রাজিয়া সুলতানা তবু চলে আসেন পরীক্ষা দিতে। সন্তানের নাম রেখেছেন মোছা.সানজানা সুলতানা।পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের কাঁচীপাড়া গ্রামের মো.সাগর খন্দকারের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা। এসএসসি পর্যন্ত স্বামী- স্ত্রী একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই শ্রেণীতে পড়াশুনা করলেও বর্তমানে রাজিয়া সুলতানার স্বামী দুবলিয়া হাজী জসিম উদ্দিন ডিগ্রি কলেজে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ালেখা করার পাশাপাশি করছেন ব্যবসা। রাজিয়া সুলতানা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। পরিবারের সবাই তাঁকে সহায়তা করেছেন। ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের রাজা হোসেন বিশ্বাসের মেয়ে রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে সাবেক ইউপি সদস্য ও একই গ্রামের সুলতান খন্দকারের ছেলে সাগর খন্দকারের সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের পরও রাজিয়া সুলতানা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান।

২০২০ সালে তিনি পাবনা সদরের কাঁচীপাড়া নওশের মন্ডল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মানবিক শাখা থেকে জিপিএ-৩.৬৭ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন সুজানগর পৌর শহরের সুজানগর মহিলা ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি মানবিক শাখায়। সুজানগর মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী জানান,রাজিয়া সুলতানা এই কলেজ থেকে ২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক শাখা থেকে অংশগ্রহন করেছে। তার পরীক্ষার রোল নং-২৪২৩৯১,রেজি নং ১৭১২৭১৯৬৮৯।

রাজিয়া সুলতানার মা রুপালী খাতুন বললেন, মেয়ে আমার ধৈর্যশীল ও সংগ্রামী। রাজিয়া সুলতানার শ্বশুর সুলতান খন্দকার যোগ করলেন, আমার পুত্রবধূ বিয়ের পর লেখাপড়া বন্ধ না করে রাত জেগে লেখাপড়া করেছে। সুজানগর নিজাম উদ্দিন আজগর আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ এবং পরীক্ষাকেন্দ্রের সচিব আলমগীর হোসেন বলেন,আমার ২৪ বছর শিক্ষকতা জীবনে এমন পরীক্ষার্থী মা কখনো দেখিনি। এ রকম আত্মপ্রত্যয়ী মায়েরা যেন শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থানের নিশ্চিত সুযোগ পান। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো.তরিকুল ইসলাম বলেন,পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে বিষয়টি আমার নজরে আসলে কেন্দ্র সচিবের সঙ্গে কথা বলে পরীক্ষা হলের পাশের রুমে ব্রেস্ট ফিডিং এর ব্যবস্থা করে দেই।

সেখানে একজন ওই শিশুকে কোলে করে রাখবেন পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে যতবার বাচ্চার প্রয়োজন ততবার তার মা যেন এসে তাকে দুধ পান করাতে পারেন। তিনি আরোও বলেন, নারীরা এখন যে কত আত্মনির্ভরশীল হয়েছে,তার একটা দৃষ্টান্ত এই পরীক্ষার্থী মা। নিজেদের মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে নারীরা আর পিছিয়ে থাকবে না। অন্য নারীরা তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হবেন এবং এগিয়ে যাবেন এমন প্রত্যাশাও করেন তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে