জেল হত্যা: বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য একজন কামারুজ্জামান

প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২২; সময়: ১১:১০ pm |
জেল হত্যা: বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য একজন কামারুজ্জামান

এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন : ‘দেশপ্রেমিক রাজনীতিকেরা সবসময় দেশের জন্য মৃত লাশ হতে প্রস্তুত থাকে কিন্তু কখনোই হত্যার আদেশ দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার বন্দোবস্তে যায় না।’ এমন উক্তিকে ধারণ করেই একান্ন বছরের বাংলাদেশকে যে কেহ একবার দেখে নিতে পারে। তৃতীয় চোখ দিয়ে।

একদিকে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নিথর দেহ পড়ে থাকা এবং তা সে লাল সবুজের বাংলাদেশের জন্যই। অন্যদিকে প্রতিবিপ্লবকারীদের হত্যা করার উৎসবে শাসকশ্রেণি হয়ে পড়ার অযাচিত প্রেক্ষাপট… কষ্ট তাই পাই। আজও ভুলিনি, ভুলতে পারব না। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত জাতির জনক, আমার বাবা এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও পিতৃতুল্য তিন চাচা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও মনসুর আলীর পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার এমন নৃশংস কু উদ্যোগের জবাব দিতে ইচ্ছে করে। মন কে স্বান্তনা দেয়ার অযুতবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হল। বাঙালির ভাষা ললাটে ধূসর অস্ত্রের আমদানীতে জাতি নির্বাক হয়ে যখন সবকিছু অবলোকন করছে, ঠিক একই ধারাবাহিকতায় পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়।

অনভিপ্রেত এবং অতি অবশ্যই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়ে এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। সারা পৃথিবীর রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের মধ্যে এমন কালো অধ্যায়ের জন্ম নেয়া নিয়ে উন্নত দেশগুলো বা সংস্থাগুলোর কথিত মানবাধিকার চাইবার দাবী নিয়মিত সংস্কৃতির অংশও হতে পারেনি।

৩ নভেম্বর, ১৯৭৫। উপলক্ষ তাড়িত ট্র্যাজিক দিবস হিসাবে আমরা কেহ কেহ জেলহত্যা ইস্যু নিয়ে কলম ধরছি। অভিমানের উচ্ছ্বাসে রাজনৈতিক ধারাভাষ্য দিয়ে ইতিহাস সংকলনের একটা চেষ্টা ! আমি কী লিখবো ? সন্তান হিসাবে কি বলব? বঙ্গবন্ধু ও তাঁর তনয়ার আদর্শের সৈনিক হিসাবে রাজনৈতিকভাবে কী লিখবো ? ফলত, জানা নেই।

আমার স্মৃতির পাতার জেল হত্যা এক বেদনা বিধুর ঘটনা। আমার বাবা এ এইচ এম কামারুজ্জামান যেদিন শহীদ হলেন, আমি ও আমার ছোট ভাই স্বপন তখন কলকাতায় রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে লেখাপাড়া করছি। বাবার মৃতদেহটি দেখার কোন সুযোগ আমরা পাইনি।

বাবা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এক অতন্ত্র সৈনিক। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ তার জীবনভাবনার মূল সোপান ছিল। সারাটা জীবন তিনি সেই আদর্শ ভাবনাকে অবিচল নিষ্ঠা এবং সাধনায় ব্রত হয়ে পালন করে গেছেন। নিমগ্ন থেকেছেন সত্য ও নীতির পথে। বঙ্গবন্ধুর নিঃস্বার্থ সহযোদ্ধা হিসেবে আপোস করেননি ১৫ আগস্টের হত্যাকারী খুনীচক্রের সাথে। শুধু আমার বাবা নন, অন্য তিন জাতীয় নেতাও ছিলেন একই রকমের ইস্পাতসম মনোবলের অধিকারী।

আমার মায়ের কাছে শুনেছি, সেদিনের নিকষ কালো তিমির রাত্রি করে ঢাকার রাজপথে ছুটে চলা একটা জলপাই রঙের জীপ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে দাঁড়িয়ে গেলো। লাকিয়ে নামলো কয়েকজন কালো পোশাক পরিহিত অস্ত্রধারী। কারারক্ষীদের গেট খোলার নির্দেশ দিল তারা। কারারক্ষীরা শীর্ষ নির্দেশ ছাড়া তারা গেট খুলবেন না। অগত্যা বঙ্গভবনে ফোন করলো খুনিরা। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে যে নির্দেশ এসেছিল সেটা আমাদের সকলেরই জানা। বঙ্গভবনের নির্দেশ পেয়ে গেট খুলে দিলো কারারক্ষিরা। অস্ত্রধারীদের ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ করে দিতে বাধ্য করা হলো তাদের।

ভেতরে ঢুকে তাদের আবদার অনুযায়ী জাতীয় চারনেতা তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আমার বা .এইচ.এম.কামারুজ্জামানকে ১নং সেলে একসাথে জড়ো করার আদেশ দেয়া হলো। অস্ত্রের মুখে বাধ্য হয়ে তারা সে নির্দেশ পালন করলেন। খুনি মোসলেম বাহিনী সেই ১নং সেলে ব্রাশফায়ারে নিভিয়ে দিলো জাতির সূর্য সন্তানদের জীবন প্রদীপ। সেকেন্ডের ব্যবধানে হারিয়ে গেল বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর অন্যতম চারনেতার প্রাণ স্পন্দন।

বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের জন্য ও ইতিহাসের সাথে যাদের নিবিড় সম্পর্ক, সেই গুণী মানুষগুলো হারিয়ে গেলেও হারায়নি তাদের অমর কৃতিত্ব ও অসীম অবদান। তাঁরা গণমানুষের অকুন্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছিলেন বলেই আজও আমরা তাঁদের সন্তান হিসেবে মানুষের কাছে পৌছুতে পেরেছি।

দেশবাসী অবগত আছেন যে, আল্লাহর অশেষ রহমত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার অশেষ স্নেহ ও নির্দেশনায় এবং প্রিয় রাজশাহীবাসী ভালোবাসায় আমি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। দেশের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলির সদস্য হতে পেরেছি। জাতির পিতা ও আমার বাবার রেখে যাওয়া কাজগুলো সমাধান করার প্রয়াসে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করার সুযোগ পেয়েছি।

বাবার অনেক স্বপ্ন ছিলো রাজশাহীকে নিয়ে। তিনি যখনই সুযোগ পেয়েছেন রাজশাহীর কথা জাতীয় পর্যায়ে পেশ করে এর উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। রাজশাহীতে খেলাধুলার পরিবেশ তৈরির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন তিনি। তিনি জানতেন, খেলাধুলার মাধ্যমে গড়ে উঠবে সুস্থ ও সুন্দর যুব সমাজ। তিনি বেশ কিছুদিন রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সমিতির সম্পাদকের দায়িত্ব¡ও পালন করেন।

বাবা বেশ ধর্মভীরু ছিলেন। ছোটবেলায় আমরা তাঁকে নিয়মিত নামায আদায় ও পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতে দেখেছি। তিনি এতো দ্রুত কুরআন তিলাওয়াত করতেন যে, তাঁকে কুরআনের হাফেজ বলে মনে হতো। তবে পরের দিকে বিশেষ করে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশের জন্য তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তাঁকে আমরা বাসায় তেমন দেখতে পেতাম না। যতক্ষণ বাসায় থাকতেন সর্বক্ষণ নেতা-কর্মীদের দ্বারা সন্নিবেষ্টিত হয়ে থাকতেন। এর ফলে আমরা তেমন বাবার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেতাম না। আমরা সব ভাই-বোনই বেশ মিস করতাম তাঁকে। এজন্য আমাদের মাঝে মাঝে রাগও হতো।

বাবা অত্যন্ত নরম স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তাই বলে আমরা তাঁকে ভয় পেতাম না, এমন নয়। তাঁর চোখের দিকে তাকানোর সাহস আমাদের ছিল না। কোন অপরাধ করলে শুধু নাম ধরে ডাকলেই আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যেতো। বাবার বড় এবং ছোটমেয়ে উভয়েই খুব প্রিয় ছিলো। বড় আপা পলিকে বাবা বেশী ভালবাসতেন। মায়ের সংস্পর্শেই আমরা বড় হয়েছি। আমার মায়ের ছিল অসীম ধৈর্য। তিনি বাবার রাজনৈতিক সঙ্গীদের যথেষ্ট সম্মান করতেন। মায়ের ওই উদারতা ও সহায়তা না থাকলে বাবার পক্ষে অত বড় নেতা হওয়া হয়তো সম্ভব ছিল না।

প্রচলিত একটি কথা আছে যে, প্রত্যেক সফল পুরুষের পেছনে কোনো না কোনোভাবে একজন নারীর অবদান আছে। এ কথাটা আমার মায়ের ক্ষেত্রে দারুণভাবে প্রযোজ্য বলে আমাদের মনে হয়। বিশেষকরে স্বাধীনতার নয় মাস ছোট ছোট ছেলে-মেয়েসহ তিনি যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে দিন কাটিয়েছেন সেটা সম্ভব না হলে বাবার পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হতো কিনা, বলা মুশকিল। বলাবাহুল্য, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেসাও ছিলেন অসীম ধর্যের অধিকারী। তিনিও আজীবন বঙ্গবন্ধুর সকল কর্মের প্রেরণা ছিলেন।

বাবা ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে তিনি প্রথম নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণও তাঁর পিতা আবদুল হামিদের সাথে রাজনীতি নিয়ে এক চমকপ্রদ ঘটনার কথা আমরা শুনেছি। ঐ ঘটনাটা তখনকার দিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আজও অনুস্মরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বলে রাখা জরুরি যে, আমার দাদা আবদুল হামিদ রাজশাহী অঞ্চল থেকে দীর্ঘদিন মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে তাঁর ছেলে কামারুজ্জামান নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে আবদুল হামিদ নির্বাচন থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেন।

বাবা জানতেন পিতা প্রতিদ্বন্দ্বী হলে তাঁর পক্ষে নির্বাচনে জয়লাভ কোনক্রমেই সম্ভব নয়। তাই তিনি মায়ের কাছে আবদার করলেন, বাপজানকে বুঝিয়ে যেন নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চেষ্টাটা করেন ! অগত্যা আবদুল হামিদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন। নির্বাচনী এলাকা সফরে গিয়ে ভিন্নচিত্র প্রত্যক্ষ করলেন আমার বাবা। এলাকার মুরুব্বিদের বক্তব্য হলো, দীর্ঘদিন মুসলিম লীগের প্রতি সমর্থন করাতে অভ্যস্ত বিধায় তারা হেরিকেন (মুসলিম লীগের নির্বাচনী প্রতীক) ছাড়া অন্য কোন মার্কায় ভোট দিতে পারবেন না।

আবদুল হামিদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বাবাকে দায়ী মনে করে, তারা তাঁকে সমর্থন দেয়া থেকে বেঁকে বসলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে বাবা বহুচেষ্টা তদবীর করে অন্তত একটা জায়গায় রফা করতে সমর্থ হলেন যে, আবদুল হামিদ সাহেব যদি এলাকায় এসে তাঁর পক্ষে ভোট চান, তাহলে তারা বাবাকে ভোট দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন—- অন্যথায় নয়। এমন একটি পরিস্থিতিতে বাবা তাঁর বাপজানের কাছে কথাটা বলতে সাহস না পেয়ে মায়ের কাছে বায়না ধরলেন, পিতা যেনো তাঁর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু আবদুল হামিদের কাছে কথাটা বলতেই তিনি প্রচন্ড রেগে গেলেন। একটা দলের সভাপতি হয়ে তিনি অন্য দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না, সে যেই হোক, এটা তাঁর সাফ কথা।

বাবা হতাশ হয়ে এক রকম প্রচারণা বন্ধ করে দিয়ে বাড়িতে বসে রইলেন। পিতার সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। এটা তিনি বুঝতে পারছিলেন। সুতরাং মাঠে গিয়ে লাভ কি? তাই তিনি জানিয়ে দেন পিতা তাঁর পক্ষে কাজ না করলে তিনি আর নির্বাচন করবেন না। এভাবেই কিছুদিন চলে গেলো। সত্যি সত্যিই ছেলে নির্বাচনী কাজে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকায় পিতা আবদুল হামিদ নিজেই চিন্তায় পড়ে গেলেন। ছেলের জীবনের প্রথম নির্বাচনে ভরাডুবির আশংকায় তিনি নিজেও বিচলিত হয়ে পড়লেন।

অগত্যা রাজশাহী জেলার মুসলিম লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নাটোরের মধু চৌধুরীকে ডেকে তিনি তার হাতে দলের সভাপতি ও সাধারণ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের আবেদনপত্র দু’টি ধরিয়ে ঘটনা খুলে বললেন। পরে পুত্রের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে তাঁকে বিজয়ী করতে সক্ষম হলেন। বাবার সেই বিজয় প্রথম হলেও আর কখনও তিনি কোন নির্বাচনে পরাজিত হননি।

তবে দাদা আবদুল হামিদের এ রাজনৈতিক নৈতিকতার ঘটনা সর্বসময়ের জন্যই বিরল দৃষ্টান্ত তাতে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এ ঘটনা শিক্ষার বার্তা বয়ে আনতে পারে। সেই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আমার দাদা আবদুল হামিদের সুযোগ্য সন্তান এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও তাঁর নাতিদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আজও জাতীয় নেতার আসনে রয়েছেন।

আমার বাবা তার আদর্শভিত্তিক নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির কারণে ৬২ থেকে ৭৫ এই ১৩ বছরের মধ্যে অনুষ্ঠিত কোন নির্বাচনেই কখনও পরাজিত হননি। এটা সম্ভব হয়েছিলো তাঁর অসাধারণ কর্মদক্ষতা, গণমুখী সাংগঠনিক তৎপরতা আর চূড়ান্ত রাজনৈতিক সততার কারণে। এরই ফলশ্রুতিতে তিনি রাজশাহীবাসীকে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সামিল করতে পেরেছিলেন। তাঁর এই দক্ষতা ও যোগ্যতাই তাঁকে তৎকালীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির মতো দলের সর্বোচ্চ পদে সমাসীন করেছিলো।

৩ নভেম্বর সকালেই বাবার মৃত্যু সংবাদ জানতে পারেন আমাদের মা। মা অত্যন্ত ভেঙ্গে পড়েন। অনেক চড়াই উতরায় পার হয়ে যে মানুষটি কখনও আশাহত হননি সেই মানুষটি বাবার মৃত্যু সংবাদে কেমন মুষড়ে পড়েছিলেন ! এ সময় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী আর আত্মীয়-স্বজনে ভরে যায় আমাদের বাড়ি। মা চাচ্ছিলেন বাবার লাশটা রাজশাহীতে এনে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করতে। কিন্তু খুনিরা তাতে বাঁধ সাধে। মা তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। বাধ্য হয়ে বাবার মৃতদেহ রাজশাহীতে আনার অনুমতি দেয় ঘাতকচক্র।

তবে বাবার লাশ কাউকে দেখতে দেয়া হয়নি। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার করুন বেদনা ও দহন সহা করেই আমার মা এবং আমরা জীবনসংগ্রাম করেছি। মায়ের কাছে শুনেছি, বাবার রক্তমাখা লাশটার বুকের ওপর চালচাপা দেয়া ছিলো। মুখটা দেখে মনে হয়, কি নিদারুণকষ্টে তাঁর জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। কি অপরাধ ছিলো বাবার, যার জন্য তাঁকে হত্যা করা হলো? এর জবাব কে দেবে? কারো কাছে আছে ?

মাত্র ৫২ বছরের জীবনে তিনি অর্ধেকটাই কাটিয়েছেন আন্দোলন আর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অন্যান্য জাতীয় নেতাসহ বাংলাদেশকে স্বাধীন করার কাজে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। নিজের স্ত্রী-সন্তানের দিকে তাকাবার ফুরসৎ পাননি, সেই মানুষটাকে হত্যা করা হলো ! কেন করা হল, তা বলার সময়ও হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আমার বাবাসহ অপরাপর তিন নেতা বেঁচে থাকলে সবকিছু রাজনৈতিক অপশক্তির ইচ্ছায় হতে পারত না। কারণ, জাতীয় ওই চার নেতার দেশ ও দল পরিচালনা করার ক্ষমতা ছিল। একবার কী এই প্রজন্ম চিন্তা করতে পারে, শেখ হাসিনা যদি আমার বাবাদেরকেও ১৯৮১ সালের পরে পেয়ে যেতেন, আওয়ামী লীগকে কী রোধ করা যেত ? সামরিক শাসকেরা যত্রতত্র ক্ষমতার মসনদে বসতে পারত ? ক্ষমতার বিরাজনীতিকরণ হতে পারত ? গণতন্ত্রের জায়গায় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারত ? জিয়া নামের এক শাসক কে কি বলা যায় ? ঘাতক, নাকি স্বৈরাচার ? হ্যাঁ কিংবা না ভোটের প্রচলনের মাধ্যমে কে গণতান্ত্রিক আবহে স্বৈরতন্ত্রকে পরিচিত করে তুলেছিলেন? আমার বাবারা বেঁচে থাকলে মোশতাক- জিয়া-এরশাদদের কথিত শাসন চলত না এই বাংলায়।

এদিকে ১৯৮১ সালের ১৯ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রিয় জন্মভূমিতে ফিরে এসে তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের খুনিদের বিচারের সাথেসাথে জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচারের দাবিতেও সোচ্চার ছিলেন। তাঁর শাসনামলে বিচার হয়েছে। জাতি কলংকমুক্ত হয়েছে। ১৯৮১ সালের ১৯ মে থেকেই জননেত্রী শেখ হাসিনা চার জাতীয় নেতার পরিবারের সদস্যদের অতি আপনজনের মতো আগলে রেখেছেন।

বড় বোনের স্নেহ দিয়ে তিনি আমাদের নির্মাণে সদা সহযোগিতা করে চলেছেন। আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আমি মহান আল্লাহর দরবারে তাঁর সুস্থতা কামনা করি। তিনি বেঁচে থাকলেই বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে বিশ্বকে জানান দিতে পারবে, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি ! এগিয়ে যেতেই হবে।

প্রতি বছর ৩ নভেম্বর ফেরে ! শোকার্ত অনুভবে বাবার ওই দুই মায়াবী চোখের মাঝে দৃষ্টি দিলেই প্রদীপ ভাসে। যে প্রদীপের শক্তি আমাকে বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি করতে তাগিদ দেয়। আমার পরিবারের সেই রক্ত, যে রক্ত বেঈমানি করতে জানে না। বাবা বঙ্গবন্ধুর জন্য আনুগত্যের ঘড়্গ নিয়ে দেশপ্রেমকে স্বাগত জানিয়ে জীবনই দিয়ে গেছেন। আমি তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনার ভাই হিসাবে তাঁর জন্য জীবন সঁপে দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। বাবার সৎ আত্মা আমার পিছু নেয়। তাগিদ রাখেন, “তুমি এগিয়ে যাও। বাংলাদেশের জন্য, আওয়ামী লীগের জন্য সেরাটা দাও”।

এক ফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি প্রায়শই। আমার বাবার চিরপ্রস্থানকে মেনে নিতে পারিনি, পারব না। উইনস্টন চার্চিলের বিখ্যাত মতবাদ আমার অহোরাত্রগুলোকে অনুসন্ধানী ও সত্যান্বেষী করে বলে, “যখন ভিতরে কোন শত্রু থাকে না, তখন বাইরের শত্রুরা তোমাকে আঘাত করতে পারে না।”
জয় বাংলা ! জয় বঙ্গবন্ধু ! জয় শেখ হাসিনা ! বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক : সভাপতিমন্ডলির সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও মেয়র, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে