সবার জন্য শিক্ষা: প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে সামাজিক সচেতনতা

প্রকাশিত: অক্টোবর ১, ২০২২; সময়: ৯:২৭ pm |
সবার জন্য শিক্ষা: প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে সামাজিক সচেতনতা

মো. সোহেল রানা : সবার জন্য শিক্ষা কর্মসূচীকে অবিকতর কার্যকর ও ফলপ্রসু এবং আইনগত ভাবে স্বত:সিদ্ধ করার লক্ষে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচী হাতে নেয় বর্তমান সরকার। দেশের ৬+ থেকে ১০+ বয়সী সকল শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করে তোলা এবং ৫ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা সফলভাবে শেষ করাই এই কর্মসূচীর মূল লক্ষ্য।

এই লক্ষ্যে ৫০টি প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করানোর নীতিমালা করে দেয় আছে যা শিক্ষার দৈহিক, মানসিক সামাজিক, নৈতিক, নান্দনিক, মানবিক বিকাশে সাধন করে তাকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। এই লক্ষকে সামনে রেখে প্রাথমিক শিক্ষার ২২টি উদ্দেশ্য রয়েছে।

এই কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানান সমস্যা বাধা হয়ে এসেছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল “বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া” এই ঝরে পড়া সমস্যার কারণে প্রতি বছর নিরক্ষর লোকের সংখ্যা বাড়ছে এবং সরকারের এই খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের যেমন অপচয় ঘটছে তেমনি সবার জন্য শিক্ষা এই টার্গেট থেকে আমরা এখনো পিছিয়ে পড়ে আছি। এছাড়া দাতা দেশ সমূহ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার কিছু কারণ সমন্ধে আলোচনা করা যাক।

এই ক্ষেত্রে শিশুর পিতা-মাতার দারিদ্রতা একটি বিশেষ কারণ, অস্বচ্ছল পরিবারের শিশুর মৌলিক চাহিদার অপূর্ণতার কারণে বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। খাবারের অভাবে, জামা কাপড়ের অভাবে শিশু বিদ্যালয় বিমুখ হয়ে উঠে। এসব শিশু বিদ্যালয় ভর্তি হলেও এক সময় ঝরে পড়ে। দারিদ্রতা তার শিক্ষার সুযোগ কেড়ে নেয়। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা প্রায়ই পুষ্টির অভাবে নানা রোগে ভোগে। রোগাক্রান্ত শিশু স্বভাবতই শারীরিক অশান্তি নিয়ে বিদ্যালয় কার্যক্রমকে পছন্দ করে না। এর ফলেও বহু শিশু ঝরে পড়ে। টাকা পয়সার অভাবে ঠিকমত খাতা-কলম কিনতে পারে না, পরীক্ষার ফি দিতে পারে না এবং এর জন্য শিক্ষকদের বকা ঝকা খাওয়ার ভয়ে বিদ্যালয় বিমুখ হয়ে যায়।

এছাড়া কাছাকাছি বিদ্যালয় না থাকাও ঝরে পড়ার একটি কারণ, আবার আমাদের মোট জনসংখ্যার ১০% প্রতিবন্ধি বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু যেমন শারীরিক মানসিক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুর। বিদ্যালয় অবকাঠামোগত পরিবেশ এবং সমাজের অসচেতনতার কারণে সমাজের বিরাট একটি অংশ প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। আবার বিদ্যালয় পরিবেশ তথা শিক্ষার প্রতি ভীতি অনআকর্ষনীয় বিদ্যালয় ব্যবস্থা ও ঝরে পড়ার একটি বড় কারণ। আনন্দ ** পরিবেশ না থাকা এই সব শিশুর বিদ্যালয় বিমুখ হওয়ার কারণ।

গতানুগতিক পদ্ধতিতে পাঠদান করাও এর জন্য দায়ী। এছাড়া আরও বড় কারণ হল শিশু শ্রম অস্বচ্ছল পরিবারের পিতা-মাতা সামান্য কিছু অর্থের লোভে শিশুদের কর্মে নিয়োজিত করে থাকে অবশ্য এই জন্য আমার শিশুর পিতা-মাতাকে পুরাপুরি দোষ দেয়া যায় না, এই ক্ষেত্রে শিশু শ্রম আইন কঠোর ভাবে পালন করলে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।

তবে এত কিছুর পরও আমরা হতাশ নয় আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জনে আলো দেখতে পাচ্ছি সরকারের কিছু পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে যেমন প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হয়েছে, এছাড়া অস্বচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিশুদের জন্য সরকার শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম চালু করেছে। উপবৃত্তির টাকা থেকে শিশুদের জন্য বই, খাতা, জামা-কাপড় কেনা সহজ হচ্ছে। তবে এই উপবৃত্তি ৪০% এর স্থলে আমার সুপারিশ থাকবে অন্তত ৮০% করা এবং সবচেয়ে ফলপ্রসূ হবে যদি আমরা শিশুদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে পারি।

ঝরে পড়া রোধ কল্পে ADB এবং বিশ্ব ব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের সহযোগীতায় Rose প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প থেকে আনন্দ স্কুল নামে দেশের বেশকিছু উপজেলায় ৭+ থেকে ১৪+ বয়সী ঝরে পরা শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। এবং এই সব বিদ্যালয় শিশুদের পোশাক এবং ভাতার ব্যবস্থা করেছে। বিদ্যালয়কে আকর্ষণীয় করার জন্য PEDP -২ নামে একটি প্রকল্প কাজ করছে এই প্রকল্প থেকে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য চরম এর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এছাড়া শ্রেণী পাঠকে আকর্ষণীয় করার জন্য বাস্তব এবং বস্তু নিরোপেক্ষ পাঠ সংশ্লিষ্ট উপকরণের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি কর্তৃক। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় একটি পদক্ষেপ হল একীভূত শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু থেকে স্তর করে সমাজের সকল সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একই বিদ্যালয়ে একই শিক্ষার মাধ্যমে সমাজের মধ্যে রেখেই মূল ধারায় নিয়ে আসা, যা ঝরে পড়া রোধে ও সবার জন্য শিক্ষা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

লেখক- মো. সোহেল রানা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, দুর্গাপুর, রাজশাহী।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে