কারা আসছেন প্রশাসনের শীর্ষ পদে, চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২২; সময়: ১০:২৫ am |
কারা আসছেন প্রশাসনের শীর্ষ পদে, চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর আগে চলতি বছরের শেষে এবং আগামী বছরের শুরুতে প্রশাসনের শীর্ষ বেশ কয়েকটি পদ শূন্য হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে কে আসছেন তা নিয়ে চলছে নানা হিসাবনিকাশ। একদিকে সরকারের পক্ষথেকে থেকে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

অপরদিকে এসকল পদের প্রার্থিদেরও চলছে জোর চেষ্টা ও তদবীর। এই অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে কারা আসছেন তা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চলছে তুমুল আলোচনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে সচিবালয়, সবখানে এই আলোচনা চলতে দেখা গেছে। শূন্য পদে নতুন মুখের ব্যাপারে যেমন গুঞ্জন আছে তেমনি পুরনোদের মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে বলেও আভাস পাওয়া যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে।

জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছরের শেষের দিকে। গুরুত্বপূর্ণ এই দুই পদে কে আসছেন তা নিয়ে বঙ্গভবন ও সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে চলছে নানা গুঞ্জন। তারা মেলাচ্ছেন হিসাব-নিকাশ।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদও শূন্য হচ্ছে। কে হচ্ছেন পরবর্তী জনপ্রশাসন সচিব তা নিয়ে বেশ জোরেশোরে চলছে আলোচনা। প্রশাসনে রদবদল নিয়মিত কাজের অংশ। তবে উচ্চ পর্যায়ের পদে নিয়োগ ও রদবদলের বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী বছর জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় এবারের নিয়োগ বা বদলির বিষয়ে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করছে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল।

সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, দুই সিনিয়র সচিবসহ ১০ জন সচিব আগামি ডিসেম্বরে চাকরি শেষে অবসরে যাবেন। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবসহ তিন সচিবের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। ফলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, জনপ্রশাসন সচিব এবং ১৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবসহ প্রশাসনের শীর্ষ পদ শূন্য রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত দুই থেকে তিনজন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশাসনে সিনিয়র সচিব/সচিব পদমর্যাদার ৮৫ জন কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক কর্মরত আছেন। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এই সংখ্যা ৭৬। তাঁদের মধ্যে বিসিএস ১৯৮২ নিয়মিত ও স্পেশাল ব্যাচের একজন করে, ১৯৮৪ ব্যাচের পাঁচজন, ১৯৮৫ ব্যাচের দুজন, ১৯৮৬ ব্যাচের ১২ জন, নবম ব্যাচের ১০ জন, দশম ব্যাচের ২৫ জন এবং একাদশ ব্যাচের ২০ জন রয়েছেন।

ওনাদের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিবসহ ১৩ জন চুক্তিভিত্তিক কাজ করছেন। চলতি বছরের ১০ জন সচিব ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ২৬ জন সচিব আগামী বছর (২০২৩) অবসরে যাবেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ডিসেম্বরে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব আখতার হোসেন অক্টোবরে অবসরে যাচ্ছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আলী আজম এবং ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান অমিতাভ সরকার নভেম্বরে অবসরে যাচ্ছেন। এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মামুন আল রশিদ, বিপিএটিসির রেক্টর রমেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব এম খলিলুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এম সাইদুল ইসলাম এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব এম মোকাম্মেল হোসেন অবসরে যাচ্ছেন ৩১শে ডিসেম্বর।

১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সচিব হওয়ার দুই বছর পূর্ণ করবেন। ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ত্রয়োদশ ব্যাচের কর্মকর্তারা সচিব পদে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করবেন। আগে প্রশাসনে এক বছর অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালনের পর ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দেয়ার রেওয়াজ ছিল। এখন তা পরিবর্তন করে অতিরিক্ত সচিব পদে দুই বছর পার হলে সরাসরি সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে কে এম আলী আজমের মেয়াদ ২ নভেম্বর শেষ হচ্ছে। সাধারণত এই পদে থাকা সচিবদের মেয়াদ বাড়ানো হয় না। এছাড়া মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিগত সময়ে কমপক্ষে দুই বছরের চাকরির মেয়াদ। এই পদের জন্য বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম শোনা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় সরকার সচিব মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বিসিএস নবম ব্যাচের কর্মকর্তা। এর আগে তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার এবং রাজশাহীর ডিসি ছিলেন। তার মেয়াদ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত।

এছাড়া এ পদে একাদশ ব্যাচের কর্মকর্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব কামরুল হাসান এবং বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানের নাম শোনা যাচ্ছে। কামরুল হাসান ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব ও মৌলভীবাজারের ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার কার্যকাল ১৪ এপ্রিল, ২০২৫ পর্যন্ত। আবু হেনা মোর্শেদ জামান, যিনি ১১ তম ব্যাচের মেধা তালিকায় প্রথম এসেছেন, তিনি সংবেদনশীল সরকারি অফিসে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ফরিদপুর ও নরসিংদীর ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কার্যকাল ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ পর্যন্ত। এই পদে ধর্ম সচিব কাজী এনামুল হাসানের নামও শোনা যাচ্ছে। তার অফিসের মেয়াদ ২৪ জুলাই, ২০২৫ পর্যন্ত।

সচিবালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রশাসনে রদবদল একটি রুটিন কাজ হলেও আগামী বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ায় প্রশাসনের শীর্ষ পদে কারা থাকছেন তা নিয়ে এবার আলোচনা কিছুটা বেশি। সরকারের মধ্যেও চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

ড. আহমদ কায়কাউসের বিদায়ে শূন্য হতে যাওয়া মুখ্যসচিব পদে কে নিয়োগ পেতে পারেন, তা নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন। মুখ্য সচিব পদে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার কথা বেশি শোনা যাচ্ছে। একই পদে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ারের নাম শোনা যাচ্ছে। দুজনের মধ্যে কবির বিন আনোয়ার জ্যেষ্ঠ। তোফাজ্জল হোসেন মিয়া প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হলে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস ১) মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব হতে পারেন বলে সচিবালয়ে আলোচনা চলছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের সচিবের পদটিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এ মন্ত্রণালয়ে জ্যেষ্ঠ সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন আলী আজম। আগামী ২ নভেম্বর তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ফলে এ পদে কে আসছেন, সেটি নিয়েও আলোচনা চলছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৫ ডিসেম্বর। তিনি ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। প্রথমে এক বছর পরে আরও দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সচিবালয়ের শীর্ষ নীতি-ব্যবস্থাপনা বিভাগ, যা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে কাজ করে। আর মন্ত্রিপরিষদ সচিব এ বিভাগের আনুষ্ঠানিক প্রধান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জনপ্রশাসনের শীর্ষতম পদও। এ পদে কে আসছেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে।

বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সততার পরিচয় দিয়ে আসছেন তিনি। এছাড়া তিনি সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেও পরিচিত। সেজন্য এ পদে আবারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে পারেন খন্দকার আনোয়ারুল। অবশ্য এ পদের জন্য অন্য কয়েকজনের নামও আলোচনায় আছে। এর মধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মাহবুব হোসেন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ারের নাম শোনা যাচ্ছে। এছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আলী আজমও চুক্তিতে এ পদে আসতে পারেন।

সাধারণত মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে চাকরিজীবনে তার পরিচ্ছন্ন ইমেজ বিবেচনায় নেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে বর্তমান জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মাহবুব হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে। বিসিএস ৮৬ ব্যাচের এই কর্মকর্তা এর আগে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব ছিলেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ার এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব আমিনুল ইসলামের নামও আলোচনায় আছে। তবে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামকে আরেকবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না সচিবালয়কেন্দ্রিক সূত্রগুলো। খন্দকার আনোয়ার ১৯৮২ সালের বিসিএস বিশেষ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনে রদবদল নিয়মিত কাজের অংশ। তবে উচ্চ পর্যায়ের পদে নিয়োগ ও রদবদলের বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী বছর জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় এবারের নিয়োগ বা বদলির বিষয়ে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করছে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল।

প্রশাসনের একাধিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে