গুগল যেভাবে বদলে দিয়েছে বিশ্ব

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২২; সময়: ১০:৫৫ am |
গুগল যেভাবে বদলে দিয়েছে বিশ্ব

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : কোথাও যেতে চান কিন্তু এলাকাটি আপনার কাছে অপরিচিত, কী করবেন? অনেকেই হয়তো একবাক্যে বলে দেবেন গুগল ম্যাপের কথা। কারণ এ ম্যাপে গন্তব্যস্থলের নাম-ঠিকানা দিয়ে সার্চ দিলে সেকেন্ডের মধ্যেই আপনাকে সম্ভাব্য সব রুট দেখিয়ে দেবে গুগল। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে এই সহজ উত্তরের পেছনে রয়েছে ব্যবহারকারী, উপগ্রহ, গাড়ি, এমনকি উট থেকেও সংগৃহীত ডেটার একটি জটিল সিস্টেম।

বর্তমানে প্রতি মাসে বিশ্বব্যাপী গুগল ম্যাপ ব্যবহার করেন ১ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ। গত ১৭ বছরে এটি ডেস্কটপ অ্যাপ্লিকেশন থেকে একটি বিশাল মোবাইল প্ল্যাটফর্মে বিকশিত হয়েছে, যা বিভিন্ন জায়গার অবস্থান সম্পর্কে ক্রমাগত তথ্য আপডেট করছে।

গুগল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা বিশ্বে তাদের ১৫ কোটিরও বেশি লোক রয়েছে যারা তথ্য আপডেট বা হালনাগাদে অবদান রাখছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন কমিউনিটি এবং সরকারি খাত থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি আপডেট পাওয়া যায়। তাই গুগল ম্যাপকে একরকম ‘জীবিত সত্ত্বা’ হিসেবেও ভাবা যায়।

তবে এটি যে পরিমাণ ডেটা সংগ্রহ করে তা মানুষের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছে উল্লেখ করে এর সমালোচনাও করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও গুগল সার্চ যে প্রযুক্তি খাতে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এই গুগলই যে বিশ্বকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে তা-ও অস্বীকার করার উপায় নেই। চলনু জেনে নেয়া যাক গুগল ম্যাপের পেছনের প্রযুক্তি সম্পর্কে।

গুগলে প্রায় সবকিছুরই অনুসন্ধান করা সম্ভব। তবে ডিজিটাল ম্যাপিংয়ের কথা আসলে একসময় প্রথম এমনকি তালিকার দ্বিতীয় স্থানেও ছিল না গুগল। কিন্তু ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন গুগল ম্যাপ চালু হয়, তখন এটিতে এমন সব প্রযুক্তি ছিল যা আগে কখনও দেখেনি বিশ্ব।

যুক্তরাষ্ট্রের হফস্ট্রা ইউনিভার্সিটির ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক এবং ডেটা চালিত জিওটেকনোলজি বিশেষজ্ঞ ক্রেগ বলেন, আমার মনে আছে যে দিন ব্রাউজারে স্যাটেলাইট চিত্রসহ গুগল ম্যাপ চালু হয়েছিল। সবাই সেখানে গিয়ে শুধু নিজের বাড়ির ছবি খুঁজছিলেন। কারণ এর আগে স্যাটেলাইট চিত্রে কেউ কখনও নিজের বাড়ি দেখেননি, বিশেষ করে রঙিন ছবিতে। পুরো বিশ্বের জন্য এটি ছিল এক নতুন দৃশ্য।

গুগল ম্যাপের এই সাফল্য প্রাথমিকভাবে সম্ভব হয়েছিল ‘হোয়্যার টু টেকনোলজি’ (জিপিএস নেভিগেশন সার্ভিস) এবং ‘কীহোল’ (সফটওয়্যার কোম্পানি)-এর মতো প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের কারণে, যা ম্যাপিংকে ভোক্তাদের কাছে আরও সহজলভ্য করে তুলেছিল।

জিওটেকনোলজি বিশেষজ্ঞ ক্রেগের মতে, কীহোল কেনার মাধ্যমে গুগল এমন একটি সফটওয়্যার পেয়েছিল যা সহজ, ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত এবং বিশ্বব্যাপী স্যাটেলাইট ইমেজ রিভিউয়ারের জন্য প্রয়োজনীয়। অন্যদিকে হোয়্যার টু টেকনোলজি তাদের দিয়েছে ভালো ইউজার ইন্টারফেস। আর গুগল অল্প ব্যয়েই এসব প্রযুক্তিকে এক করেছে এবং বিভিন্ন উপায়ে সেগুলোকে আরও বিকশিত করে এমন একটি সিস্টেম দাঁড় করিয়েছে, যা আগে দেখা যায়নি।

ডেভেলপারদের কাছে উন্মুক্ত করা, রাস্তার দৃশ্যকে একীভূত করা ও দ্রুত সময়ের মধ্যে অ্যান্ডয়েড এবং আইওএস অ্যাপ চালু করে নিজস্ব প্রযুক্তি দ্রুত প্রসারিত করেছে গুগল ম্যাপ। কিন্তু কীভাবে?

গুগলের জিও বিভাগের বর্তমান প্রধান ক্রিস্টোফার ফিলিপস জানান, অ্যাপলিকেশনের (গুগল ম্যাপ) মূল অংশটি ছিল একটি বাস্তব বিশ্বের মডেল। রাস্তার দৃশ্যসহ বাস্তব জগতে কী ঘটছে তার ডিজিটাল রূপও বলা যায় একে।

সঠিক একটি মানচিত্র তৈরি করতে স্যাটেলাইট এবং এরিয়াল ছবি দিয়ে যাত্রা শুরু করে গুগল। এটি করার জন্য তারা ‘ফটোগ্রামমেট্রি’ নামের একটি প্রক্রিয়া ব্যবহার করে। এই ফটোগ্রামমেট্রি এবং জিপিএস ডেটা ব্যবহার করে তারা ছবির জন্য সঠিক স্থানাঙ্কগুলো চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।

ক্রিস্টোফার ফিলিপস বলেন, এটিকে একটি বড় ‘জিগস পাজল’ হিসেবে ভাবতে পারেন যেখানে আমরা ছবিগুলোকে একসাথে রাখতে পারি এবং এসব ছবির মধ্যে দূরত্ব, তাদের প্রকৃত অবস্থান বা জিপিএস অবস্থান বুঝতে পারি। ৫০০ পাউন্ডের একটি ক্যামেরা দিয়ে গুগলের ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছিল এ কার্যক্রম।

আপনি হয়তো কোনো না কোনো সময়ে একটি স্ট্রিট ভিউ গাড়ি দেখেছেন, যার ওপরে একটি ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা রয়েছে। এর কিছু সংস্করণ আছে ‘লাইডার’ সেন্সর দিয়ে সজ্জিত, যা ক্যামেরা থেকে তার চারপাশের বস্তুর দূরত্ব পরিমাপ করে। সুনির্দিষ্ট লোকেশন দিতে এতে রয়েছে জিপিএস প্রযুক্তিও।

কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকা বা স্থানে পৌঁছানোর জন্য পরবর্তীতে সহজে বহনযোগ্য ক্যামেরাও যুক্ত করেছে গুগল। গাড়ি পৌঁছাতে পারে না এমন জায়গায় যাওয়ার জন্য গুগল ব্যাকপ্যাক ক্যামেরাও রেখেছে। এছাগা তারা মোটরসাইকেল এবং স্নোমোবাইলের মতো পরিবহনও ব্যবহার করেছে। এমনকি কিছু বিরল ক্ষেত্রে উট, ডুবুরি এবং মহাকাশচারীদের কাছ থেকেও ছবি পেয়েছে গুগল।

সংস্থাটির জিও বিভাগের প্রধান বলেন, গাড়িতে বহনযোগ্য বড় কম্পিউটিং ইউনিটের (ক্যামেরা) বিপরীতে আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী এখন খুব হালকা ক্যামেরাও ব্যবহার করছি। আমরা শুধুমাত্র একটি জায়গা কেমন সেটিই ক্যাপচার করছি না, পরে ছবিতে কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা তা-ও শনাক্ত করতে পারি। বাস্তব জগতের নতুন শারীরিক বৈশিষ্ট্য বোঝার সক্ষমতাও আমরা অর্জন করতে পেরেছি। এটি করার জন্য আমরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, পাবলিক বাস, ট্রেনের সময়সূচী এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ডেটা পাই।

কোথাও যেতে চাইলে কত সময় লাগবে গুগল ম্যাপে এখন সেটিও দেখা যায়। কোথাও যেতে কত সময় লাগে বা একটি জায়গা কতটা ব্যস্ত তা অনুমান করার জন্য তথ্য পর্যালোচনা, বেনামী লোকেশন ডেটা এবং বিভিন্ন সময়ের ট্র্যাফিক প্যাটার্ন সমন্বয় করে অ্যালগরিদম ব্যবহার করে গুগল।

গুগল ম্যাপ মানুষের বেনামী অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান প্রবণতা দেখায়। সংস্থাটি বিজ্ঞাপন দেখানোর ক্ষেত্রেও আনুমানিক অবস্থান এবং এর ম্যাপিং সরঞ্জামগুলো ব্যবহার করে। আর এই বিজ্ঞাপনই প্ল্যাটফর্মটির অর্থ উপার্জনের অন্যতম উপায়।

এখন পর্যন্ত ২৫০টিরও বেশি দেশ এবং অঞ্চল ম্যাপের আওতায় এনেছে গুগল। কিন্তু দিন দিন গুগল যত ডেটা যোগ করছে এবং আমাদের জীবন ও সংস্কৃতিতে নিজেকে গেঁথে দিয়েছে; এর বিপরীতে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার দাবিও তুলছেন ব্যবহারকারী এবং নিয়ন্ত্রকরা।

জিওটেকনোলজি বিশেষজ্ঞ ক্রেগ বলেন, যেকোনো ধরনের জিওগ্রাফিক বা ভৌগলিক প্রযুক্তির সঙ্গে গোপনীয়তাও একটি বড় সমস্যা। গুগল ম্যাপে এই সমস্যা আরও বেশি। কারণ এর সঙ্গে পৃথক পৃথক রাস্তার ঠিকানা, স্বতন্ত্র ব্যক্তিদের ঠিকানা, জি-মেইল অ্যাকাউন্ট এবং ওয়াইফাই নেটওয়ার্কের মতো জিনিসগুলো সম্পৃক্ত।

সংগ্রহ করা ডেটার পরিমাণ, ম্যাপে মানুষের ঘরবাড়ি দেখানো, রাস্তার ছবি এবং গাড়িসহ অরক্ষিত ওয়াইফাই নেটওয়ার্কগুলো থেকে ডেটা সংগ্রহের মতো ঘটনায় সমালোচিতও হতে হয়েছে গুগলকে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আদালতে যেতে হয়েছে সংস্থাটির কর্মকর্তাদেরও। যদিও গুগলের দাবি, ট্র্যাফিক বা সড়কের যানজট কিংবা কোথাও যেতে কত সময় লাগবে এমন তথ্য জানাতে তারা যে ডেটা সংগ্রহ করে তা ‘বেনামী’।

ক্রিস্টোফার ফিলিপস বলেন, আমরা ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি নামে একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করি। ডিফারেনশিয়াল প্রাইভেসি আপনাকে এবং আপনার কার্যকলাপকে আলাদা করার অ্যাক্সেস দেয় আমাদের। এসব ডেটা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রিও করা হয় না। এছাড়া ব্যবহারকারীদের লোকেশন হিস্ট্রি বন্ধ বা চালু করা, ইনকগনিটো মোড ব্যবহার করা (গোপনীয়তা বজায় রাখা বা ব্যক্তিগত ব্রাউজিং) এবং অবস্থানের ডেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে ফেলার মতো অনুমতিও দেয় গুগল। আমরা তথ্য পরিচালনার বিষয়টি দিন দিন আরও উন্নত করছি।

প্রযুক্তিতে অগ্রগতি, বিজ্ঞাপনের অগ্রাধিকার এবং এমনকি সমালোচনার পরও বিশ্বকে নতুন করে চিনতে আমাদের সহায়তা করছে গুগল।

জিওটেকনোলজি বিশেষজ্ঞ ক্রেগ বলেন, গুগল ম্যাপ সবচেয়ে বড় যে উন্নতি করেছে তা হলো ভৌগলিক তথ্যকে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। আর সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক হলো এটি সবসময় আপনার চলাচল ট্রাক করছে, বিশেষ করে আপনার সঙ্গে যখন আপনার স্মার্টফোনটি রয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে