একতাই ধর্মের সৌন্দর্য

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২, ২০২২; সময়: ১:৫৮ pm |
খবর > ধর্ম
একতাই ধর্মের সৌন্দর্য

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : আমাদের সাবধান করে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘হে উম্মত আমার! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কর না। অতীতের উম্মতরা বাড়াবাড়ির কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে।’ (নাসায়ি শরিফ।)

পবিত্র কুরআনেও আল্লাহতায়ালা বারবার বলেছেন, খবরদার! তোমরা ধর্ম নিয়ে ফাসাদ করো না। জোরাজুরি ও বাড়াবাড়ির কারণে ধর্মে ফাটল সৃষ্টি হয়। আর এ ফাটল ধর্মের মজবুত দালান গুঁড়িয়ে দেয়। বিশাল প্রাসাদ পরিণত হয় বালুর স্তুপে। হুজুর (সা.)-এর নবুয়তি মিশনের শুরুর দিকে খোদায়ি ধর্মের প্রাসাদটি ছিল এরকম বালুর স্ত‚প। সেখান থেকে তিনি তিলে তিলে ধর্মের মজবুত দালান দাঁড় করিয়েছেন।

হুজুরের ঠিক আগের নবি ছিলেন হজরত ঈসা (আ.)। তিনি আল্লাহর কাছে চলে যাওয়ার ছয়শ বছর পর হুজুর নবুয়ত পান। এ ছয়শ বছরে ঈসা (আ.)-এর অনুসারীরা তাদের ধর্মকে বিকৃত করতে করতে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, পান থেকে চুন খসলেই ভিন্ন মতাবলম্বীদের দিন থেকে খারিজ করে দিত। খিষ্ট্রধর্মের মধ্যে অনেক ফিরকা বা দল তৈরি হয়ে গেল। প্রতিটি দল নিজেদের সত্যের একমাত্র ডিলার ঘোষণা করে বসল।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (রহ.) তরজুমানুল কুরআনে লিখেছেন, ইতিহাস পড়ে জানা যায়, তখনকার সময়ে খ্রিষ্টানদের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে, প্রত্যেক ধর্মগুরুই একটি ফিরকা বা দল হয়ে গেল। আর প্রত্যেক দলই ঘোষণা করল, আমি ছাড়া আর সব কাফেরও জাহান্নামি। এর চেয়ে ভয়ংকর অবস্থা ইহুদিদের হয়েছে। ইহুদি ধর্মগুরুরা জানপ্রাণ উজাড় করে একটি কথাই ঘোষণা করতে থাকল, কেউ ইহুদি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বাসী তথা মুমিন হতে পারবে না এবং জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না। খ্রিষ্টানদের মতো ইহুদি ধর্মও দলে দলে বিভক্ত হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

সে সময়ের বিভীষিকাময় দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘ওরা বলে, ইহুদি বা খ্রিষ্টান না হলে কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ এটি ওদের মিথ্যা প্রত্যাশা। হে নবি আপনি বলেন, ‘তোমরা সত্যবাদী হলে এর পক্ষে প্রমাণ পেশ কর।’ (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১১১।)

ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় বিরোধ ও বাড়াবাড়ির আরও চমৎকার বর্ণনা সামনের আয়াতে এসেছে। তারা যখন নিজেরা নিজেরাই দ্ব›দ্ব-সংঘাত-ফতোয়াবাজিতে লেগে গেল, তখন ভিন্ন ধর্মের লোকদের তারা সহ্য করতে পারবে না তা বলাই বাহুল্য। কুরআনের বর্ণনায় এসেছে, “ইহুদিরা বলে, ‘খ্রিষ্টানদের বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই’, খ্রিষ্টানরা বলে, ‘ইহুদিদের বিশ্বাসের কোনো সত্যতা নেই’।

অথচ উভয় সম্প্রদায়ই কিতাব পড়ে। আবার যাদের কিতাবের কোনো জ্ঞান নেই, তারাও অনুরূপ দাবি করে। সুতরাং এ নিয়ে কোনো বিতর্কের প্রয়োজন নেই বরং শেষ বিচারের দিন আল্লাহ এ মতবিরোধের চ‚ড়ান্ত মীমাংসা করবেন।” (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১১৩।)

আজ মুসলমানদের অনৈক্য-বিশৃঙ্খলা দেখে ধর্মদরদিদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। হায়! এক সময়ের শ্রেষ্ঠ জাতি মুসলমান কীভাবে আধুনিক বিশ্বে গুরুত্বহীন সম্প্রদায়ে পরিণত হলো। প্রিন্সিপাল ইবরাহিম খাঁ বড় আফসোস করে বলেছেন, এই যে বিশ্বে এত আবিষ্কার, এত বিজয়, এত সংগ্রাম-এর কত শতাংশ মুসলমানদের হাতে? হাতেগোনা এক-দুজন মুসলমান অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেলেও তাদের জীবন ও কর্মে কি খাঁটি মুসলমানের আদর্শ খুঁজে পাওয়া যায়? যায় না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, দুনিয়ার বুকে আমাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এখন নেই বললেই চলে।

এর কারণ কী? কেন এমন হলো? আসলে আমাদের মধ্যে ঐক্যের শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। ভ্রাতৃত্বের জজবা মরে গেছে। ফলে আমরাও দলে-উপদলে বিভিক্ত হয়ে পড়েছি। এক মাজহাব আরেক মাজহাবকে, এক আকিদা আরেক আকিদাকে, এক তরিকা আরেক তরিকাকে, এক শায়েখ আরেক শায়েখকে, এক ভাই আরেক ভাইকে সহ্য করতে পারছি না। ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ সে তো কল্পনার অতীত।

শুধু তাই নয়, আমি বা আমার ফেরকা ছাড়া বাকি সবাইকে নির্দ্বিধায় জাহান্নামি ও কাফের ঘোষণা করছি। ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এসব অনাচার সাধারণ মানুষ করছে না। করছে উম্মতের জিম্মাদার বড় বড় আলেমরা। ফলে বিভ্রান্তি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, অন্যকে গালি দেওয়াই বুঝি ইসলাম।

বিরোধী মতকে অভিশাপ দেওয়াই বুঝি সুন্নাত। কাউকে হেয় বা অপমান করাই বুঝি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জনের একমাত্র পথ। হায়! কেন আমরা বুঝি না, রাসূল (সা.) শত্রুকেও কখনো গালি দেননি। তার তরবিয়তে অভিশাপ বলতে কিছু ছিল না। তিনি যতটা পেরেছেন শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। প্রয়োজনে বিরোধী লোকদের বিশেষ সুবিধা দিয়েছেন, অন্যায়-অন্যায্য আবদার মেনে নিয়েছেন; কিন্তু বিরোধ উসকে দেননি।

ভারতের বিখ্যাত পণ্ডিত আল্লামা ড. হামিদুল্লাহ বলেন, চরম বিশৃঙ্খল সমাজে আগমন করেন রাসূল (সা.)। ওই সময়ে রাসূল (সা.) সব ধর্মীয় বিরোধ দূর করে সবাইকে এক পতাকার নিচে নিয়ে আসেন। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) মৌলিক মিলগুলো গুরুত্ব দিয়েছেন। তাও হয়েছে কুরআনের নির্দেশেই। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবি! ওদের বল, হে কিতাবিরা! এসো! আমরা আমাদের কিতাবের অভিন্ন কথায় একমত হই! আর কথাটা খুব সহজ-‘আল্লাহ ছাড়া কারও উপাসনা করব না। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করব না। আল্লাহ ছাড়া কাউকে বা কোনো মানুষকে প্রতিপালক বা প্রভুরূপে গ্রহণ করব না।’ যদি তারা এ বিষয়ে একমত হতে না চায়, তবে তাদের সুস্পষ্টভাবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, অবশ্যই আমরা আল্লাহতে সমর্পিত হয়েছি।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৬৪।)

এভাবে অন্যান্য ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলোকে সামনে রেখে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন রাসূল (সা.)। সিরাতের ইবনে হিশামের বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসূল (সা.) যখন মদিনার সনদ প্রণয়ন করেন, তখন তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘মদিনার মুসলমান এবং ইহুদিরা এক জাতি। সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, কিন্তু একের বিপদে অন্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে।’

এ ঐক্যের ফলেই মাত্র ২৩ বছরে ইসলাম বিজয়ী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তাই আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রশি আঁকড়ে ধর, পরস্পর দলাদলি কর না।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩।) এক আয়াত পরেই আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আল্লাহর স্পষ্ট বিধানসমূহ পাওয়ার পরও অতীতে নিজেদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তোমরা তাদের মতো হয়ো না। কারণ ওদের জন্য রয়েছে কঠিন আজাব।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৫।)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে নবি! জেনে রাখ, যারা তাদের ধর্মবিশ্বাসকে খণ্ড খণ্ড করে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোনো দায়িত্ব তোমার ওপর বর্তায় না। তাদের বিষয়টি পুরোপুরিই আল্লাহর এখতিয়ারে। সময় হলেই তিনি তাদের বুঝিয়ে দেবেন, তারা কে কী করেছে!’ (সূরা আনআম, আয়াত ১৫৯।)

প্রিয় পাঠক! আপনার সঙ্গে কারও মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দূরত্ব থাকাটাও স্বাভাবিক। মানুষে মানুষে এ মতপার্থক্য ও বৈচিত্র্যময়তা যুগযুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু সেই ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যময়তা যখন নোংরামি ও কাদা ছোড়াছুড়িতে রূপ নেয় এবং তার চেয়ে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে সেটি যদি কুফরি, মারামারি ও হত্যাকাণ্ডের রূপ নেয়, তবে আর যাই হোক, এটি ইসলামের কোনো গণ্ডির মধ্যে পড়ে না। এসব করে আপনি আসলে ইসলামের সৌন্দর্যই নষ্ট করছেন।

ইমাম গাজালি ‘সত্যের সন্ধান’ বইয়ে বড় সুন্দর বলেছেন-‘বিশ্বাস ও ধর্মের ব্যাপারে মতভেদ এবং পথের ভিন্নতা একটি গভীর সমুদ্র। এতে অনেকেই পা পিছলে পড়েছেন এবং খুব কমজনই বেঁচে ফিরেছেন। ডুবে যাওয়া প্রত্যেকেরই মনে হয়েছে, শুধু তিনিই মুক্তির সন্ধান পেয়েছেন’।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মে দলাদলি নেই এবং দলাদলিতেও ধর্ম নেই। ধর্ম আছে জ্ঞান সাধনায় ও সৎকর্মে। বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ আজ কঠিন সময় পার করছে। অথচ আমরা এখনো পড়ে আছি টুপি আর পাঞ্জাবির সাইজের মতো কম দরকারি বিষয় নিয়ে। এসব আমাদের একটু একটু করে পিছিয়ে দিচ্ছে। বড় আফসোস করে বিদ্রোহী কবি নজরুল বলেছিলেন,

‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনো বসে

বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’

হে সময়ের বন্ধু পাঠক! এখনই সময় ঘুরে দাঁড়ানোর। যুগের চাহিদার আলোকে আলেমদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বাড়াতে হবে। আলেমদের দলাদলির কবলে পড়ে তরুণদের একটি শ্রেণি আজ ধর্মের প্রতি আবেদনহীন হয়ে পড়ছে। আরেক শ্রেণি হয়ে পড়ছে উগ্র মানসিকতাসম্পন্ন। আসুন আমরা সব দলাদলি বাদ দিয়ে মৌলিক বিষয়গুলোতে ঐক্যবদ্ধ হই। নিজে বাঁচি, অন্যকে বাঁচাই। আমিন।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে