বিশ্ববিদ্যালয়ে অব্যবস্থাপনা ও আমাদের করণীয়

প্রকাশিত: আগস্ট ১৯, ২০২২; সময়: ৩:২৮ pm |
খবর > মতামত
বিশ্ববিদ্যালয়ে অব্যবস্থাপনা ও আমাদের করণীয়

ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে : এই কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশ যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, উৎপাদন, পশুপালন, মৎস্যচাষ, প্রাথমিক শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে পশ্চিমা অনেক দেশই বিস্মিত। আশেপাশের অনেক দেশই তাদের নিজেদের জন্য বাংলাদেশের উন্নয়নের মডেল অনুসরণ করতে ব্যস্ত।

এই উন্নয়নকে টেকসই করার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শিক্ষার মানোন্নয়ন। কারণ, একটি দেশের মেরুদণ্ড শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তার শিক্ষা ও এর সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে যে কয়েকটি সমস্যা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষার অব্যবস্থাপনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এই মুহূর্তে সঠিক পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

সম্প্রতি ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত (০২ আগস্ট ২০২২) একটি সংবাদে উঠে এসেছে, ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ এই তিনটি পদই শূন্য। তবুও সমাবর্তন আয়োজন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়, যদিও সমাবর্তনের আগের দিন অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। সমাবর্তন স্থগিত হলেও অনেক শিক্ষার্থী বিষয়টি সম্পর্কে জানতেও পারেনি। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, শুধু টাকার জন্য তড়িঘড়ি করে সমাবর্তন আয়োজন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এর আগে ঢাকার আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টাকায় ট্রাস্টিদের গাড়ি-বিলাসের ঘটনাও গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে। এর বাইরে সার্টিফিকেট জালিয়াতির সাথে যুক্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম।

সম্প্রতি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের সরাসরি সার্টিফিকেট জালিয়াতির সাথে যুক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে ইউজিসি গঠিত কমিটি, যা শিক্ষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যের অন্যতম নিকৃষ্ট উদাহরণও বটে।

অন্যদিকে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাসে ফেরার চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে পাঁচ বছর অতিক্রম করলেও এখনো অস্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পরিচালনা করছে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

উপরের ঘটনাগুলো উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির চেয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে ব্যবসায়িক স্বার্থের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তার প্রমাণ বহন করে। এর সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় নানা অব্যবস্থাপনারও সাক্ষ্য দেয়। এসব অব্যবস্থাপনার চিত্র শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ নয়। পরিকল্পনাহীনভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার নজিরও আমরা দেখতে পাই।

দৈনিক বণিক বার্তার ২৬ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে এসেছে, ৫ বছর আগে নির্মিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন মাত্র ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্প্রসারণের সুযোগ ছিল। তবুও নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। নতুন ভবন নির্মাণে সম্প্রসারণ ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত ৯৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীও বলেছেন, বছর কয়েক আগে নির্মিত ভবন সম্প্রসারণ করা সম্ভব ছিল। অর্থাৎ প্রয়োজন না থাকলেও নতুন ভবন নির্মাণের নামে অপচয়ের দিকে এগোচ্ছে নতুন প্রকল্প। যদিও অপচয় না করে অতিরিক্ত এই অর্থ গবেষণা উন্নয়নে ব্যয়ের মাধ্যমে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত রাখতে পারতো বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ এসব পদে আসীন ব্যক্তিবর্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে ২০২১ সালে ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশের ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭১টিই অভিভাবকহীন ছিল। এর মধ্যে ৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে একজনও ছিলেন না।

বছরের পর বছর এসব পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পদগুলোতে ভারপ্রাপ্ত জনবল দিয়েই পরিচালনা করছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। দলীয় শিক্ষকের কথা বিবেচনা করেও যদি এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হতো তবুও পদগুলো ফাঁকা থাকার কথা নয়।

পত্রিকার পাতা খুললেই বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুঁ মারলেই এসব অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতার খবর প্রতিনিয়ত সামনে আসছে। অর্থাৎ গণমাধ্যমে সংবাদ হওয়া এসব ঘটনা মোটাদাগে এটা উপস্থাপন করে যে, আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়, প্রশাসন পরিচালনায় অদক্ষতা, সঠিক পরিকল্পনার অভাব এসব নিয়েই চলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

যদিও দেশে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের ব্রত নিয়েই যাত্রা শুরু করে এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে দেখা যাচ্ছে, তাদের উদ্যোগগুলো শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। সবগুলো দিক বিবেচনা করলে একরকম নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের উচ্চশিক্ষা খাত।

শিক্ষার এমন অব্যবস্থাপনার ফলে বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকেও সবচেয়ে নিচের দিকে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০তম।

প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, প্রযুক্তি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা, উন্নয়ন ও উদ্ভাবন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং অর্থনীতি ও সাধারণ সক্ষমতার পরিবেশ গুরুত্ব দিয়ে এই সূচক তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান ১১৯তম, প্রযুক্তিগত ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ৭৭তম, উচ্চশিক্ষায় ১২২তম, গবেষণা, উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে ১৩৬তম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ১১৭তম, অর্থনীতিতে ১০১তম এবং সাধারণ সক্ষমতার পরিবেশে অবস্থান ১৩৪তম।

৩৮ দশমিক ১ স্কোর নিয়ে বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এই বছর তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। ৪৬ দশমিক ৬ স্কোর নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে শ্রীলঙ্কা। দেশের বৈশ্বিক অবস্থান ৮৬তম। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারতের অবস্থান ৯৭তম। এর বাইরে পাকিস্তান ১২৩তম ও নেপাল ১২৮তম। কিছু বিষয় সামনে আনলেই বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে বাংলাদেশের এই শোচনীয় অবস্থার কারণ আঁচ করা সম্ভব।

দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেশের বাইরে থেকে গবেষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে। অথচ দেশে এতগুলো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। তবুও দেশ থেকে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অবদান রাখার মতো বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। শিক্ষাব্যবস্থার এই নাজুক পরিস্থিতি এসবের জন্য দায়ী বলে মনে করা কি খুব ভুল হবে?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জবাবদিহিতার অভাবও এমন পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। এসব বিষয়ে ইউজিসি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় একেবারেই অবগত নয় এমন মনে করার উপায় নেই। উপরের ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনিয়মের মধ্যে চলতে থাকা অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনক (ইউজিসি)-কেও তোয়াক্কা করছে না।

ইউজিসিও অনেক ক্ষেত্রে এমন অরাজকতা ঠেকাতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিচ্ছে যার পরিচালনা পর্ষদের অনেকেই শিক্ষানুরাগী নন। এতে করে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের ফল ভোগ করছে দেশের উচ্চশিক্ষা খাত।

এতসব সংকটের মধ্যে শিক্ষার গুণগত মান রক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটুকু ভূমিকা পালন করছে সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। সেটি হলো, শিক্ষা নিয়ে এমন পরিস্থিতি কী নিয়ন্ত্রণে আনা মোটেই সম্ভব নয়?

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো, মানসম্মত শিক্ষা যা বাংলাদেশ সরকারের ‘ভিশন ২০৪১’-এরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও রূপকল্প বা ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব হবে সেটি নিয়ে আশঙ্কা থেকে যায়।

শিক্ষাব্যবস্থার এই অরাজক পরিস্থিতি উন্নয়নে কিছু বিষয় আমাদের গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সঠিক তদারকির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অনিয়মের বিরুদ্ধে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কঠোর অবস্থান জরুরি। এর বাইরে উপাচার্যের পদ যেন শূন্য না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। উপাচার্য হবেন একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন এবং উচ্চপদগুলোতে পদায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অনুপাত ঠিক রাখার পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

টেকসই শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি যুগোপযোগী, মানসম্পন্ন ও ফলপ্রসূ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা পূরণের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণামুখী শিক্ষা কার্যক্রমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। একাডেমিক গবেষণা হবে বাস্তবধর্মী ও কল্যাণমুখী।

সর্বোপরি, ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক এবং নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা মডেল তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য উপযুক্ত বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সকলকে আরও বেশি মনোযোগী ও সচেতন হতে হবে। আর এর ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে শিক্ষাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে ।। অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং প্রশাসক, জনসংযোগ দপ্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে