সিরাজগঞ্জে শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে

প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২২; সময়: ৯:১৩ pm |
সিরাজগঞ্জে শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জের কৃষি প্রধান আর তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ শাহজাদপুর উপজেলার পুর্বাঞ্চল যমুনার হাত থেকে রক্ষা কবজ কৈজুরী-বিনোটিয়া তীর রক্ষা বাধ এখন বিপর্যস্ত। ২০১০ সালে নির্মিত এ বাধটি রক্ষনাবেক্ষনে যথাযথ ভুমিকা না রাখায় গত কয়েক বছর ধরে বাধের বিভিন্ন অংশ নদীতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চলতি বন্যায় বাধটি যমুনার সাথে লড়াইয়ে টিকতে না পেরে স্রোতে বিনোটিয়া ও মাজ্জান অংশে প্রায় ১ কিলোমিটার নদীতে বিলীন হয়েছে।

সাথে-সাথে পাড়ে থাকা দেড় শতাধীক ঘরবাড়িও ভেঙ্গে অন্তত শ খানেকের মত পরিবার গৃহহীন হয়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। শুধু তাই নয় ভেঙ্গে যাওয়া তীর রক্ষা বাধের পশ্চিম পাশে অবস্থিত ১৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রন বাধটি ভাঙ্গন থেকে মাত্র ২০ মিটার দুরে থাকায় চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। এছাড়া ভাঙ্গনে মুখে রয়েছে আরো হাজারো ঘর-বাড়ি, স্কুল, হাট-বাজার সহ অন্যান্য স্থাপনা। এ অবস্থায় এলাকাবাসী দ্রুত কার্যকরি পদক্ষেপ দাবী করেছে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, চলতি বন্যার শুরুতে গত দু মাস আগে বন্যার শুরুতে প্রচন্ড স্রোতে কৈজুরী বাধের জেলার সর্ব দক্ষিনের গ্রাম বিনোটিয়ায় ৭০ মিটার জুড়ে ধসে যায়। পরে মাজ্জান অংশ মিলে বাধের বিলীন হয় প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকা। বাধ ধসের সাথে-সাথে পাড়ে থাকা শতাধীক ঘর-বাড়ি, জায়গা সহ মুহুর্তেই দেবে যায় নদীতে। শ খানেক পরিবার সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। আশ্রয় নেয় পাশের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাধ সহ নিকট বাড়িতে।

এখানে তাদের খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে কোন রকমে। এমনি এক হতভাগা গৃহিনী বিনোটিয়া গ্রামের রুজিনা পারভিন (৩৫)। তার ৪ সন্তান, শ্রমজীবি স্বামী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে বাধের পাড়ে নিজ জায়গায় বাস করতেন। হঠাৎ গত জুলাইয়ের শুরুতে বাধ ধসে যাবার সাথে যমুনায় দেবে গেছে তার বসতি। অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া নিঃস্ব রুজিনার আহার জোটে অন্যের দয়ায়। তিনি জানান, আমার আর কিছু নেই। সব নদীতে চলে গেছে। ৩ বেলা নয় ১ বেলা কোন রকমে খাবার জোটে। তাও হাত পেতে। কেউ যদি আমাদের একটি থাকার ঘর করে দিতেন?

তার মত একই অবস্থা ইসমাইল হোসেন ও মধুমালা, বিধবা দুলু খাতুন, বিধবা স্বর বানু, রূপচাঁদ মোল্লা, এরশাদ মোল্লা, আব্দুল বাতেন সহ অনেকের। তারা জানান, বর্ষার শুরুতেই আমরা নদীর এই অংশের আশংকাজনক অবস্থার বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবগত করি। কিন্তু সময়মত তারা ব্যবস্থা না নেয়ার ১ কিলোমিটার বাধ ধসে আমাদের শতাধীক ঘরবাড়ি বিলীন হয়। ভেঙ্গে যায় ঐতিহ্যবাহি শিমুলকান্দি জামে মসজিদ। ভাঙ্গন অব্যাহত থাকায় আমরা আতংকিত।

তারা আরো জানান, আমরা বার-বার আকুতি মিনতীর পর পাউবো কিছু কাজ করছে। তবে তা যথাযথ না। যে জিও ব্যাগ ফেলছে তাতে অনিয়ম হচ্ছে। নদীর গভীরে না ফেলে পাড়ের উপরে ফেলে লোক দেখানো কাজ করছে তারা। তাই ভাঙ্গন রোধে তেমন কান কাজ দিচ্ছেনা।

এদিকে ভাঙন অব্যাহত থাকায় আমরা পাশে থাকা ৩ বছর আগে ১৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাধও হুমকিতে পড়েছে। বর্তমানে ভাঙ্গন থেকে বাধটি মাত্র ২০ মিটার দুরে অবস্থান করছে বলে এলাকাবাসী চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
এ ব্যাপারে বিনোটিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক, প্রবীন সমাজ-সেবক আবু সাইদ চৌধুরী এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য এরশাদ আলী ও বিনোটিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আব্দুল খালেক জানান, বাধ ধসে ভাঙ্গন বেড়ে যাওয়ায় আমরা আশপাশের ৭/৮ গ্রামের মানুষ খুবই আতংকের মধ্যে আছি।

এরই মধ্যে শ খানেক পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাট-বাজার সহ হাজারো ঘরবাড়ি সহ ৩ বছর আগে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রন বাধটিও হুমকিতে পড়েছে। যেকোন সময় তা বিলীন হতে। তাই পাউবোর কাছে আমাদের আকুতি যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে ধসে যাওয়া বাধ মেরামত সহ এলাকা ঝুঁকিমুক্ত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হোক।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় গালা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বাতেন জানান, তীর রক্ষা বাধের নিকট থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু ব্যবসায়ীরা অপরিকল্পিত ভাবে নদী থেকে বালু তোলার কারনে বাধ ধসে গেছে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অনেক আগেই লিখিত ভাবে জানালেও তারা কার্যকরি কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

এর ফলেই এখন ধস সৃষ্টি হয়েছে। আর মাত্র ২০ মিটার ভাঙলেই নতুন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধ ভেঙ্গে যাবে। আর সেটা হলে কি পরিমাণ ক্ষতি হবে তা অকল্পনীয়। এছাড়াও যাদের বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে গেছে তাদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মাথা গোঁজার ঠাই। সেই সাথে তাদের দ্রুত প্রয়োজন ত্রাণ ।

এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আমাকে জানানোর পর সাথে সাথে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছি। ইতোমধ্যেই তারা জিও ব্যাগ ফেলতে শুরু করেছে।

এদিকে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, বর্তমানে ঐ এলাকার ৬শ মিটারে জিও বস্তা ফেলা হচ্ছে। নতুন প্রকল্পের কাজের টেন্ডার হয়েছে। যা বাস্তবায়িত হলে এ এলাকা ভাঙ্গন মুক্ত হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
topউপরে