স্বাদের সঙ্গে আম্রপালির ইতিহাসও রোমাঞ্চকর

প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২২; সময়: ১১:৩২ pm |
স্বাদের সঙ্গে আম্রপালির ইতিহাসও রোমাঞ্চকর

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : নতুন প্রজাতির আমগুলোর মধ্যে আম্রপালি বেশ জনপ্রিয়। এর স্বাদ একেবারেই আলাদা। নামটিও বেশ কাব্যিক। এই আমের নাম এবং স্বাদ যেমন রোমঞ্চকর তেমনি এর ইতিহাসও দীর্ঘ।

আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে ভারতে জন্মেছিলেন সে সময়ের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী এক নারী। অনিন্দ্য সুন্দরী এ নারীর রূপে পাগল ছিল পুরো ভারতবর্ষ। আর এই রূপই তার জন্য ক্রমশ কাল হয়ে ওঠে। যে কারণে তিনি ছিলেন ইতিহাসের এমন একজন নারী, যাকে রাষ্ট্রীয় আদেশে নগরবধূ বানানো হয়েছিল!

প্রাচীন ভারতে বৈশালী নামে এক রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যের রাজ উদ্যানের আম্রতলায় এক শিশুকে কুড়িয়ে পাওয়া যায়। সে শিশুকে বড় করার দায়িত্ব দেয়া হয় উদ্যানের রক্ষককে। আম্রতলায় কুড়িয়ে পাওয়া শিশুর নাম হয় আম্বপালি বা অম্বিকা। সংস্কৃতিতে আম্র আর প্রাচীন পালি ভাষায় আমকে বলা হত আম্ব। যার মানে পল্লব বা পাতা। অর্থাৎ আমগাছের নবীন পাতা।

বড় হয়ে আম্বপালি বা অম্বিকা বা আম্রপালি অপরূপা সুন্দরী নারীতে পরিণত হয়। সে রাজ্যের নিয়ম অনুসারে সুন্দরী নারীরা কারো বউ হতে পারতো না। তারা হত গণসম্পত্তি। দেখতে দেখতে আম্রপালি হয়ে উঠেন সেই রাজ্যের সেরা নর্তকি। তার রূপে-কলায় মুগ্ধ হয় সবাই। দেশ-বিদেশের রাজপুত্র, রাজা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ তার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। শুরু হয় দ্বন্দ্ব, ঝগড়া আর বিবাদের। সবাই তাকে একনজর দেখতে চায়, করতে চায় বিয়ে।

এসব নিয়ে আম্রপালির মা-বাবা (পালিত) খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তারা তখন বৈশালীতে সকল গণমান্য ব্যক্তিদের একটি সমাধান বের করার জন্য বলেন। কারণ, সবাই আম্রপালিকে বিয়ে করতে চায়। তখন বৈশালীর সকল ক্ষমতাবান ও ধনবান ব্যক্তিরা মিলে একটা বৈঠকে বসে। নানা আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, আম্রপালিকে কেউ বিয়ে করতে পারবে না। কারণ তার রূপ। সে একা কারও হতে পারে না। আম্রপালি হবে সবার! সে হবে একজন নগরবধূ।

এটা ছিল একটা ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। ইতিহাসে এভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে কাউকে নগরবধূ বানানো হয়েছে এমন ঘটনা খুবই বিরল! তবে আম্রপালি এ সিদ্ধান্ত শর্তহীনভাবে মেনে নেয়নি। সে সভায় তার শর্ত ছিল পাঁচটি। এগুলো হলে-

১. নগরের সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় হবে তার নিবাস।
২. প্রতি রাত্রির জন্য তার মূল্য হবে পাঁচশত স্বর্ণমুদ্রা।
৩. একবারে শুধু একজন তার গৃহে প্রবেশ করতে পারবে।
৪. শক্র বা কোনো অপরাধীর সন্ধানে প্রয়োজনে সপ্তাহে সর্বোচ্চ একবার তার গৃহে প্রবেশ করতে পারবে।
৫. তার গৃহে কে এল আর গেল, এ নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না।

সবাই তার এসব শর্ত মেনে নেন। এভাবে দিনে দিনে আম্রপালি বিপুল ধন-সম্পদের মালিক হয়ে উঠেন। তার রূপের কথাও দেশ-বিদেশে আরও ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচীন ভারতের মগধ রাজ্যের রাজা ছিলেন বিম্বিসার।

শোনা যায়, তার স্ত্রীর সংখ্যাও নাকি ছিল পাঁচ শতাধিক! নর্তকীদের নাচের এক অনুষ্ঠানে তিনি এক নর্তকীর নাচ দেখে বলেছিলেন, এ নর্তকী বিশ্বসেরা। তখন তার একজন সভাসদ বলেন- মহারাজ, এই নর্তকী আম্রপালির নখের যোগ্য নয়!

কথাটি বিম্বিসারের নজর এড়ায়নি। তিনি তার সেই সভাসদের থেকে আম্রপালি সম্পর্কে বিস্তারিত শুনে তাকে কাছে পাবার বাসনা করেন। কিন্তু তার সভাসদ বলেন, সেটা সম্ভব নয়। এজন্য তাদেরকে যুদ্ধ করে বৈশালী রাজ্য জয় করতে হবে। তাছাড়া আম্রপালির দেখা পাওয়াও এত সহজ নয়। দেশ-বিদেশের অনেক রাজা-রাজপুত্ররা আম্রপালির প্রাসাদের সামনে তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। কিন্তু মন না চাইলে আম্রপালি কাউকে দেখা দেয় না।

এত কথা শুনে বিম্বিসারের আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ছদ্মবেশে বৈশালী রাজ্যে গিয়ে আম্রপালিকে দেখে আসবেন। কি এমন আছে সেই নারীর মাঝে, যার জন্য পুরো পৃথিবী পাগল হয়ে আছে! তারপর বহু চড়াই উৎরাই শেষে আম্রপালির প্রাসাদ আম্রকুঞ্জে তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ আসে।

কিন্তু দেখা করতে গিয়েই রাজা চমকে উঠেন! এ তো কোনো নারী নয়; যেন সাক্ষাৎ পরী! এ কোনোভাবেই মানুষ হতে পারেন না। এত রূপ মানুষের কিভাবে হতে পারে! কিন্তু রাজার জন্য আরও অবাক হওয়ার মতো কিছু অপেক্ষা করছিল। কারণ, আম্রপালি প্রথম দেখাতেই তাকে মগধ রাজ্যের রাজা বলে চিনে ফেলে। কারণ সে তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল বহু আগে থেকেই।

এই কথা শুনে রাজার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। রাজা সঙ্গে সঙ্গে তাকে তার রাজ্যের রাজ রাণী বানানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু আম্রপালি জানায়, তার রাজ্যের মানুষ এটা কখনোই মেনে নেবে না। বরং এতে বহু মানুষের জীবন যাবে। রক্তপাত হবে। তাই রাজাকে দ্রুত এখান থেকে চলে যেতে বলে।

কিন্তু বিম্বিসার বৈশালী আক্রমণ করে আম্রপালিকে পেতে চান। ওদিকে আম্রপালি তার নিজের রাজ্যের কোনো ক্ষতি চান না। তাই সে রাজাকে তার নিজ রাজ্যে ফেরত পাঠায় এবং বৈশালীতে কোনো আক্রমণ হলে সে তা মেনে নেবে না বলেও সাফ জানিয়ে দেয়।

এদিকে বিম্বিসারের সন্তান অজাতশত্রুও আম্রপালির প্রেমে মগ্ন। সে বিম্বিসারকে আটক করে নিজে সিংহাসন দখল করে বসে এবং আম্রপালিকে পাওয়ার জন্য বৈশালী রাজ্য আক্রমণ করে। কিন্তু তাতে সে সফল হয়নি, বরং আহত হয় মারাত্মকভাবে। পরবর্তীতে আম্রপালির সেবায় সুস্থ হয়ে গোপনে তার নিজের রাজ্যে ফেরত যায়। সেদিনও আম্রপালি অজাতশত্রুর বিয়ের প্রস্তাব সবিনয়ে ফিরিয়ে দেয়।

কিন্তু এতো নাটকীয়তার শেষ হলো কোথায়? গৌতম বুদ্ধর সময়কাল তখন। গৌতম বুদ্ধ তার কয়েকশ সঙ্গী নিয়ে বৈশালী রাজ্যে এলেন। একদিন বৈশালী রাজ্যের রাবান্দা থেকে এক বৌদ্ধ তরুণ সন্ন্যাসীকে দেখে আম্রপালির মনে ধরে গেল। সে ভাবলো, দেশ-বিদেশের রাজারা আমার পায়ের কাছে এসে বসে থাকে, আর এ তো একজন সামান্য মানুষ।

আম্রপালি সেই সন্ন্যাসীকে চার মাস তার কাছে রাখার জন্য গৌতম বুদ্ধকে অনুরোধ করলো। সবাই ভাবলো, বুদ্ধ কখনোই রাজি হবেন না। কারণ, একজন সন্ন্যাসী এমন একজন নগরবধূর কাছে থাকবে; এটা হতেই পারে না। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ তাকে রাখতে রাজি হলেন এবং এটাও বললেন, আমি শ্রমণের (তরুণ সন্ন্যাসীদের নাম) চোখে কোনো কামনা-বাসনা দেখছি না। সে চার মাস থাকলেও নিষ্পাপ হয়েই ফিরে আসবে; এটা আমি নিশ্চিত!

চার মাস শেষ হলো। গৌতম বুদ্ধ তার সঙ্গীদের নিয়ে চলে যাবেন। তরুণ শ্রমণের কোনো খবর নেই। তবে কি আম্রপালির রূপের কাছেই হেরে গেলেন শ্রমণ? সেদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে তরুণ শ্রমণ ফিরে আসে। তার পিছনে পিছনে আসে একজন নারী। আম্রপালি।

আম্রপালি তখন বুদ্ধকে বলে, তরুণ শ্রমণকে প্রলুব্ধ করতে কোনো চেষ্টা বাকি রাখেনি সে। কিন্তু এই প্রথম কোনো পুরুষকে বশ করতে ব্যর্থ হয়েছে বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালি। তাই আজ সর্বস্ব ত্যাগ করে বুদ্ধের চরণে আশ্রয় চায় সে। পরে সব কিছু দান করে বাকী জীবন গৌতম বুদ্ধের চরণেই কাটিয়ে দেয় আম্রপালি!

১৯৭৮ সালে ‘দশোহরি’ ও ‘নিলাম’ জাতের দুটো আমের ভেতরে সংকরায়ন ঘটিয়ে নতুন একটি জাতের আম উদ্ভাবন করেন ভারতের আম গবেষকরা। দেখতে লম্বাটে-সরু আমটি স্বাদে গুণে অনন্য। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমটি ভারত জয় করে বাংলাদেশেও চলে আসে। সময়ের সঙ্গে নিজের স্বাদ-গন্ধে মুগ্ধ করে এ তল্লাটে অন্যতম জনপ্রিয় আমে পরিণত হয়। এটি শেষ পর্যন্ত নাম দেয়া হয় প্রাচীন ভারতের সেই বিখ্যাত নগরবধূ আম্রপালির নামানুসারেই।

প্রাচীন সমাজে গণিকাবৃত্তিকে অসম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হত না। রাজগণিকারা সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। রাজমহলে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তির অন্ত ছিল না। সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারী প্রদানের রেওয়াজ ছিল। এরা ছিল নাচ-গানসহ নানা কলাকৌশলে দক্ষ ও বিচক্ষণ। শুধু রাজরা নন, জনসাধারণের পা-ও পড়তো গণিকালয়ে। সমাজে এর স্বীকৃতিও ছিল। অনেকের নাম তখন মুখে মুখেও ছড়িয়ে পড়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম এই আম্রপালি। আম্রপালিকে ইদানীং অনেকে আম রূপালিও বলে থাকে।

আড়াই হাজার বছর আগের এই পৌরাণক গল্পের এ নারী আজো বেঁচে আছে। বেঁচে আছে কিছুটা ইতিহাস ও কিংবদন্তির গাঁথা হয়ে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে