বিভাগ চালুর ১০ বছরেও শিক্ষক পায়নি রাজশাহী কলেজ

প্রকাশিত: জুন ১৪, ২০২২; সময়: ১০:০৪ pm |

আবু সাঈদ রনি : ১৮৭৩ সালের ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হওয়া উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজ। বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে আধুনিকতার ছোঁয়ায় মহিমান্বিত কলেজটির নাম ডাক সর্বত্রই।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিংয়ে ২৮ সূচকে টানা তিনবারের সেরা কলেজের স্বীকৃতিও রয়েছে দেশসেরা এই বিদ্যাপীঠের। এছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৪টি সূচকে প্রতিবারই সেরার মুকুট রাজশাহী কলেজের।

২০১২ সালে শুরু হওয়া কলেজের মার্কেটিং ও ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত আছে এখনও। অনার্সের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে মাস্টার্স ও প্রিভিয়াস মাস্টার্স কোর্সের অধ্যয়ন। কিন্তু শিক্ষার্থী ও কোর্স চালুর অনুমোদন পেলেও মিলেনি পদ সৃষ্টির প্রজ্ঞাপন। তাই বিভাগ চালুর ১০ বছর পেরোতে চললেও নিজস্ব কোনো শিক্ষক পায়নি বাণিজ্য শাখার বিভাগ দুইটি।

তথ্যমতে, ২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মার্কেটিং ও ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রমের অনুমোদন পায় রাজশাহী কলেজ। সেই অনুযায়ী ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষেই অনার্স শিক্ষা কার্যক্রমের তালিকায় যুক্ত হয় বিভাগ দুইটি। পরে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে চালু হয় মাস্টার্স ও প্রিভিয়াস মাস্টার্স। বর্তমানে প্রতিটি বিভাগেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা হাজার অতিক্রম করেছে। প্রতিটি বিভাগেই চলমান রয়েছে ৬টি করে বর্ষ। তবুও শিক্ষকের পদ সৃষ্টি না হওয়ায় নিয়োগ হয়নি কোনোই শিক্ষক।

দু’একজন অতিথি শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা-হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক টানাটানি করেই চলছে ক্লাস কার্যক্রম। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত সেবা পাচ্ছেন না ব্যবস্থাপনা-হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা, তেমনিভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন মার্কেটিং ও ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থীরাও।

এ বিষয়ে মার্কেটিং বিভাগে দায়িত্বরত ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুস সালাম জানান, ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে মার্কেটিং ও ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে পাঠদানের অনুমতি পাওয়া যায়। বিভাগ চালুর সময় ব্যবস্থাপনা বিভাগকে মার্কেটিং বিভাগ ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগকে ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কিন্তু বিভাগ চালুর ১০ বছরেও শিক্ষকের পদ সৃষ্টি না হওয়াটা চিন্তার। আমরা দুইটি বিভাগ চালাতে গিয়ে কোনো বিভাগকেই সঠিক সুবিধা দিতে পারছি না। উভয়েই বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া ইনকোর্স, ভর্তি কার্যক্রম বা ফরম পূরণের ক্ষেত্রে আমাদের উপরও বাড়তি একটা চাপ পড়েছে।

রুম সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ব্যবস্থাপনা বিভাগের চারটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। এর মধ্য থেকে মার্কেটিংকে একটি রুম দেওয়া হয়েছে। এতে করে এক রুমে যেমন মার্কেটিংয়ের ক্লাস চালানো যাচ্ছে না। আবার ব্যবস্থাপনা বিভাগেও ৩টি রুমে ক্লাস চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২০১৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নতুন প্রতিটি বিভাগের জন্য একজন অধ্যাপক, ৩ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৪ জন সহকারী অধ্যাপক ও ৪ জন প্রভাষকসহ মোট ২৪টি পদ সৃষ্টির আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনো অগ্রগতি হয় নি। পদ সৃষ্টি হলে শিক্ষক নিয়োগের সম্ভাবনা থাকে। একই সঙ্গে এই বিভাগগুলো চালু হওয়া বগুড়া আজিজুল হক কলেজে পদ সৃষ্টি হয়েছে নিয়োগও হয়েছে। কিন্তু এই কলেজে এখনও পদ সৃষ্টিই হয়নি। কবে হবে সেটিও সঠিক বলা যাচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, এই দুই বিভাগে শিক্ষক না থাকার প্রভাব পড়েছে উচ্চ মাধ্যমিকেও। সেখানেও ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের দুই বর্ষের ক্লাস ভাগ করে নেন ব্যবস্থাপনা ও হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা। উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের ক্লাস হিসাববিজ্ঞান ও দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস ব্যবস্থাপনা বিভাগ নেন বলে জানান আব্দুস সালাম।

ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে দায়িত্বরত হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবুল হাসনাত জানান, বিভাগ দুটি চালু হওয়ার সময় থেকেই বাড়তি কোনো রকম সুযোগ সুবিধা ছাড়াই চালাতে হচ্ছে। হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ৪ শিক্ষককে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। যাদের দুজনেই অন্যত্র বদলি হয়েছেন। ৩ জন পার্ট টাইম শিক্ষক এনে ক্লাস চালানো শুরু করলে তারাও অন্য চাকরি পেয়ে চলে গেছেন। বর্তমানে আর ভালো মানের শিক্ষকও পাওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষা কার্যক্রম কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে, তবুও যতটা পারা যায় সমন্বয় করে দুই বিভাগই চালানো হচ্ছে।

কলেজের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের বিভাগের নিজস্ব কোনো শিক্ষক না থাকায় একাডেমিক ক্লাসের বাহিরে কোনো গবেষণা বা গভীরতর শিক্ষার সুযোগ নেই। তাই মার্কেটিং বিষয়ক কোনো সভা-সেমিনার বা আলোচনার সুযোগ পাই না। এমনকি বাংলাদেশ মার্কেটিং এসোসিয়েশনের কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণেরও সুযোগ পাই না।

এছাড়া, পরীক্ষার ক্ষেত্রে অন্য বিভাগের শিক্ষক দ্বারা খাতা মূল্যায়ন করার কারণে সঠিক মূল্যায়ন হয় না। তাদের মন মতো না হওয়ার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়াও কঠিন হয়। আর মাত্র একটি শ্রেণিকক্ষ। সেজন্য কোনো ইয়ারের ক্লাস টেস্ট বা ইনকোর্স পরীক্ষা থাকলে বাকিদের কারো ক্লাস করা সম্ভব হয় না।’

রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান জানান, বিভাগ চালু হওয়ার পরে পদ সৃষ্টি ও শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বরাবর আবেদন জানানো হয়েছিল। তার কিছুদিন পরে সারাদেশের প্রায় ৪০ জনের মতো অধ্যক্ষ নিয়ে একটা কর্মশালা ছিল, সেখানেও পদ সৃষ্টি ও শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে বলেছি। মাউশির পক্ষ থেকে একটা টিম সার্ভে করে দেখে সারাদেশে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার পদ সৃষ্টি করতে হবে। সেই প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সারাদেশে একসঙ্গে পদ সৃষ্টি হবে বলে জানানো হয়।

রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহা. আব্দুল খালেক জানান, বিভাগ চালু হওয়ার পরপরই আগের অধ্যক্ষের সময় আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু আবেদন পাঠানোর পর আর কোনো আপডেট পাওয়া যায়নি। ফাইল চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে বলে মনে হচ্ছে। আবারও আবেদনের কথা ভাবা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলেও জানান অধ্যক্ষ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে