অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা এখন জরুরি

প্রকাশিত: মে ২২, ২০২২; সময়: ২:০৫ pm |

পদ্মাটাইমস ডেস্ক : বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির চিন্তা ঝেড়ে ফেলে এই মুহূর্তে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা জরুরি।

এমন সুপারিশ করেছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা। তাঁরা বলেছেন, এই মুহূর্তে মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শনিবার ‘অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও বাজেট প্রত্যাশা’ শিরোনামে এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এ পরামর্শ দেন।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের অস্থিতিশীলতাসহ সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বিষয়ে আলোচকরা গুরুত্ব দেন। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনীতিতে সংকট বিরাজমান ও বিকাশমান। এ জন্য সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে ২ থেকে ৩ বছরের কাঠামো ধরে স্বল্পমেয়াদে সংকট উত্তরণে মনোযোগ দিতে হবে।

তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধিকে ‘অনন্য দেবতা’র জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন প্রবৃদ্ধিকে সেখান থেকে সরিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব দিতে হবে।

নিম্ন ও সীমিত আয়, অসুবিধাগ্রস্ত মানুষ ও মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতা যাতে টিকে থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। মূল্যস্ম্ফীতিকে সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, মুদ্রার বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে ধরে রেখে স্থিতিশীল রাখা যাবে না। আর সুদহার বাজারভিত্তিক করতে হবে। অন্যদিকে ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রবাহ বিঘ্নিত করা যাবে না।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্রশাসননির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা চলছে। এক ধরনের অটোপাইলট বা অদৃশ্য চালকের মাধ্যমে অর্থনীতি চলছে। এ অবস্থায় বাজারের ওপর আস্থা রাখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলমগীর কবির বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে খুব জটিল সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ব্যাংক ডলারের দর ৮৭ টাকা ৪০ পয়সা ঘোষণা করছে। বাস্তবে ৯৫ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। এক কথায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

তিনি বলেন, অর্থনীতির নীতি কার হাতে এবং কেমন, তা বোঝা যাচ্ছে না। আগামীকাল আমদানি করতে হলে ডলার পাওয়া যাবে কিনা বা কত দামে পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। সরকার সব সময় বলে আসছে, পরিস্থিতি ভালো; কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এখন ব্যবসায় যে লোকসান হচ্ছে, তার দায় কে নেবে?

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, গত বছর বৈদেশিক মুদ্রায় দেশ সয়লাব হয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার কিনে নেয়। এতে বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়ে যায়।

এখন তার উল্টো হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি বিক্রি করেছে। ফলে বাজার থেকে টাকা কমে গেছে। তাঁর মতে, দেশে নতুন ধরনের ও উচ্চমূল্যের পণ্য আমদানি হচ্ছে।

ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও নিয়ন্ত্রণ করছে। মূল্যস্ম্ফীতি বাড়লে সুদহার বাড়া উচিত। সামগ্রিকভাবে যে ধরনের সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা মোকাবিলাই এখন জরুরি।

গবেষণা সংস্থা র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান এমএ রাজ্জাক বলেন, এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রবৃদ্ধিকে বিসর্জন দিতে হবে। এ জন্য প্রকৃত বিনিময় হার দরকার। ধীরে ধীরে হলেও টাকার মান কমাতে হবে।

তিনি বলেন, মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বাড়াতে পারে। সরকার যে এক কোটি ৮৬ লাখ পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল ৫ মাস দিচ্ছে, তা দ্বিগুণ করা যেতে পারে।

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় নানান ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অর্থনৈতিক নীতিতে সমন্বয়ের অভাব। এখন অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসা কুক্ষিগত হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল ও রাজস্ব বোর্ডের ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।

ইউএনডিপির কান্ট্রি ইকোনমিস্ট ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ম্ফীতিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। তিনি মূল্যস্ম্ফূীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বলেন, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, তাও মাথায় রাখতে হবে।

গবেষণা সংস্থা সানেমের গবেষণা পরিচালক সায়মা হক বিদিশা বলেন, মূল্যস্ম্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন মুখ্য হওয়া উচিত। এ জন্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা ও সুদহার বাড়ানো যেতে পারে।

বিআইডিএসের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট তাহরিন তাহরীমা চৌধুরী বলেন, শিক্ষার লোকসান কাটানোর উদ্যোগ নিতে হবে বাজেটে। শিক্ষার্থীরা পুনরায় লেখাপড়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে, সে উদ্যোগও নেওয়া দরকার। দরিদ্রদের সহায়তার জন্য জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়াতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপে