‘চলনবিলে সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার দাবী’

‘চলনবিলে সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার দাবী’

প্রকাশিত: ০৭-০৫-২০১৮, সময়: ১০:৫৯ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক, নাটোর : চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলায় অতিবর্ষণে সৃষ্ট অকালবন্যা রোধে কৃষি বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সুপারিশ নিয়ে এক বছর আগে নয় দফা প্রস্তাবনা তৈরী করেছিল নাটের জেলা প্রশাসন। সে সময় ওই দুই উপজেলায় সৃষ্ট অকালবন্যা পরিদর্শনে আসেন দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তার নিকট পেশ করা হয় ওই প্রস্তাবনাসমূহ। ত্রাণমন্ত্রী সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রনালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং সে অনুযায়ী তড়িত পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন।

প্রস্তাবগুলো প্রেরণ তো দূরের কথা, এক বছর পর খোঁজ করা হলে তার একটিরও হদিস পাওয়া যায়নি। নয় দফার ব্যাপারে এখন তথ্যই নেই জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কাছে। অথচ ২০১৭ সালের ১লা মে মধ্যরাত পর্যন্ত ত্রাণমন্ত্রী ও জেলা প্রশাসনের বৈঠকে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে জেলার সকল উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তাদের সামনেই প্রস্তাবগুলো দেয়া হয়।

প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে ছিলো- সিংড়া উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত আত্রাই নদীতে রেগুলেটর নির্মাণ করে পানি নিয়ন্ত্রণ ও অতিবৃষ্টি থেকে ফসল রক্ষায় খালগুলোর পানি নিষ্কাশন, চলনবিল এলাকার সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন, সিংড়ার রাণীনগর, পাটকোল,সারদানগর, বিলদহর, আনন্দ নগর, বিলহরবাড়ি ও জোড়মল্লিকাঘাট, নলডাঙ্গার হালতিবিল এবং গুরুদাসপুরের যোগেন্দ্রনগর ও ভাসানী খালের উপর রেগুলেটর ও স্লুইচগেট নির্মাণ এবং মেরামত, সিংড়ার ছাতারদীঘি ইউনিয়ন বাঁধের ভাঙ্গন রোধে তীর প্রতিরক্ষা প্রকল্পের বাস্তবায়ন, সিংড়া ও গুরুদাসপুরের খালগুলোর পরিকল্পনামাফিক ড্রেজিং, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ, প্রয়োজনে মওকুফ, অতিবৃষ্টিতে নিমজ্জিত সিংড়া ও গুরুদাসপুরের কৃষকদের পরবর্তী মৌসুমে কৃষি প্রণোদনাদান, সিংড়া ও গুরুদাসপুরের সড়কগুলো ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ এবং গুরুদাসপুরের ভাসানী, ভদ্রা ও মির্জা সাইদ খাল পুনঃখনন।

মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার কাছেও অনুরুপ দাবী ছিল সিংড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলার কৃষকদের। মন্ত্রী ত্রাণ দিতে গেলে তারা ত্রাণের পরিবর্তে দ্রুত রেগুলেটর, স্লুইচগেট নির্মাণ, খালখনন ও ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পরবর্তী ক্ষতির হাত থেকে তাদের রক্ষার দাবী করেন। এসময় মন্ত্রীমোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন।

দুই উপজেলার কৃষকদের অভিযোগ, মন্ত্রী ফিরে গেলে আর কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। সাড়ে তিন মাস পর আবারো বন্যার কবলে পড়ে তাদের ফসল। বাঁধ ভেঙ্গে পানি ঢুকে নিমজ্জিত হয় হাজার হাজার একর জমির ধান। আর বছরঘুরে আবারো ফসলহানি। সিংড়ায় চলতি বছর ৩৮ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে । এর মধ্যে সরকারি হিসেবে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়েছে মাত্র ১০ হেক্টর ও আংশিক নিমজ্জিত হয়েছে ৫০ হেক্টর। তবে বাস্তবে পরিমাণ আরো বেশি। উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক আশ্বাসের পরও দাবীগুলো পূরণ না হওয়ায় ক্ষুদ্ধ কৃষকরা। পরপর তিনবার ফসলহানির কবলে চলনবিলের কৃষক। সাম্প্রতিক সময়ের অতিবর্ষণ ও বন্যায় বেশিরভাগ কৃষকেরই ডুবেছে সম্পূর্ণ বোরো ধান। ন্যায্য দাম না পাবার শঙ্কা তো আছেই, তার উপর ফসলহানি। সবমিলিয়ে ধানের মতই হতাশায় ডুবছে কৃষকরা।

সিংড়া উপজেলার চলনবিলের দুর্গম ডাহিয়া গ্রামের কৃষক আবু হানিফ বলেন, গতবছর অতিবর্ষণের পর ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্থানীয় কাটাগাং খালটি খনন করার। তার প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এবারে অতিবর্ষনের পানি বেরবাড়ি-সোনাপাতিল খাল উপচে ঢুকেছে ধানের জমিতে। গত মৌসুমে একই কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তিনি। যে জমি থেকে অন্য বছরে বিঘাপ্রতি ৩০ মন ধান পেয়েছেন,সেখানে গত বছর পেয়েছেন সর্ব্বোচ্চ ২০ মন। এবার তা আরও কমে ১০ মন করে পাচ্ছেন। না পাকতেই জমির ধান পানিতে তলিয়ে যায়। একই গ্রামের আমেনা বেগম জানান, অন্যের জমি কট নিয়ে ৪ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। ধান পাকার আগেই পানিতে ডুবে গেছে। স্বামী ও দুই শিশু সন্তানকে সাথে নিয়ে ওই ধান কেটে নিয়েছেন। ওই ধানের ফলন ভাল হয়নি। ভিজা ধান শুকিয়ে আশানুরুপ কিছুই পাওয়া যাবেনা। এখন ঋনের টাকা শোধ করা সহ ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া চলবে কিভাবে সে চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

একই উপজেলার দমদমা এলাকার আলতাব হোসেন ৬ বিঘা জমিতে রোপণ করেছিলেন বোরো ধান। পাকার ক’দিন আগেই অতিবর্ষণে ডুবেছে সবটুকু। সাতপুকুরিয়া এলাকার কৃষক সজলেরও ১৭ বিঘা জমির আধাপাকা ধান এখন পানির নীচে। চৌগ্রামের ইসমাইল হোসেন, সরদানগরের তাজুল ইসলাম, দক্ষিণ দমদমার সাইদুল ইসলামসহ কয়েকশ কৃষক নিমজ্জিত আধাপাকা ধান কেটে ঘরে নিয়েছেন। তবে এই সময়ে শ্রমিক সংকট প্রকট আকারে দেখা দেওয়ায় কৃষকদের সময়মত ধান কেটে ঘরে তুলতে বাড়তি খরচ করতে হয়।
অবস্থাদৃষ্টে, শস্যভান্ডার খ্যাত চলনবিলের কৃষকরা এখন উভয় সংকটে। একদিকে পানিতে ডুবছে ধান, অন্যদিকে নেই ফসল কাটার শ্রমিক। ফলে বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে চলনবিলের কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। সংখ্যায় নগণ্য শ্রমিক কাজ করতে রাজী হচ্ছে বেশী টাকায়। এতে ধান কেটে ঘরে তুলতেই বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে কৃষককে। চলনবিল এলাকার কৃষকদের কাছে অতিবর্ষণ এখন আতঙ্কের। বৃষ্টির পানি নামার জন্য খালগুলো খনন নেই দীর্ঘদিন। তার উপর চলনবিলের বিভিন্নস্থানে সোঁতিজাল ও বাঁধ দিয়ে পানি আটকে মাছ শিকার করছে প্রভাবশালীরা। অপরিকল্পিত পুকুরখনন তো রয়েছেই। জীর্ণ স্লুইটগেটগুলো কাজে আসছে না কৃষকদের। দুর্যোগকালীন সময় ব্যতিরেকে অন্য সময় আলোচনার বাইরেই থাকছে চলনবিলের কৃষকের সমস্যা।

চলনবিল নিয়ে কাজ করা সংগঠন চলনবিল জীববৈচিত্র সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক আক্তারুজ্জামান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক দূর্যোগে ফসলহানির ঘটনা ঘটছে চলনবিলে। এমনটি অব্যাহত থাকলে আশংকাজনক হারে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাবে। ফসলহানি রক্ষায় সময়োপযোগি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়ই মূলত অকালে ফসলহানির জন্য দায়ী। তবে মানবসৃষ্ট বাধাগুলো দূর করা গেলে ক্ষতি কিছুটা কমবে। অপরিকল্পিত ভাবে পুকুর খনন,নদী ও খাল সংস্কার,স্লুইস গেই নির্মান সহ পানি নিস্কাসনের জন্য করা খাল দখল মুক্ত করা।

চলবিলের ফসল রক্ষায় সময়োপযোগি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ব্যাপারে একমত পোষণ করে নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, খাল খনন, স্লুইচগেট নির্মাণসহ কৃষকদের দাবীগুলো পূরণেরর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ফসলের চাষাবাদ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা যেতে পারে। বিষয়টি ভেবে দেখা হবে। তবে অপরিকল্পিত পুকুর খননের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া গত মৌসুমে চলনবিল সহ নদ নদীতে সোঁতি জালসহ নিষিদ্ধ জাল ও বানা দিয়ে মাছ শিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

আরও খবর

  • পাটের দামে হাসির ঝিলিক
  • আমনের শুরুতেই পোকার আক্রমণ, দুশ্চিন্তায় বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক
  • বাঘায় লক্ষমাত্রা অতিক্রম করেছে পাট উৎপাদনে
  • লালপুরে ৩ দিনব্যাপী ফলদ বৃক্ষ মেলা শুরু
  • কৃষকের স্বপ্ন এবার আকাশে
  • বৃষ্টিহীন রাজশাহীতে দুশ্চিন্তায় চাষি
  • নলডাঙ্গায় ফলদ বৃক্ষ মেলার উদ্বোধন
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
  • চারঘাটে ৯ হাজার বৃক্ষ রোপন
  • রাজশাহী জেলায় বৃক্ষরোপন কর্মসুচির উদ্বোধন
  • জয়পুরহাটে ফলদ বৃক্ষ মেলার উদ্বোধন
  • রাজশাহীতে পাট কাটা শুরু, দামের আশা
  • পাবনায় বাদম চাষে কৃষক পরিবারে এসেছে স্বচ্ছলতা
  • রাজশাহীতে কমেছে চালের দাম, বাড়ছে মরিচের
  • উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মরিচে ঝাল বাড়ছে


  • উপরে