রাজশাহীতে পান বরজ তৈরীর হিড়িক

রাজশাহীতে পান বরজ তৈরীর হিড়িক

প্রকাশিত: ২০-১১-২০১৯, সময়: ১৬:২৬ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : অনুকুল আবহাওয়া ও ভাল দাম পাওয়ায় এবারে পান চাষে ঝুকেছেন রাজশাহীর চাষিরা। জেলায় পানচাষ হয় এমন উপজেলাতে গেলেই চোখে পড়বে পানবরজ তৈরীর হিড়িক। পান নিয়ে চাষিরা আগামী স্বপ্নপূরণের জাল বুনছেন। যদিও মড়কে পুরো বরজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। প্রেক্ষিতে রাজশাহীতে পান গবেষণা কেন্দ্র চাষিদের এখন সময়ের দাবি। যা আজও পূরণ হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই মোড়ক হলে স্থানীয় সার ও কীটনাশক ডিলারের পরামর্শে চলতে হচ্ছে।

কৃষকের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা একেবারই প্রকৃতি নির্ভর। প্রকৃতির অমোঘ সৃষ্টিতে মাটির খেলায় কখনো ধনী আবার কখনো গরীব। যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে মাথার ঘাম মাটির সাথে মিশিয়ে আগামীর স্বপ্নের বীজ বুনে তারাই কৃষক-চাষি। ক্ষেতে আবাদ করে এ বছর লাভ তো আগামী বছর লোকসান। আবার লোকসানের মধ্যদিয়ে লাভের মুখদেখা কৃষকের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এরপরেও আশায় বুক বেধে অনতিকাল ধরে চাষ করে চলছে নানা ধরণের ফসল ফসলাদি। এরমধ্যে পান চাষ অর্থকরি ফসল হিসেবে অবদান রাখছে।

গত তিন বছর থেকে পান চাষিদের পিছনে তাকাতে হয়নি। এবারেও রাজশাহীর চাষিরা পান চাষে লাভবান হচ্ছেন। এ কারণে জেলা-উপজেলায় দিনদিন চাষিদের মাঝে আগ্রহ বাড়ছে পান চাষে। দেশ-বিদেশে রাজশাহীর সুস্বাদু পানের কদর দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলায় গতবছরই পানের আবাদ বেড়েছে ২ হাজার সাড়ে ৪শ’ বিঘা। এ বছর আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি গ্রামেই পানের আবাদ দ্বিগুণ হচ্ছে। অন্যান্য আবাদের তুলনায় পানচাষে লাভ হওয়ায় চাষিরা ঝুকছেন সেদিকেই। এ বছর নতুন বরজ করেছেন মৌগাছি গ্রামের গাজিমুদ্দিন শেখ, আব্দুস সালাম, আলতাফ হোসেনের মত প্রায় ২০ জন।

প্রতি বছরই মোড়কে পানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পানের ক্ষেতও ভাঙ্গা-গড়া চলে প্রতিবছর। কিন্তু পান চাষিদের প্রাণের দাবি পান গবেষণা কেন্দ্র আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে বর্তমান বাজারে পানের দাম ভাল পাওয়ায় চাষিরা খুশির জোয়ারে ভাসছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, রাজশাহী জেলায় ছয়টি উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৮শ’ ২১ হেক্টর ( ১৩ হাজার ৬শ’ ৬০ বিঘা) জমিতে পানের আবাদ রয়েছে। পান উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৯শ’ ৫৪ মে.টন। বর্তমান বাজার মূল্যে যার গড়দাম প্রায় ১১০ কোটি টাকা।

জেলায় প্রায় ২৫ হাজার সাড়ে ৫শ’ পানের ক্ষেত বা বরজ আছে। আর এই আবাদের সাথে প্রত্যেক্ষ জড়িয়ে আছে প্রায় এক লাখ পান চাষির জীবন-জীবিকা। প্রতি বছরই বাড়ছে বরজের পরিধি। জেলার পবা, মোহনপুর, বাগমারা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া এবং চারঘাটে পান চাষ হয়ে থাকে। অন্যান্য কৃষি আবাদের তুলনায় বর্তমানে পান চাষে বেশি লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। বাজারে পানের দাম ভাল পাওয়ায় চাষিদের বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে। আর এসব উপজেলায় পান বিক্রির জন্য গড়ে উঠেছে পানহাট। জেলার বড় পান হাটগুলো হচ্ছে, বাগমারা উপজেলার মোহনগঞ্জ, তাহেরপুর, মছমইল, একডালা, পবা উপজেলার তেকাঠাপাড়া, নওহাটা, দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি, কালিগঞ্জ, কানপাড়া, মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি, ধুরইল, একদিলতলা, কুঠিবাড়ি এবং ধোপাঘাটা পান হাট।

সরেজমিন রোববার মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি পান বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, বড়-ছোট আকৃতি অনুযায়ী প্রতি পোয়া (২০৪৮টি) পানের দাম ছিল ৩শ’ থেকে ২ হাজার ৫শ’ টাকা। যার মধ্যে ছোট পান ৮শ’ টাকা, মাঝারি ১ হাজার ৬শ’ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা এবং মোটা বা বড় পান ২ হাজার ৫শ’ থেকে ৩ হাজার ৬শ’ টাকা। পানচাষি মৌগাছি গ্রামের মাহবুব আলম তোতা শেখ, সুনখেজুর গ্রামের সাইবত আলী এবং দুর্গাপুরের কানপাড়া দুর্গাদহ গ্রামের তমিজউদ্দিন বলেন, মড়ক না লাগলে অন্যান্য কৃষি ফসলের তুলনায় পান চাষে লাভের পরিমাণই অনেক বেশী। পানকে তারা সোনার পাতার সঙ্গে তুলনা করেন। ভাল পান হলে ১০ কাঠার বরজ থেকে বছরে পান বিক্রি করে তিন থেকে চার লাখ টাকা লাভ করা যায়। যা অন্য কোনো ফসলে সম্ভব নয়। তারা আরো বলেন, পান বহন করা সহজ। বাড়ি থেকে মাথায় করে অনায়াসে ১০ হাজার টাকার পান বহন করা যায়।

তারা আরো বলেন, মাঝে মাঝে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। তবে ফলাফল এখনও শুন্য রয়েছে। অনেকে অভিযোগ করে বলেন প্রকৃত পান চাষিদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন থাকলেও রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় ও স্থানীয় প্রশাসন তা করেন না। ফলে ক্ষতির পরিমান বেড়ে যায়।

পান ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার এবং মকবুল হোসেন বলেন, ভারত থেকে এলসি’র মাধ্যমে পান দেশে না আসলে দেশের বাজারে পানের দাম আরো বৃদ্ধি পেত। এলসি’র কারনে দেশের পান ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হচ্ছে। আবার এলসি’তে যে পান আসে সে পানগুলোর আকার বড় হলেও স্বাদ আমাদের পানের চেয়ে অনেক নিম্নমানের। রাজশাহীর মতো বরিশাল, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও সাতক্ষিরা জেলাতেও পানের চাষ হচ্ছে। জানা গেছে তাদেরও একই দাবি পান গবেষনা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য।

জানা গেছে, ২০১০-১১ সালে রাজশাহী জেলায় পান বরজ ছিল ১ হাজার ৪শ’ ৯৫ হেক্টর ( ১১ হাজার ২শ’ ১২ বিঘা)। এ সময়ে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮শ’ ২১ হেক্টর (১৩ হাজার ৬শ’ ৬০ বিঘা)। যার মধ্যে পবায় ৭শ’ ৯৩ বিঘা, মোহনপুর উপজেলায় সাড়ে ৪ হাজার বিঘা, বাগমারায় ৪ হাজার ৬শ’ ৫০ বিঘা, দুর্গাপুর উপজেলায় ৩ হাজার ৮শ’ ৪০ বিঘা, পুঠিয়ায় ২শ’ ৭০ বিঘা এবং চারঘাট উপজেলায় ৩ বিঘা জমিতে পানের বরজ আছে।

পানের মড়কে কি কি পদক্ষেপ গ্রহন করেন, এমন প্রশ্নের জবাবে পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রহিমা খাতুন বলেন, পান চাষিদের পানবরজ পরিস্কারসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পানের রোগে কোন নির্ধারিত কীটনাশক না থাকায় এবং পান নিয়ে গবেষণার কোন সুযোগ না থাকায় মাঝে মাঝে পান চাষিদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের যখন সভা সেমিনার হয়, তখন পান গবেষণার জন্য সুপারিশ পাঠানো হয়। তিনি আশা করেন, পান গবেষনাগার স্থাপনে সরকার খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামছুল হক বলেন, পানে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে। যে আবাদে চাষিরা লাভবান সেই আবাদে ঝুকে পড়েন তারা। পানের ভাল দাম পাওয়ায় জেলায় পানের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে বেশী বরজ বৃদ্ধি পাচ্ছে মোহনপুর উপজেলায়।

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় পান বরজের সাথে প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে লাখ খানেক পরিবার। এই এলাকায় পান একটি অর্থকরি ফসল। দিন দিন এই আবাদের পরিধি বাড়ছে। তবে প্রতিবছরই মড়কে কোটি কোটি টাকার পান নষ্ট হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘মড়ক ধরলে এবং পানের কোন ধরণের ব্যত্যয় হলে চাষিরা বিষ প্রয়োগ করছেন এবং সেই পান বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুকি বাড়ছে। কীটনাশক প্রয়োগ না করে স্বাভাবিকভাবে যায় কিনা সে বিষয়ে গবেষণাও প্রয়োজন। সব মিলিয়ে পান গবেষণা কেন্দ্র জরুরী’। আগামীতে সংসদে এ বিষয় উপস্থাপন করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পান চাষীদের বিজ্ঞানসম্মতভাবে পান চাষে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে এর উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। আর দেশের বাইরে রাজশাহীর পানের বাজার যদি আরও বাড়ানো করা যায় তবে পানও হতে পারে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য একটি বিশাল খাত।

উপরে