মান্দার ধর্ষক রাজ্জাকের আয়ের উৎস চাঁদাবাজি

মান্দার ধর্ষক রাজ্জাকের আয়ের উৎস চাঁদাবাজি

প্রকাশিত: ০২-০৮-২০১৭, সময়: ১৭:১৬ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক, মান্দা : নওগাঁর মান্দায় স্কুলছাত্রী অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর কথিত সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাকের (৩৫) বিভিন্ন অপকর্মের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ হতে শুরু করেছে। পারিবারিকভাবে আয়ের কোনো উৎসই ছিল না তার। চ্যানেল এস নামে একটি সংস্থার পরিচয়পত্র ও লগো ব্যবহার করে মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি করে আসছিলেন তিনি। এটিই ছিল তার আয়ের প্রধান উৎস। সম্প্রতি ২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় কিনেছেন বিলাস বহুল মোটরসাইকেল।
একে একে ১০ জন নারীকে বিয়ে করেছেন কথিত এই সাংবাদিক। কিছুদিন সংসার করার পর আবার ছেড়েও দিয়েছেন তাদের। বিয়ে করা যেন তার ফ্যাসন ও ভোগবিলাসে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তিনি দুইমেয়ে ও দুইছেলের জনক। গত শনিবার (২৯ জুলাই) দশম শ্রেণির এক শিক্ষাথীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করতে গিয়ে তিনি ফেঁসে যান। ওই শিক্ষার্থীর মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তাকে যেতে হয়েছে জেলহাজতে। গ্রেপ্তারকৃত আব্দুর রাজ্জাক মান্দা উপজেলার দক্ষিণ পরানপুর গ্রামের রিয়াজ উদ্দিন সরদারের ছেলে।
দক্ষিণ পরানপুর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, আব্দুর রাজ্জাকের বাবা রিয়াজ উদ্দিন সরদার পেশায় একজন ডালি, ঝাকা (বাঁশের তৈরি) বিক্রেতা। এ পেশার আয় দিয়েই সংসার চালিয়ে নিতেন। বসতভিটার ৩ শতক জমিই ছিল তার একমাত্র সম্বল। রিয়াজ উদ্দিনের দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বিবির সন্তান আব্দুর রাজ্জাক। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রতিবেশির ছাগল চুরি করে এলাকা ছাড়া হয়েছিলেন তিনি।
রাজ্জাকের সৎমা শহিদা বিবি জানান, দীর্ঘদিন পর রাজ্জাক বাড়ি ফিরে আসে। এরপর বিয়ে করার জন্য বাবার ওপর চাপ দেয়। এ সময় নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার ছাতড়া এলাকায় নার্গিস আক্তার নামে এক মেয়ের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পর থেকে নার্গিসকে প্রায়ই নির্যাতন করত সে। এক পর্যায়ে নার্গিস আক্তার অন্তসত্তা হয়ে পড়লে নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ওই অবস্থায় সে বাবার বাড়ি চলে যায়। পরবর্তীতে এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেয় নার্গিস।
শহিদা বিবি আরো জানান, এরপর রাজশাহীর তানোর উপজেলার মাদারীপুর এলাকায় চায়না খাতুন নামে এক নারীকে বিয়ে করে রাজ্জাক। এ পক্ষের একটি ছেলে রয়েছে তার। ছেলে জন্মের কিছুদিন পর চায়নাকে তালাক দিয়ে চলে যায় চুয়াডাঙ্গা জেলায়। সেখানে থাকা অবস্থায় রাজিয়া সুলতানা নামে আরেক নারীকে বিয়ে করে। কিছুদিন পর তাকে ছেড়ে চলে যায় ঢাকায়। সেখানে অবস্থানকালে বিয়ে করে সূচনা নামে স্থানীয় এক নারীকে। এ পক্ষের একমেয়ে ও একছেলে রয়েছে। সূচনাকে ছেড়ে রাজশাহীর সুমি ও মান্দা উপজেলার বড়বেলালদহ গ্রামের সাবিনা আক্তার সাথীকে বিয়ে করে। একইভাবে তাদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ বিয়ে করে নিয়ামতপুর উপজেলার বালাতৈড় এলাকার শারমিন আক্তারকে। এ বিয়েও টিকে ছিল মাত্র ছয় মাস। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জে আব্দুর রাজ্জাক আরো দুটি বিয়ে করেছে। তবে ওই দুই নারীর নাম জানাতে পারেন নি তারা।
স্থানীয় একাধিক সুত্র জানায়, কথিত সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাকের আয়ের উৎসই ছিল চাঁদাবাজি। নওগাঁর মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলার মাদক পয়েন্টগুলোসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন। তাকে এ কাজে সহায়তা করতেন নিয়ামতপুর উপজেলার সৈয়দপুর জুলুপাড়া গ্রামের একরামুল হকের ছেলে লিখন বাবু (২৬)। তাকে ডিবি পুলিশের সেকেন্ড অফিসার সাজিয়ে মাদক পয়েন্টগুলোতে হানা দিয়ে আদায় করত মোটা অংকের টাকা।
গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মান্দা উপজেলার আইওরপাড়া ঋষি পল্লিতে চাঁদা আদায় করতে গিয়ে স্থানীয়দের হাতে আটক হয় ডিবির কথিত সেই সেকেন্ড অফিসার লিখন বাবু। এসময় কৌশলে সেখান থেকে সটকে পড়ে কথিত সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক। পরে লিখনকে পুলিশে সোপর্দ করে স্থানীয়রা। পুলিশ তাকে ১৫১ ধারা জেলহাজতে প্রেরণ করে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনিছুর রহমান। তিনি বলেন, চ্যানেল এস এর সাংবাদিক পরিচয়দানকারী আব্দুর রাজ্জাক নারী কেলেংকারীসহ বহু অপকর্মের সঙ্গে জড়িত।
সুত্রটি আরো জানায়, সাংবাদিক পরিচয়ে ২০১৫ সালের ৯ আগস্ট মান্দা উপজেলার বানিসর কালিতলা বাজারে মাদক পয়েন্ট থেকে চাঁদা আদায় করতে গিয়ে জনতার হাতে আটক হন আব্দুর রাজ্জাক ও তার সহযোগী বুলবুল আহমেদ। জনতা তাদের গণধোলাই দিয়ে আটক করে রাখে। সংবাদ পেয়ে তৎকালিন ওসি মোজাফফর হোসেন ও স্থানীয় চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মোল্লা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তাদের উপস্থিতিতে জনতার নিকট ক্ষমা চেয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পান আব্দুর রাজ্জাক ও বুলবুল আহমেদ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেলুয়াবাড়ি এলাকার মঙ্গল ওরাও নামে আদিবাসী এক বৃদ্ধকে মুক্তিযোদ্ধার কার্ড বানিয়ে দেওয়ার কথা বলে রাজ্জাক তার নিকট থেকে হাতিয়ে নেন ২৫০০ টাকা। এছাড়া ফিরোজা ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ ক্লিনিক, প্যাথলজি, বিস্কুট ফ্যাক্টরী, কলা বিক্রেতাসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
উল্লেখ্য, গত শনিবার দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে অপহরণের পর ধর্ষণ ঘটনায় চ্যানেল এস এর সাংবাদিক পরিচয়দানকারী আব্দুর রাজ্জাককে (৩৫) গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। ওই শিক্ষার্থী ছিল তার ভোগবিলাসের ১১তম শিকার। তার দায়েরকৃত মামলায় আব্দুর রাজ্জাক বর্তমানে হাজতবাস করছে।

উপরে