আমনের শেষ সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে কারেন্ট পোকার আক্রমণ

আমনের শেষ সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে কারেন্ট পোকার আক্রমণ

প্রকাশিত: 02-11-2019, সময়: 18:13 |
Share This

আসাদুজ্জামান মিঠু, তানোর : চলতি বছর বরেন্দ্র অঞ্চল জুড়ে আমন চাষের শুরু থেকেই পোকা দমনে অগ্রিম প্রচারণা পত্র, মাইকিংসহ নানা পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। কৃষকেরা সে মোতাবেক পোকা দমনে ব্যাপক প্রস্ততি নিয়ে ছিল।

আমন ক্ষেতে একাধিক বার কীটনাশক প্রয়োগও করেছেন। কিন্ত কোন কাজ হয়নি। মাঠে মাঠে এখন আধা-পাকা ধান। আর মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই আমন কাটা-মাড়াই শুরু হবে।

এ শেষ সময়ে মধ্যেই ব্যাপক ভাবে পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলে আমন ক্ষেতে বাদামী গাছ ফড়িং পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। কীটনাশক প্রয়োগ করেও কোন ফল মিলছেনা। এতে করে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষকেরা।

বাদামী গাছ ফড়িং/কারেন্ট পোকার আক্রমন সব চেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে বরেন্দ্র অঞ্চল বলে পরিচিত রাজশাহীর গোদাগাড়ী,তানোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলাতে। এছাড়াও নওগাঁর জেলার পোরশা, নিয়ামতপুর উপজেলাতে কারেন্ট পোকার আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকেরা জানান,এবার আমন ধান ক্ষেতে ভাল ছিল। শেষ সময়ে এসে বাদামী গাছ ফড়িং পোকার আক্রমণে ক্ষেতের ধান গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত শুকনো খড় হয়ে যাচ্ছে। দুই-তিন বারের বেশি কীটনাশক ব্যবহার করেও কোন প্রকার লাভ হচ্ছে না।

আর মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা বাদামী গাছ ফড়িং পোকাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও স্বর্না জাতের ধান কে দায়ী করছেন। সে সাথে আমনে পোকা দমনে কৃষকদে সচেতন করতে নানা মুখি পরামর্শ দিয়ে গ্রামে গ্রামে মাইকিং করে প্রচারণা চালানোর দাবি করেছেন।

চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া ও সময় মত বৃষ্টির হওয়াই রাজশাহী অঞ্চলে অন্যসব বছরের চেয়ে এবার মাঠে আমন চাষাবাদ ভাল হয়েছিল। বাম্পার ফলনে সম্ভবনার রয়েছিল।কিন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ কারেন্ট পোকার আক্রমণে কৃষকের স্বপ্ন নষ্ট হতে চলেছে।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় আমনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ হাজার ২২৪ হেক্টর জমিতে। এছাড়াও রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমন চাষাবাদ হবে আরো ৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরের উপরে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চান্দালায় গ্রামের কৃষক খাইরুল ইসলাম । গত বছর আমন চাষ করে দাম না পেয়ে লোকসান গুনতে হয়েছিল। তবুও চলতি মৌসুমে গত বছরের লোকসান মাথায় নিয়ে ১২ বিঘা জমিতে একান্ন ও সুমন স্বর্না জাতের ধান চাষ করেছেন।

আর ১৫ দিন পর সোনার ধান ঘরে উঠবে এমনি আশাই স্বপ্নরের বুকবেধে ছিলেন তিনি। ক্ষেতে ধানের মাথা এবার ভালই ছিল। কিন্ত শেষ সময়ে এসে তার ৫ বিঘা সুমন স্বর্না জাতের ক্ষেতে বাদামী গাছ ফড়িং পোকার আক্রমন দেখা দেয়াই ঘরে ধান তুলতে পারবে কিনা এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে তিনি।

একই গ্রামের কৃষক তসিকুল ইসলাম ও জালাল উদ্দিন সহ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন কৃষকের ক্ষেতেও বাদামী গাছ ফড়িং পোকার আক্রমনে ক্ষেতের ধান নষ্ট হতে বসেছে বলে তারা জানান।

তানোর উপজেলার বাধাইড় ইউপির গাল্লা গ্রামের কৃষক ইসাহাক আলী। চলতি মৌসুমে ৬ বিঘা আমন চাষ করেছেন। তার তিন বিঘা ক্ষেতের ধান কারেন্ট পোকায় আক্রমণে পুরো ক্ষেতের ধান শুকনো খড়ের মত হয়ে গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নিজামপুর গ্রামের কৃষক রবিন জানান,তিনবার স্প্রে করার পরেও তার ক্ষেতে কারেন্ট পোকা দবানো যায়নি। দুই বিঘা ধান পুরোটাই কারেন্ট পোকা খেয়ে ফেলেছে।

একই উপজেলার নিজামপুর ইউপির দিঘি পাড়া কৃষক মনিরুল বদ্দৌপুর গ্রামের সজিব ও সিমলতলা গ্রামের পাতু নামের কৃষকেরা জানান,এবার সব চাইতে বেশি নাচোল উপজেলাতে কারেন্ট পোকা আক্রমন বেশি। এসব এলাকার প্রায় ৮০ ভাগ জমিতে কারেন্ট পোকার আক্রমন। এ পোকার কারণে কৃষকেরা ঘরে ধান তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে।

তানোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল জানান, প্রতি বছরই আমনে পোকা দমনে মাঠ পর্যায়ে কৃষদের সচেতন করতে নানা পদ্ধতি ও প্রচারণা চালনা হয়।

চলতি মৌসুমে ও ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে, এখনও চলছে। কিন্ত শেষ সময়ে এসে কিছু এলাকায় আমনে বাদামী গাছ ফড়িং/কারেন্ট পোকার আক্রমন দেখা দিয়েছে। যেসব ক্ষেতে এ পোকার আক্রমন দেখা দিয়েছে সেসব ক্ষেতে মাঠ পর্যায়ের পোকা দমনে কৃষকদের সাথে সার্বক্ষনিক কাজ করে হচ্ছে, সেটি যেন আরো বিস্তার করতে না পারে। তবে এখন পর্যন্ত সে ধরনের ক্ষতির দিকে যায়নি।

তিনি আরো জানান,বাদামী গাছ ফড়িং/কারেন্ট/ফুতকি পোকা হলো সব চেয়ে ভয়ঙ্কার। এ পোকা ক্ষেতে একবার প্রবেশ করলে, পুরো মাঠে ছড়ায় যেতে পারে। ধানের গোড়া কেটে দেয়। এতে ধানের মাথা সাদা হয়ে মরে যায়। ফলনও হয়না।

Leave a comment

উপরে