শহীদ মিনারে মুক্তিযোদ্ধা বাবার নাম রাখতে গিয়ে জেলে স্কুলশিক্ষক!

শহীদ মিনারে মুক্তিযোদ্ধা বাবার নাম রাখতে গিয়ে জেলে স্কুলশিক্ষক!

প্রকাশিত: 16-10-2019, সময়: 21:42 |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনারের উদ্বোধনী ফলকে মুক্তিযোদ্ধার নাম লেখার ইস্যু নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর ছেলে স্কুল শিক্ষক মাজেদুর রহমানকে পিটিয়ে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ। একই সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদকেও মারপিট করা হয়েছে। শিক্ষক মাজেদুরের বিরুদ্ধে ৫ম শ্রেনীর এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানীর অভিযোগ আনা হয়েছে পুঠিয়া থানায়। বুধবার দুপুরে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মাজেদুরকে আদালতে পাঠায় পুলিশ। এনিয়ে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় লোকজন ও স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, পুঠিয়ার রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা স্কুলে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করার উদ্যোগ নেন। এটির নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ। আগামী ১৬ ডিসেম্বর এটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। শহীদ মিনারটি নির্মাণে স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাড়াও স্থানীয় লোকজন আর্থিকভাবে সহায়তা দেন। ঐ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী ছিলেন এই শহীদ মিনারে আর্থিক সহায়তা প্রদানকারীদের অন্যতম। স্থানীয় সম্মানিত মানুষ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শহীদ মিনার নির্মাণ কাজের উদ্বোধনী ফলকে স্কুল কর্তৃপক্ষ রহমত আলীর নাম ব্যবহার করেন। এই নাম ফলক নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হন।

এনিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে টানাটানি শুরু হলে ঐ স্কুলের শিক্ষক এবং মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর ছেলে মাজেদুর রহমান সোমবার বিভিন্ন দফতরে যোগাযোগ করেন। শহীদ মিনারের ফলক থেকে তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর নাম যাতে ফেঙ্গে ফেলা না হয় সেজন্য তিনি জোর প্রচেষ্টা চালান। তিনি স্থানীয় শিক্ষা অফিসারের সাথেও এনিয়ে কথা বলেন।

তবে, পরদিন মঙ্গলবার শিক্ষক মাজেদুরের বিরুদ্ধে ৫ম শ্রেনীর এক ছাত্রীর শ্লিলতাহানীর অভিযোগ তোলেন স্থানীয় একটি অংশ। এনিয়ে রাত ১০টার দিকে ১০/১২ জন মিলে তাকে এলোপাতাড়ি মারপিট করে। পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। একই সময় তারা রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অবুল কালাম আজাদের বাড়িতে গিয়ে চড়াও হয়। প্রধান শিক্ষককে পেয়ে তাকেও এলোপাতাড়ি মারপিট করা হয়।

প্রধান শিক্ষক অবুল কালাম আজাদ জানান, শহীদ মিনারে মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর নামফলক নিয়ে একটা আপত্তি উঠেছিলো। আমাকে এই নাম ফলক নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানও আপত্তি জানান। এটি সরকারি কোন অর্থে হয়নি এবং মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর নাম কেন ব্যবহার করা হয়েছে সেটাও আমি তাকে জানাই। এবং বিষয়টি নিয়ে আমি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সাথেও যোগাযোগ করেছি।

তিনি আরও বলেন, ছাত্রী স্ত্রীলতাহানীর বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। স্কুলে অনেকেই একসাথে টিউশানি করে। স্কুল ছুটি আছে। এ অবস্থায় আমাকে হুসনে আরা বেগম নামে স্কুলের এক শিক্ষক শ্লীলতাহানীর বিষয়টি আমাকে অবগত করেন। মঙ্গলবার রাতে তাদের বাসায় বিষয়টি সমাধানের জন্য ছেলে ও মেয়ে পক্ষকে ডাকে। আমাকেও ডাকেন। সেখানে আলোচনা শেষে সবাই যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখন শুনি আমার বাড়িতে হামলা হচ্ছে। আমি সেখোনে যেতেই শুনতে পাই ওরা আমাকে মারার জন্য খুঁজছে। আমি বাড়িতে না ঢুকে পাশের একটি জমিতে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ওরা ১০/১২ জন সেখানে গিয়ে লাঠি দিয়ে মাথা, কোমর ও পায়ে মারপিট করে।

মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী দাবি করেছেন, শহীদ মিনারে আমার নাম থাকার ইস্যু নিয়েই ওরা মাজেদুরকে মারপিট করেছে। ও যাতে এ নিয়ে না এগোই এ জন্যই ওর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। প্রভাবশালীরা এটা করছে। তিনি দাবি করেন এক সাথে অনেকজন প্রাইভেট পড়ে সেখানে শ্লীলতাহানীর অভিযোগ করছে। এটা মিথ্যা।

পুঠিয়া থানার ওসি রেজাউল করিম বলেন, শিক্ষক মাজেদুর রহমানকে পিটিয়ে পুলিশে দেয় গ্রামবাসী। পরে থানায় মেয়ের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেন। সেই মামরায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

উপজেলা শিক্ষা অফিসার মীর মামুনুর রহমান বলেন, শহীদ মিনারে নাম ফলক নিয়ে বিরোধের বিষটি সম্পর্কে আমার জানা আছে। এ বিষয়ে আমি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবো বলেন জানান তিনি।

পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অলিউজ্জামান জানান, দুটি ঘটনা আমি শুনেছি। একটি হলো শহীদ মিনারের উদ্বোধনী ফলকে মুক্তিযোদ্ধার নাম ব্যবহার নিয়ে বিরোধ। আরেকটি এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানীর অভিযোগ। বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেয়ার জন্য পুলিশকে বলেছি। আর একটি ঘটনার সাথে আরেকটির যোগসূত্রতা আছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। এনিয়ে দুটি পক্ষের সাথে আমরা আগামী সোমবার বসবো। সেখানে এনিয়ে আলোচনা হবে।

উপরে