গোদাগাড়ীতে রাসেল ভাইপার সাপের আতঙ্কে কৃষক

গোদাগাড়ীতে রাসেল ভাইপার সাপের আতঙ্কে কৃষক

প্রকাশিত: 14-10-2019, সময়: 17:32 |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক, গোদাগাড়ী : রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম উপজেলা গোদাগাড়ী। গত দুইমাস হতে এই উপজেলায় বিষাক্ত সাপ রাসেল ভাইপার নামক সাপের আর্বিরভাব দেখা দিয়েছে। এই সাপের কামড়ে গোদাগাড়ী ইনিয়নের গোমা গ্রামে একজন মৃত্যু এবং তিনজন আহতের খবর পাওয়া গেছে। এই সাপের কামড়ের খবর এলাকায় জানাজানি হলে এই অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে একপ্রকার আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা ধান ক্ষেতের জমিতে পরিচর্যার কাজে যেতেও ভয় করছে।

গোদাগাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ রুহুল আমিন জানান,এই ইউনিয়নের রাসেল ভাইপার (চন্দ্রবোড়া) সাপ নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত ১২ অক্টোবার শিমলা গ্রামে জমিতে কাজ করতে গিয়ে একটি সাপ দেখতে পাওয়া যায়। পরে সাপটি মেরে ফেলা হয়। এর আগেও এই ইউনিয়নের কেশবপুর, সাহাপুকুর, পাহাড়পুর, ধনঞ্চয়পুর ও গোমা গ্রামে সাপ দেখতে পাওয়া গেছে। এছাড়াও চালনা, ভূষণা, রিশিকুল এলাকায় সাপ দেখথে পাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

গোদাগাড়ী ইউনিয়নে ৬ নং ওয়ার্ড সদস্য মোস্তফা হোসেন জানান, আমার খালাতো ভাই মোঃ মমিন (৩৫) গত ২২ সেপ্টেম্বর সকালে ধানের জমিতে ফাঁড়ি দিয়ে গিয়ে ডান পায়ের পাতায় রাসেল ভাইপার সাপের কামড় খেয়ে চেঁচামেচি করে। মাঠের লোকজন জানতে পেরে দ্রুত উদ্ধার করে। সাপের কামড় খাওয়ার সাথে সাথে শরীরে প্রচুর জ্বলন, ব্যাথা, ঘাম বের হতে থাকে। উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করানো হলে ভাল হবার লক্ষণ দেখা দেয়। কিন্তু হঠাৎ করেই চার দিন পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর শরীরে জ্বালা যন্ত্রণা করে মারা যায়।

পাশের গ্রাম হাঠৎ পাড়ায় প্রায় দুই মাস আগে আব্দুল মতিনের ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া তুহিন (১২) নামের এক শিশু রাসলে ভাইপার সাপের কামড়ে গুরুতর আহত হয়। তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করালে সুস্থ হয়ে বাসায় আছে। গত ২ সেপ্টম্বর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের নশিদানপুর গ্রামের কৃষক ফজল (৩০) জমিতে কাজ করতে গেলে এই সাপের কামড়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তাকেউ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫ দিন চিকিৎসা শেষে বাসায় নিয়ে আসে। মোহনপুর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের আরিফুল ইসলাম জানান আমার এক চাচা সাপের কামড়ে আহত হন তিনিও রাজশাহী মেডিকেল চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে বাসায় আছে তিনি কোনরমক বেঁচে আছে বলে জানান। ইউপি সদস্য মোস্তফা হোসেন জানান, ২০১৫ সালের দিকে গোমা এলাকায় আরেকজন কৃষক এই সাপের কামড়ে মারা যায়। তবে নাম বলতে পারেন নি।

কৃষকরা জানান, এই সাপের আতঙ্কে আমারা জমিতে সার, বিষ দিয়ে প্রচন্ড ভয় করছি। মাঠের জমির আইলে অথবা ভিতরে ঘামটি মেরে সাপ বসে থাকে। সুযোগ মতই কামড় দিচ্ছে। একান্ত কোন প্রয়োজন ছাড়া কৃষকরা জমিতে যাচ্ছেন না বলে জানাযায়। তবে কেউ কেউ সাপুড়ে দিয়ে সাপ ধরাচ্ছেন।

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোঃ মতিয়র রহমান জানান, মাঠে এই সাপরে আতঙ্কে কৃষকরা জমিতে নামতে ভয় করছে। তবে কৃষকদের ভয়ভীতি কাটাতে বা ধারেন পরিচর্যা ঠিক রাখতে কাম্বুট পড়ে জমিতে যেতে। এছাড়াও মোটা ফুলপ্যান্ড, এপ্রোণ, হাতে লাঠি নিয়ে জমিতে যেতে বলা হচ্ছে।

এই বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ইমরানুল হক জানান, রাসেল ভাইপার সাপের বিষয়টি আমার জানানেই। ১৫ অক্টোবর মিটিং আছে বিষয়টি নিয়ে আমি আলোচনা করবো বলে জানান।

গোদাগাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার মোঃ মেসবাউল ইসলাম খান জানান, রাসেল ভাইপারে আক্রান্ত কোন রোগী আমার এখানে আসে নি। তবে এই সাপে কামড় দিলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থ্যা আছে। সেখানেএন্টি ভেনোম ইনজেকশন রাজশাহী মেডেকেল সাপ্লাই আছে। তা দিয়ে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। তিনি আরো জানান, এই সাপের কামড়ের ফলে ব্রেণের উপর আঘাত করে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায়। এই রোগের ইনজেকশনের প্রতিটি দাম আড়াই হাজার টাকা। সাপে কামড় দিলে তাৎক্ষণিক কামড়েরর উপরের স্থান শক্ত করে বাঁধা ও কামড়ের জায়গাটি পরিষ্কার করার পরামর্শ প্রদান করেন।

রাসেল ভাইপার সাপের পরিচিতিঃ
বৈজ্ঞানিক নাম: (Daboia russelii) ভাইপারিডি পরিবারভুক্ত একটি অন্যতম বিষধর সাপ। এই সাপ সবচেয়ে বিষাক্ত না হলেও এর অসহিষ্ণু ব্যবহার ও লম্বা বহর্গামী (ঝড়ষবহড়মষুঢ়যড়ঁং) বিষদাঁতের জন্য অনেক বেশি লোক দংশিত হন। বিষক্রিয়ায় রক্ত জমা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অত্যধিক রক্তক্ষরণে অনেক দীর্ঘ যন্ত্রণার পর মৃত্য হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্র ভয়ে হার্ট অ্যাটাক মৃত্যুর কারণ। চন্দ্রবোড়া বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক সাপ। এটি সব বিভাগে সচরাচর এবং ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে এ সাপ বেশি পাওয়া যায়। রাসেল ভাইপার বাংলাদেশে মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে। অন্যান্য সাপ মানুষকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও এ সাপটি স্বভাব ঠিক তার উল্টো। তাই প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ কেবল এ সাপটির কামড়েই প্রাণ হারান। আক্রমণের ক্ষিপ্র গতি ও বিষের তীব্রতার কারণে ‘কিলিংমেশিন’ হিসেবে বদনাম রয়েছে সাপটির।[৮] নদীয়া জেলাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে এছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, চীনের দক্ষিণাংশ, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, বার্মা ও ইন্দোনেশিয়ায় পাওয়া যায়।[২] এরা সাধারণত ডিম পাড়ে এবং ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। তবে চন্দ্রবোড়া সাপ ডিম পাড়ার পরিবর্তে সরাসরি বাচ্চা দেয়। এরা বছরের যে কোনো সময় প্রজনন করে। একটি স্ত্রী সাপ গর্ভধারণ শেষে ২০ থেকে ৪০টি বাচ্চা দেয়। তবে কোনো কোনো চন্দ্রবোড়া সাপের ৭৫টি পর্যন্ত বাচ্চা দেয়ার রেকর্ড আছে।

উপরে