নানা সমস্যার ঘরে ওরা আশার আলো

নানা সমস্যার ঘরে ওরা আশার আলো

প্রকাশিত: ০৬-১০-২০১৯, সময়: ১৮:৩৭ |
Share This

সরকার দুলাল মাহবুব : প্রকট আবাসন, স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ নানা সংকট আর অবহেলায় মধ্যেই বসবাস রাজশাহীর হেতমখা হরিজন পল্লী মানুষদের। এখনো খুপরি ঘরের ঘিঞ্জি পরিবেশেই বেড়ে উঠে বেছে নিতে হচ্ছে বাপ-দাদার পেশা। দিন বদলে গেলেও এসব মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে এই পল্লীকে ঘিরেই। তবে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে স্কুলে যাচ্ছে হরিজন পল্লীর শিশুরা।

হরিজন পল্লীর মানুষদের আবাসন সংকটই বড় সমস্যা। এই আবাসন সংকটই লেখাপড়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে। বংশ পরম্পরায় পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি আবাসন। একই ঘরে দাদা-দাদি, পিতা-মাতা, ভাই-ভাবি ও ভাইবোনকে নিয়ে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। এমন অমানবিক ও সংকট পরিস্থিতি নিয়েই জীবন যাপন করতে হয় হরিজনদের। আবার বেড়েছে বেকারত্ব।

ইংরেজিতে সুইপার, বাংলায় ঝাড়ুদার। আবার কেউ বলেন হরিজন। শহর কিংবা গ্রামে পেশা হিসেবে আবর্জনা পরিষ্কার ও মলমূত্র নিষ্কাশনের কাজে নিয়োজিতদেরই ‘হরিজন’ বলা হয়ে থাকে। বর্তমান সরকার তাদের অনগ্রসর দলিত সম্প্রদায়ে অধিভুক্ত করেছে। কালের বিবর্তনে কেবল নাম ও পরিচয়েরই হেরফের হয়েছে তাদের। কিন্তু মানুষ হয়ে জন্ম নিলেও আজও পাইনি মর্যাদা।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজশাহী শহরের ঠিক মাঝখানেই হেতমখাঁ এলাকা। সেখানে রয়েছে হরিজন পল্লি। যেখানে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ১১নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় বিশ বিঘা জমির ওপর স্বাধীনতার আগেই গড়ে ওঠে এই হরিজন পল্লি। মহানগরীর এই হরিজন পল্লিতে সরজমিনে গেলে চোখের সামনে ফুটে ওঠে তাদের যাপিত জীবনের করুণ চিত্র।

হরিজন সম্প্রদায় আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। আমাদের সমাজের অনেক নিচু মানের কাজ মূলত এই সম্প্রদায়ের লোকেরা করে থাকে। কিন্তু চরম অবহেলিত এই সম্প্রদায়। বর্তমানে আবাসন সংকটের কারণে মানবেতর জীবন-যাপন করছে রাজশাহীর হরিজন পল্লীর বাসিন্দারা। জনসংখ্যা বাড়লেও এখানকার হরিজন সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের জন্য গত ৫০ বছরে নতুন করে একটি ঘর কিংবা এক ইঞ্চি জমিও বাড়েনি। বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিন ধরে এক একেকটি কক্ষে পরিবারের ছয়-সাতজন সদস্য নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করছে তাঁরা।

হরিজন কলোনীর বাসিন্দা চন্দন বাবু বলেন, ‘আমার নানীর মা দুইটি থাকার (শয়নকক্ষ) ও একটি রান্নাঘর পেয়েছিল। নানী মা মারা যাওয়ার পর ওই ঘরে আমার পিতা-মাতাসহ আমরা বসবাস করি। আমি স্ত্রী নিয়ে ওই ঘরের মধ্যেই উঠি। বর্তমানে আমার তিনটি মেয়ে ও মেয়ে জামাই, ছেলে ও ছেলের বৌ নিয়ে এখানেই বাস করছি। ওই দুই ঘর ও বারান্দায় আটটি কবর ঘরের মধ্যে ৪-৫ জন গাদাগাদি করে আমাদের থাকতে হয়। বিবাহ উপযুক্ত মেয়েকেও নিয়ে এক ঘরে থাকতে হয়। কতোটা অসহায় হলে এভাবে থাকতে হয় মানুষকে। এই সমস্যা আমাদের প্রতিটি পরিবারই। ঘরের মধ্যে নেই পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থাও। তাই শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষা বলে কোনো কথা নেই। অন্ধকারাচ্ছন্ন ছোট্ট ঘরের মধ্যে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ বিরাজ করে বছরের পুরো সময়জুড়েই। তবে শিশুদের পড়াশুনার প্রবল আগ্রহ থাকায় এরমধ্যেও অনেকে স্কুলে যাচ্ছে, পড়াশুনা করছে’।

পড়াশোনার পরিবেশ নেই ঘরে, তারপরেও লেখাপড়ায় আগ্রহী পল্লীর শিশুরা। এরই মধ্যে প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার সিঁড়ি ছুয়েছে এ পল্লীর শিশুরা। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়েও পড়ছে কয়েকজন। আর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে পড়ছে অনেকে। আগে খুব বেশী হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশানার সুযোগ পেত তারা। তবে এখন প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়েছে অনেকে। শনিবার রাজশাহী নগরীর হেতমখা হরিজন পল্লীতে সরেজমিন গিয়ে এখানকার বাসিন্দা, বিদ্যালয়গামী শিশু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

শহরের নোংরা আবর্জনা পরিস্কার তাদের মুল পেশা। অনেকে মেথর বলেন তাদের। স্থায়ী চাকরির সুযোগ নেই। কেউ সিটি করপোরেশনে ঝাড়ুদার, কেউ বাসা-বাড়ি ও বিভিন্ন অফিসের পরিচ্ছন্নতার কাজে লিপ্ত। মাস্টাররোলেই আটকে থাকে তাদের জীবন। স্থায়ীভাবে চাকরির সুযোগও নেই।

এরপরেও এখন এ পল্লীর শিশুরা আয়ত্ব করছে পড়ালেখা। স্কুলমুখি হয়েছে তারা। এটায় এখন আশার কথা। যেন আধার ঘরে বসে শিক্ষার আলো ছোয়ার চেষ্টা তাদের। এখানে দেখা হয় ক্ষুদে শিক্ষার্থী খুশি, চৈতী, সৌরভ, ঝিনুক, পুজা, পুনম, প্রাকৃতি ও সুবর্ণার সাথে। তারা সবায় স্কুলে যায়।

এ পল্লীর কিশোরী তানিয়া রানী তানিয়া শত প্রতিকুলতার মাঝেও প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে এখন পড়াশোনা করেছে রাজশাহী নগরীর শহীদ কামারুজ্জামান সরকারি কলেজের ডিগ্রীতে (পাশকোর্স)। তার দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন রাজশাহী বিদ্যালয়ে, একজন আছেন এবি ব্যাংকে মাস্টাররোলে কর্মচারি। তাদের বাবা রামেশ^র অন্য হরিজন বাসিন্দাদের মতোই কাজ করেন।

এছাড়াও নগরীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের কাছে আরেক পল্লীতে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে কথা হয় কিশোরী শ্রীমতী শান্তনা রানীর সঙ্গে। ১৬-১৭ বছরের শান্তনা শত প্রতিকুলতার মাঝেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাশ করেছে। এখন পড়াশোনা করছে নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা ডিগ্রী কলেজে। শুধু শান্তনা নয়, এসব পল্লীর সব ঘরের শিশুরা এখনও ঘিঞ্জি পরিবেশে বেড়ে উঠে স্কুলে যাচ্ছে।

হরিজন পল্লীতে গড়ে উঠা ‘হরিজন বিজয় বয়েজ ক্লাবে’র মাধ্যমে নিজেদের সমস্যার সমাধান করা হয়। হরিজন পল্লীর বিজয় বয়েজ ক্লাবের সভাপতি হরিলাল বাবু জানান, প্রায় তিনশ’ পরিবারে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ গাদাগাদি করে থাকে এই পল্লিতে। ঘুপচির মধ্যে তৈরি করা একটি ঘরের মধ্যে কেবল কাপড় বা চাদর টানিয়ে আরও তিন থেকে চারটি ঘর তৈরি করা হয়েছে। যেনো স্ত্রী, ছেলে সন্তান নিয়ে কোনোভাবে মাথা গোঁজা যায়। এই পল্লীর প্রায় ৬০-৬৫ জন নারী-পুরুষ চাকরি করে। তিনি আরো বলেন, আমরা কেবল সরকারি বরাদ্দের কথা শুনি। কিন্তু কখনও চোখে দেখি না। তাই বরাবরই তারা সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

বাসিন্দারা জানান, এখন এখানকার মানুষের কাজের কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। তাই সেখানকার সবচেয়ে বড় সমস্য এখন বেকারত্ব। অনেক লড়াই সংগ্রাম করে এখানকার ছেলে-মেয়েরা প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পার হয়।

আর পরিচয় গোপন করে পা বাড়াতে হয় মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দিকে। কারণ পরিচয় গোপন না করলে একই গ্লাসে পানি পান করা তো দূরের কথা শ্রেণিকক্ষে পাশে বসতে পর্যন্ত দেওয়া হয় না তাদের। এরপরও কোনোভাবে শিক্ষিত হলেও তারা হরিজন বলে চাকরি পান না বলে অভিযোগ রয়েছে তাদের।

একদিকে অনেকটা পরিচয় গোপন করে পল্লীর ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত হতে হয় এবং অন্যদিকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কর্মীর চাকরির বেলায় পরিচয় গোপন করে মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মীয় মানুষরা চাকরি পান। এতে শিক্ষা ক্ষেত্রে এই পল্লীর ছেলে মেয়েরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এছাড়াও জাত-পাতের বিভাজন আর সমাজে প্রচলিত জাতিভেদ প্রথার কারণেই তারা সবার থেকে আলাদা হয়ে গেছেন।

তারা আরো জানান, দেশের অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় হরিজনদের কোনো বিদ্যুৎ বিল দেওয়া লাগে না। অথচ আমাদের দিতে হয়। একটি প্রাথমিক স্কুল আছে। কিন্তু আজও তার কোনো উন্নয়ন হয়নি। একটি ছোট্ট মন্দির রয়েছে। সেখানেও কোনো অনুদান পাওয়া যায় না। তবে পুজা উদযাপনে এবারে ৫শ’ কেজি ও ১০ হাজার টাকা অনুদান পাওয়া গেছে।

ইতিমধ্যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের কাজ শুরু করেছেন মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। জানা গেছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে শুরু হতে যাচ্ছে বস্তি ও হরিজন পল্লী উন্নয়নের কাজ। এর মধ্যে নগরীর তিনটি বস্তির জন্য ২০ লাখ টাকা করে ৬০ লাখ এবং হরিজন পল্লীর উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৬০ লাখ টাকা ।

সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর রবিউল ইসলাম তজু বলেন, বেকার সমস্যা পুরো দেশজুড়েই। তবে তাদের আবাসন সমস্যা খুবই অমানবিক। এরআগে নরওয়ের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের পুনর্বাসনের কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু রাসিক মেয়র পবিবর্তনের জন্য যোগাযোগের অভাবে সেটি ভেস্তে গেছে। আবারো চেষ্টা করা হচ্ছে এবং রাসিকের কাছে তাদের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, নগরীর বস্তি ও হরিজন পল্লীর উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিলো। ইতোমধ্যে উন্নয়ন কাজের প্রায় বেশির ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। ফ্ল্যাট করে দেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, মেয়র আশ্বাস দিয়েছেন এটি সঠিক। হরিজন পল্লী নিয়ে মেয়রের একটি আলাদা পরিকল্পনা আছে।

Leave a comment

উপরে