মাল্টা চাষে বরেন্দ্রঞ্চলে উজ্জ্বল সম্ভাবনা

মাল্টা চাষে বরেন্দ্রঞ্চলে উজ্জ্বল সম্ভাবনা

প্রকাশিত: ১৯-০৯-২০১৯, সময়: ১৬:১৭ |
Share This

আব্দুল বাতেন, গোদাগাড়ী : রাজশাহীর বরেন্দ্রঞ্চলে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সুস্বাদু ফল মাল্টা। বাণিজ্যিক ভাবে মাল্টা চাষে লাভজনক হওয়ায় এটি আগামি দিনে উজ্জ্বল সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। দিন যতই যাচ্ছে ততই এই অঞ্চলে মাল্টা চাষ বেড়েই চলেছে। সুস্বাদু ফল মাল্টা বিদেশী ফল হিসেবে পরিচিত হলেও দেশে আবাদ হওয়াতে বেড়ে চলেছে দেশের রাজস্ব।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারী মাসে রাজশাহী জেলায় ৪২ হেক্টর জমিতে মাল্টার চাষ হয়েছে। অল্প কিছু দিনের ব্যবধানে রাজশাহী জেলায় মাল্টর চাষ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।

মাল্টা চাষের দিক দিয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা বেশ এগিয়ে রয়েছে। গোদাগাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মতিয়র রহমান জানান, গোদাগাড়ী উপজেলায় মাল্টা চাষের ব্যাপক সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। এই অঞ্চলের চাষিরা মাল্টা বারি-১ চাষ করে সফলতা পেয়ে স্বাবলম্বি হচ্ছে, ফলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এর চাষ দিনের দিন বেড়েই চলেছে। গোদাগাড়ী উপজেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৯৩ হেক্টর জমিতে মালটার চাষ হয়েছে। মাল্টা চাষে সরকারী ভাবে রাজস্বখাত হতে সহযোগিতায় ও ব্যক্তিগত উদ্যেগে চাষ হয়েছে।

গোদাগাড়ী উপজেলার পিরিজপুর এলাকার মালটা চাষী শুরুজ জামান জানান, শখের বসে দেড় বিঘা জমিতে প্রাথমিক ভাবে মাল্টা চাষ শুরু করি। গাছ লাগানোর প্রথম বছরেই ফল আসতে শুরু করে। তবে প্রথম বছর ফল সংগ্রহ করেন নি। দ্বিতীয় বছর প্রচুর পরিমাণে ফল আসে। গোদাগাড়ী কৃষি অফিসের সহযোগিতায় রাজস্ব খাত হতে আরো কিছু গাছ পেলে তার বাগানের পরিমাণ বেড়ে যায়।

তিনি জানান, দেড় বিঘা জমিতে ১০ ফিট দূরত্ব বজায় রেখে ২১৭ টি মাল্টা গাছ লাগাই । লেবার খরচ, বাগানে বেড়া দেওয়া ও বছরে ৩-৪ বার সার দেওয়া সহ মোট ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি এই বছরের আগষ্টের শেষের দিকে রাজশাহী শহরের এক ব্যবসায়ীর নিকট ৩০ হাজার টাকা চুক্তিকে বাগানটি বিক্রয় করে দেন।

এতে তার বাগানের সকল খরচের টাকা উঠে গেছে বলে জানান। তিনি আশা করেন আগামি বছর হতে বাগানের গাছে ফল দ্বিগুণ হতে এবং প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকার মাল্টা বিক্রয় করবে বলে জানান। তিনি আগামি দিনে আরো মাল্টা চাষ বাড়াবেন বলেও জানান।

গোদাগাড়ীর শুধু সুরুজ জামান নয় এমনি ভাবে উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নে নাসিরুল, বাসুদেব পুর ইউনিয়নের ফারুক আহম্মেদসহ উপজেলার প্রায় অর্ধশতাধিক কৃষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করে নিজেরা স্ববলম্বি হওয়ার মুখ দেখছেন।

মাল্টা চাষি কৃষক ফারুক আহম্মেদ জানান, আমি দীর্ঘদিন হতে সৌদিতে থাকি। দেশে এসে মাল্টা চাষের জন্য কাজী পাড়ায় জায়গা নিয়ে চাষ শুরু করলে ব্যবসায় সফলতা আসে। ফলে আস্তে আস্তে প্রায় ৩০-৩২ বিঘা জমিতে চাষ করছি। তিন বছরে বাগান করতে ৮৫-৯০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে । প্রতিটি মাল্টা গাছে ৬০-৭০ টি মাল্টা ফল আসছে। আগামি বছরে তিনি প্রায় চার হতে সাড়ে চার লাখ টাকার মাল্টা বিক্রয় করতে বলে জানান।

আরেক মাল্টা চাষী আলহাজ্ব রেজুয়ান। ডিগ্রী লেখাপড়া শেষে চাকুরীর পেছনে ছুটে চাকুরী না পেলে ৮ বিঘা জমিতে চাঁপাই নবাবগঞ্চ হার্টি কালচার আফিস হতে পরামর্শ নিয়ে মাল্টা চাষ শুরু করি। তার মোট ৫০০ টি মালটার গাছ আছে এছাড়াও পাশাপাশি পেয়ারাসহ অন্যান্য গাছ আছে। বাগান করতে মোট ৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে । তিনি এবছর ৭০-৮০ মন মাল্টা ৭০ টাকা কেজি দরে পাইকারী ভাবে ঢাকাতে বিক্রয় করেছে। এতে তিনি সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা মত ক্যাশ পেয়েছেন।

তবে তিনি মাল্টার দাম নিয়ে শঙ্কিত। তিনি দাবি করেন বিদেশী মাল্টা বাজারে দুইশ হতে আড়াইশো টাকা বিক্রয় হচ্ছে। আর আমাদের দেশের মাল্টা পাইকারি ৭০ টাকা কেজি বিক্রয় করাতে নায্য মূলতে হতে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। বরেন্দ্রঞ্চলের আগামি দিনের উজ্জ্বল সম্ভবনাকে টিকাতে মাল্টার বাজার তদারকির জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।

কৃষকদের মতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই জেলায় উৎপাদিত মাল্টা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে বলে আশা করছেন চাষিরা। ইতিমধ্যে মাল্টা আমদানিকারক আড়ৎদাররা দেশীয় মাল্টা কিনতে চাষিদের সঙ্গে যোগযোগ করছেন।

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান, গোদাগাড়ী উপজেলায় মাল্টা চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গোদাগাড়ী কৃষি অফিস হতে চাষীদের সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়াও কৃষি প্রদর্শনী রাজস্ব খাত হতে মালটা চাষে সহযোগিতা করা হয়েছে। এই অঞ্চলের মালটা চাষে আগমি দিনে উজ্জ্বল সম্ভাবনা দিখে দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ শামসুল হক জানান, রাজশাহী জেলাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের চাঁপাই নবাবগঞ্চ, নওগাঁ , নাটোর, দিনাজপুর সহ অন্যান জেলায় মালটা চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। দেশের বাজারের অর্থনীতিতে ভালো ভূমিকা রাখছে।

আগামি দিনে এই অঞ্চলের মালটার ফলন দেশের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে বলে জানান। তিনি আরো জানান, মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেয়ায় চাষিরা মাল্টা চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। সেই সঙ্গে ফলন ভালো হওয়ায় চাষিরা লাভবান হবে।

Leave a comment

উপরে