এমপি বাদশার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ

এমপি বাদশার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ

প্রকাশিত: ০৯-০৯-২০১৯, সময়: ১৪:২০ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগের শরীক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ও ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয় কমিটিতে অভিযোগ উঠেছে। বাদশা নৌকার টিকিট নিয়ে রাজশাহী-২ (সদর) আসনের তিনবারের এমপি। রাজশাহীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন আসনের এই এমপির আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো ও দু-একজন নেতাকে ম্যানেজ করে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ সৃস্টিসহ একাধিক অভিযোগ তোলা হয়েছে এমপি বাদশার রিরুদ্ধে।

রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী এমপি বাদশার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলেছেন। মৌখিকভাবে তিনি বাদশার কর্মকান্ড নিয়ে মৌখিকভাবে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডে জানালেও এ সপ্তাহে লিখিত অভিযোগ দেবেন ফারুক চৌধুরী। এছাড়াও মিথ্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়ে ইতোমধ্যেই বাদশাকে একটি আইনি নোটিশও পাঠিয়েছেন তিনি।

ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, এমপি বাদশার কর্মকান্ড সম্পর্কে ইতোমধ্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয় কমিটির নেতারা অবহিত হয়েছেন। মৌখিকভাবে তাদের জানানো হয়েছে। এ সপ্তাহের মধ্যেই লিখিত অভিযোগ দেয়া হবে।

ওমর ফারুক চৌধুরীকে নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশ্যে ফজলে হোসেন বাদশার এক ‘অযাচিত, অনভিপ্রেত’ মন্তব্যের জের ধরে রাজশাহী আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে তোলপাড়া শুরু হয়। এতে বাদশার উপর ক্ষুদ্ধ হন রাজশাহী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ওই বক্ত্যের প্রতিবাদ জানিয়ে ফারুক চৌধুরী বাদশাকে আইনি নোটিশও পাঠায়। ফারুক চৌধুরীর পক্ষে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন রাজশাহী জজ কোর্টের এডভোকেট মোহা. এজাজুল হক মানু। তবে এখনো তিনি লিগ্যাল নোটিশের জবাব দেননি বলে জানান এই আইনজীবী।

ফারুক চৌধুরী বলেন, বাদশার মন্তব্য অত্যন্ত মানহানিকর। তার মতো একজন দায়িত্বশীল মানুষের কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য অনভিপ্রেত। এই অযাচিত মন্তব্য নিশ্চয় স্বাধীনতাবিরোধীদের স্বার্থে। তিনি সেই মন্তব্য করেই থেমে যাননি। একাধিক ফোরামে বিভিন্ন জনকে নিয়ে সেই মিথ্যাচারকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

তিনি বলেন, বাদশার মন্তব্যের প্রতিবাদে সম্প্রতি জেলা আওয়ামী লীগের জরুরী হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফজলে হোসেন বাদশার বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ১৪ দলের সমন্বয় কমিটিতে অভিযোগ লিখিত অভিযোগ দেয়া হবে। এর আগেই মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বাদশার পক্ষাবলম্বন করায় রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের বিরুদ্ধেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে ওই সভায়।

বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে টানা তৃতীয়বার রাজশাহী সদর আসন থেকে সাংসদ হয়েছেন। এই আসন রাজশাহীর সবচেয়ে গুরুত্বর্পূর্ণ হওয়ায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বাদশার প্রতি ক্ষুব্ধ।

অন্যদিকে, ফারুক চৌধুরী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও টানা তিনবারের সাংসদ। তিনি জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের বোনের ছেলে। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্প প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।

গত ১৯ আগস্ট ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘খুনি ফারুক-রশিদের শিষ্যরা এখন কেউ এমপি, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ মানবাধিকারকর্মী, কেউ অন্য দলের নেতা’। এতে ফজলে হোসেন বাদশার বক্তব্যে বলা হয়, ‘তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাবস্থায় ফারুক চৌধুরীও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ওই সময় ফারুক চৌধুরী প্রথমে ফ্রিডম পার্টি, পরে ছাত্রদল করে রাকসু নির্বাচনে অংশ নেন। ফ্রিডম পার্টির মিছিলে সামনের সারিতে থাকতেন ফারুক চৌধুরী। ওই সময় ফ্রিডম পার্টির মিছিলে কয়েকবার লাঠি নিয়ে ধাওয়া করেছিলেন বাদশা। তিনি ফারুক চৌধুরীকেও ধাওয়া করেছেন।’

বাদশার এই মন্তব্যে রাজশাহীতে তোলপাড় শুরু হয়। অনেক রাজনীতিবিদই এ মন্তব্যে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। রাকসুর সাবেক ভিপি ও কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা রাগিব আহসান মুন্না বলেন, ফারুক চৌধুরী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন তখন ফ্রিডম পার্টির জন্মই হয়নি। বাদশার এই মন্তব্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর পিছনে তার রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি থাকতে পারে।

ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, আমার ফ্রিডম পার্টি বা ছাত্রদল করার তথ্য সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বাবা আজিজুল হক চৌধুরী ও চাচা মকবুল হক চৌধুরীকে তুলে নিয়ে বাবলা বনে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। আমার মামা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আমার মামাকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় হত্যা করা হয়। আমরা বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। মূলত, আমি ব্যবসায়ী ছিলাম। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হই। আমি ১৯৮২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে চলে আসি। ফলে ফ্রিডম পার্টির সঙ্গে আমার যুক্ত থাকার সুযোগ কই?

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ ফ্রিডম পার্টি বাংলাদেশের নিবন্ধিত একটি রাজনৈতিক দল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার হাতে হত্যার শিকার হন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা লে. কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ, কর্নেল সাঈদ ফারুক রহমান ও মেজর বজলুল হুদা পরবর্তীতে আশির দশকে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে বাদশার অভিযোগ মনগড়া বলে মনে করেন রাজশাহীর প্রবীণ রাজনীতিকরা।

ফারুক চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছায় ২০০০ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে একবার প্রতিমন্ত্রী এবং তিনবার সাংসদ নির্বাচিত হই। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হই। ফজলে হোসেন বাদশা, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার একজোট হয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে ইমেজ নষ্ট করছেন।

তিনি বলেন, ফজলে হোসেন বাদশা নানান অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি রাজশাহী বার্তা নামে একটি পত্রিকার লিজ নেয়া ভবন দখল করে পার্টি অফিস চালাচ্ছেন। তাকে নিয়ে মহাজোটে নানা টানাপড়েন আছে। এ নিয়ে একাধিক পত্রিকা সংবাদও প্রকাশ করেছিল। তিনি জনগণের করের টাকায় কেনা গাড়িতে চড়েন। আবার সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের কথা বলেন। আওয়ামী লীগের নৌকায় এমপি হয়েছেন। আবার তিনি আওয়ামী লীগকেই লুটেরাদের দল বলেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটান।

ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, আমি শুনেছি এবং আওয়ামী লীগের প্রবীন নেতারা আমাকে বলেছেন, ৭৫ এর ১৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাজশাহীতে বাদশার নেতৃত্বে আনন্দ মিছিল বের হয়েছিল। এছাড়াও স্বাধীনতার ৪০ বছর পর এমপি হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সনদ নিয়েছেন।

বাদশা কোথায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এ প্রশ্ন রেখে ফারুক চৌধুরী বলেন, সরকার সন্দেহভাজন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা করেছেন। যারা মুক্তিযুদ্ধ না করেই মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়েছেন। আমি শুনেছি, রাজশাহীর সন্দেহভাজন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় বাদশার নাম এক নম্বরে রয়েছে। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে এ তালিকা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এসব বিষয়ে জানতে সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ প্রতিবেদনে তার মন্তব্য দেয়া সম্ভাব হয়নি।

তবে এর আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য পাঠিয়েছেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ‘ফারুক চৌধুরী ফ্রিডম পার্টি করতেন, এটা সবাই জানেন। মামলা করলে হাজার হাজার সাক্ষী দেয়া যাবে। বিএনপি নেতা কবির হোসেনের বাহিনীতেও ছিলেন ফারুক। ফলে সেই বক্তব্যের জন্য আমি অনুতপ্ত নই। আমি যা বলেছি, সত্য বলেছি।

Leave a comment

উপরে