রাজশাহীতে লিচুর পোকা নিয়ন্ত্রণে সফলতা

রাজশাহীতে লিচুর পোকা নিয়ন্ত্রণে সফলতা

প্রকাশিত: ০২-০৬-২০১৯, সময়: ১৫:২৬ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : লিচুর ফল ছিদ্রকারী পোকা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্র। সেখানকার বিজ্ঞানী ড. জিএম মোরশেদুল বারী ডলার কোনো ধরণের রাসায়নিক কীটনাশক ছাড়াই নিরাপদ লিচু উৎপাদন করে দেখিয়েছেন। দুই বছরের গবেষণা শেষে তার এই প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে চাষি পর্যায়েও পৌঁছেছে।

ড. মোরশেদুল বারী বলছেন, লিচু গাছে এক ধরণের ছোট ছোট পোকা থাকে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Conopomorpha sinensis এর শুটকীট-বাদামী সবুজাভ। আর পূর্নাঙ্গ স্ত্রী কীট হলুদ। বোম্বাই জাতের লিচুতে এ পোকার আক্রমণ বেশি হয়। লিচুর প্রধান শত্রু এই পোকার আক্রমণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে বাগান মালিক ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই এই পোকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। দুই বছরের গবেষণা শেষে তিনি সফলও হয়েছেন।

বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি বলেন, লিচুর ফল মটরদানা আকারের হবার পর গাছ পুরোটাই ‘নেটিং’ করে দিতে হবে। এতে বাইরে থেকে ক্ষতিকর পোকা-মাকড় প্রবেশ করতে পারবে না। এর আগে গাছে নিমের তেল বা নিমের বীজ সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে সেই পানি গাছে স্প্রে করতে হবে। ফল সংগ্রহের আগের ২০ দিনে কোনভাবেই কীটনাশক প্রয়োগ করা যাবে না। ওই সময় জৈব বালাইনাশক স্পিনোসেড ১০ দিন পরপর দুই দফা প্রয়োগ করতে হবে। এর আগে ইমিডাক্লোরোপিড প্রয়োগ করা যেতে পারে। এতেই শতভাগ নিয়ন্ত্রনে আসবে ফল ছিদ্রকারী পোকা।

এই পদ্ধতির বাইরে কেবল নেটিং করেও এই পোকা প্রতিরোধ সম্ভব। এই পদ্ধতিও ছিলো এই গবেষণায়। তবে কেবল নেটিংয়ে সফলতার হার কিছুটা কম। তাছাড়া বিরুপ আবহাওয়ায় আক্রমণ ঘটতে পারে এনথ্রাকনোজ। এ ক্ষেত্রে মুকুল ফোটার আগে এবং ফল পুষ্ট হবার সময় ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। নেট খুলে ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পর আবারো নেটিং করে দিতে হবে।

বিজ্ঞানী ড. মোরশেদুল বারী জানান, ফলের বাড়ন্ত অবস্থায় পূর্ণ বয়স্ক পোকা বোঁটার কাছে খোসার নীচে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে কীট বের হয়ে বোঁটার নিকট ফলের শাশ ও বীজ খেতে থাকে। বোঁটার নিকট করাতের গুড়ার মত পোকার মল জমে, স্থানটি কলো হয়। এরপর ফলের গুটি পচে যায়, অপরিপক্ক ও পরিপক্ক ফল ঝড়ে যায়। ফেব্রুয়ারী-মে মাসে গরম পড়ার সাথে সাথে এই পোকার আক্রমণ দেখা যায়। ডিম থেকে বেরিয়ে লার্ভা গাছের নরম ও কচি অংশে ছিদ্র করে। আক্রান্ত ডগা ফ্যাকাসে ও ঢলে পড়া ভাব দেখায় এবং ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরে যায়। আর বড় পোকা লিচু ছিদ্র করে দেয়। কিন্তু তার প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এ পোকার আক্রমণ হবে না বললেই চলে।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার অনুপমপুর গ্রামের চাষি সোহেল রানার লিচু বাগানে এ বছর এই প্রযুক্তির পরীক্ষামুলক প্রয়োগ করেছে ফল গবেষণা কেন্দ্র। গত বুধবার সোহেল রানার এই বাগান ঘুরে এসেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কীটতত্ত্ব বিভাগের একদল বিজ্ঞানী। তারা ‘জৈব বালাইনাশক ভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে লিচুর ক্ষতিকর পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি মাঠ দিবসও করেন সেখানে। ফলে এই প্রযুক্তির সাথে পরিচয় ঘটে স্থানীয় লিচু চাষিদের।

প্রদর্শনী লিচু বাগানের মালিক সোহেল রানা বলেন, তার দুই বিঘা আয়তনের বাগানে চায়না-৩, বারি লিচু- ১ ও বোম্বাই জাতের ১৩টি লিচু গাছ আছে। এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার পিছু ছাড়েনি। তারপও দুই ধাপে লিচু বিক্রি করেছেন ৫০ হাজার টাকার। আরো ২০ হাজার টাকার লিচু বিক্রি হবে। গত বছর এর অর্ধেকও দাম পাননি। জৈব বালাই ব্যবস্থাপনা তাকে লাভের মুখ দেখিয়েছে।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলীম উদ্দীন বলেন, কৃষকরা না জেনে ইচ্ছেমত লিচু বাগানে কীটনাশক প্রয়োগ করেন। লিচুর বাইরের আবরন পাতলা হওয়ায় এতে বিষক্রিয়া রয়েই যায়। এটি অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে লিচুতে কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন পড়বে না। নিরাপদ ফল উৎপাদন করলে চাষিরা বাজারে ভালো দামও পাবেন। তাই ড. জিএম মোরশেদুল বারী ডলারের প্রযুক্তি এখন চাষি পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।

উপরে