অবশেষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পুঠিয়ার সেই এসআইয়ের বিরুদ্ধে

অবশেষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পুঠিয়ার সেই এসআইয়ের বিরুদ্ধে

প্রকাশিত: ১৪-০১-২০১৯, সময়: ১৮:২২ |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : অবশেষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে নানা অপকর্মের হোতা রাজশাহীর পুঠিয়া থানার এসআই তৌফিক পারভেজের বিরুদ্ধে। তাকে শাস্তিমূলক তিন মাসের জন্য জঙ্গল প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তর। সোমবার তিনি এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন পুঠিয়া থানার ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘‘এসআই তৌফিক পারভেজকে রাঙ্গামাটিতে জঙ্গল প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের সদর দপ্তর থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি তার কাছে এসেছে। মঙ্গলবার তিনি রাঙ্গামাটিতে পুলিশের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগদান করবেন।’’

জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার আব্দুর রাজ্জাক খান বলেন, এসআই তৌফিক পারভেজকে জঙ্গল প্রশিক্ষণের জন্য রাঙ্গামাটি পুলিশ প্রশিক্ষন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। তবে প্রশিক্ষণ কালিন তিনি পুঠিয়া থানায় সংযুক্ত থাকবেন। প্রশিক্ষণ শেষ করে ফেরার পর তাকে কোথায় বদলি করবে সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তিনি।

এদিকে, রাজশাহী জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, পুঠিয়া থানার এসআই তৌফিক পারভেজকে শাস্তিমূলক জঙ্গল প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের সদর দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমে গেছে। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পুঠিয়া থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভালভাল পরিবারের সন্তানদের ধরে নিয়ে এসে মোটা অংকের অর্থ দাবি করতো এসআই তৌফিক পারভেজ। টাকা না দিলে পকেটে মাদক দ্রব্য দিয়ে অথবা মাদক সেবনকারি হিসেবে চালান দিয়ে দিতো। বিশেষ করে বাইরে থেকে আসা বা পুঠিয়ার প্রত্নতত্ত্ব দেখা আসা লোকজনকে বেশী টার্গেট করতো তিনি। তার অত্যাচারে সাধারণ মানুষতো দুরের কথা থানা পুলিশের সদস্যরাই অতিষ্ঠ বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

পুলিশের একধিক সূত্র ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত ১১ জানুয়ারি রাজশাহী শহর থেকে দুই তরুণ-তরুণী বেড়াতে গিয়েছিলেন পুঠিয়ায় বানেশ^র এলাকায় মহাসড়কের পাশে একটি চায়ের দোকানে চান পান করেন তারা। এর পর তারা দুইজনে ধুমপান করেন। ধুমপান করার অপরাধে তাদের দুজনকে ধরে নিয়ে যায় এসআই তৌফিক পারভেজ। পরে তিনি ওই তরুণ-তরুণীর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে বিকাশে পাঠাতে বলে। সে টাকা না দিয়ে রাতভর ওই তরুণ-তরুণীকে থানা হাজতে রেখে দেয়। তবে পরের দিন সকালে তরুণীকে ছেড়ে দেয়া হলেও মাদক সেবনের মামলায় ওই তরুণকে জেল হাজতে পাঠিয়ে দেয় এসআই পারভেজ।

এর আগে গত ৪ জানুয়ারি বিকেলে নাটোর থেকে পুঠিয়া বেড়াতে আসেন স্থানীয় একটি পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকসহ চারজন। তল্লাশী ও জিজ্ঞাবাসাদের নামে এসআই পারভেজ তাদের ধরে নিয়ে যায় একটি নির্জন এলাকার একটি বাগানে। সেখানে গাছের ডাল দিয়ে তাদের বেধরক পেটায় এসআই পারভেজ। এর পর মাথায় অস্ত্র ধরে ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে পকেটে ইয়াবা দিয়ে তাদের চালান দেয়ার হুমকি দেয় এসআই তৌফিক পারভেজ। পরে বিকাশের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ৬৫ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয় এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এসআই তৌফিক পারভেজের ভয়কর এই ঘটনার বিষয়ে অভিযোগ করেন রায়হানুল ইসলাম রানা নামের ভূক্তভোগি এক যুবক। অভিযোগে এসআই পারভেজের ভয়কর আচরণের বিবরণ দেয়া হয়। যাতে বলা হয়, পুঠিয়ার থেকে একটি দুরে হঠাৎ করেই ০৩টি মোটরসাইকেল এসে চারদিক থেকে ঘিড়ে নিয়ে বলে তাদের সঙ্গে যেতে হবে। আমরা প্রশ্ন করি কেন এবং কি কারণে। আমাদের সাথে আইডি কার্ড দেখাই, তারপরে তারা বলে আমাদের থানার সেকেন্ড অফিসার পারভেজ আপনাদের সাথে কথা বলবে। আমরা বলি কেন তিনি আমাদের সাথে কথা বলবে, সেখানে থাকা আরেক পুলিশ অফিসার মোতালেব ও এসআই পারভেজের দালাল টিটু ও হেলমেটধারী আরও ৩/৪ জন আমাদের উপড় চড়াও হয়। এক পর্যায়ে আমরা বাধ্য হই তাদের সাথে যেতে। তারা আমাদের সেই গ্রামের এক বিলের নির্জন জায়গায় নিয়ে যায় ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেখান থেকে ৩০ মিনিট পর তারা আমাদের ছেড়ে দেয়া হবে বলে সামনের দিকে নিয়ে যায়। সেটাও ছিল একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন নির্জন জায়গা। সেখানে এসআই পারভেজ আসেন এবং কোন কথা বা জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই গাছের ডাল ভেঙ্গে এলোপাথারী মারপিট করে। তারপর আবার আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়, আরও সামনে নির্জন অন্ধকারাচ্ছন্ন ক্যানেলের ধারে। সেখানে হাতকড়া পড়িয়ে এসআই পারভেজ অস্ত্র ঠেকিয়ে বলে এই মুহুর্তে ৮০ হাজার টাকা দিতে হবে। না হলে তোদের মেরে হাত-পা ভেঙ্গে ফেলবো এবং পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে কোর্টে চালান দেব। কেন বা কি অপরাধ জানতে চাইলে সে বলে তোরা ফেনসিডিল সেবন করেছিস। আমরা কোন মাদক সেবন করিনি বলি। আমাদের রক্ত পরীক্ষা করতে বলি। কিন্তু পারভেজ বলে, রক্ত পরীক্ষা করা লাগবেনা এমনিতেই ঐ রিপোট আমি ডাক্তারদের দিয়ে করিয়ে নিচ্ছি। এর পর এসআই পারভেজ আমাদের পাঁচজনের নাম পরিচয় লিখে নেয়।

কোনো উপায় না পেয়ে আমরা সেখান থেকে উদ্ধার হওয়ার জন্য বিশ হাজার টাকা দিতে চাই। তবু এই মুহুর্তে নাই, বাসায় ফোন দিয়ে বিকাশ করে নিতে হবে। তাতে তারা রাজি হয় না এবং আমাদের ওপর আবারও অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে এসআই পারভেজ। তারপর আমরা ৪০ হাজার টাকা দিতে রাজি হই। সেটাতেও রাজি হয়নি এসআই পারভেজ। তাদের মধ্যে পুলিশ অফিসার মোতালেব বলে এতো অল্পে আমরা ওসিকে ম্যানেজ করতে পারবো না, আর একটু বাড়াও। অন্যথায় তোদের মেরে ক্যানেলে ফেলে দিবে বলে হুমকি দেয়। এর পর তাদের একটি আম বাগানে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা কোন উপায় না পেয়ে সবশেষে ৬৫ হাজার টাকা দিতে রাজি হলে তারা আমাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করে। টাকার দফারফা হওয়ার পর এসআই পারভেজ চলে যায়। আমাদের পাঁচজনের হাত বাঁধা অবস্থায় সেখানে থাকে পুলিশ অফিসার মোতালেব ও টিটু দালাল। তারা একটি বিকাশ এজেন্ট +৮৮০১৭৬০৫৫৯২৯২ নাম্বার দেয়। আমরা আমাদের আত্মীয় স্বজন ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই বিকাশ এজেন্ট নাম্বারে টাকা টাকা পাঠায়। ৮৭ (শেষ দুই ডিজিট) নাম্বার থেকে ১০,০০০/=, ৩৬ (শেষ দুই ডিজিট) নাম্বার থেকে ১০,০০০/=, ৭৭ (শেষ দুই ডিজিট) এই নাম্বার থেকে ১০,০০০/=, ২১ (শেষ দুই ডিজিট) এই নাম্বার থেকে ৮.৮২০/= টাকা দেয়া হয়। বাসায় টাকা যোগাড় করতে দেরি হওয়ায় ৩০ মিনিট পর আবার বিকাশ নাম্বারে ০১৮৪২-২৮৯৯২৮ তে ১৫,০০০/= ও বিকাশ ০১৭৭৬-৮৪১৫৫৮ নাম্বারে ১০,০০০/= টাকা, মোট ৬টি নাম্বার থেকে ছয়বারে ৬৪,১৮০/= টাকা দেয়া হয়। টাকা পেয়ে তারা আমাদের শেষ বারের মতো শাসিয়ে দেয় যেন আমরা কাউকে এই ঘটনার কথা না বলি। এর পর আমাদের দিয়ে পুলিশ অফিসার মোতালেব তার মোবাইলে ভিডিও রেকডিং করে জবানবন্দী নেয়। আমাদের সন্দেহমূলক ভাবে ধরেছিল এবং খোঁজাখুজি করে কোনকিছু না পেয়ে ছেড়ে দিয়েছে। জবানবন্দী দিয়ে রাত্রি ১০.৩০টায় আমরা মুক্তি পায়।

আর আগে গত ২ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে বানেশ^র ট্রাফিক মোড়ে চার যুবকের সঙ্গে অশালিন আচরণ করেন এসআই তৌফিক পারভেজ। এ সময় ঘটনাটি মোবাইল ফোনে রেকর্ড দেয় এশিয়ান টেলিভিশনের রাজশাহী প্রতিনিধি। পরে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ধরে নিয়ে যায় একটি নির্জন এলাকায়। সেখানে তাদের বেধরক মারপিট করে গভীর রাত পর্যন্ত বেধে রাখে। রাত ২টার দিকে তাদের নিয়ে যায় পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে তাদের কোন পরীক্ষা ছাড়াও শরীরে এ্যালকাহল আছে বলে চিকিৎসকের কাছ থেকে সনদপত্র নেয়। এর পর মাদক সেবনকারি হিসেবে মামলা দিয়ে তাদের জেল হাজতে পাঠায় এসআই তৌফিক পারভেজ।

এ ধারণের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এর আগে দুর্গাপুর থানায় থাকা অবস্থায় গত বছরের ছয় মার্চ পুলিশের কাছ থেকে পালাতক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে ধরে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে ছেড়ে দেয় এসআই তৌফিক পারভেজ। এ ঘটনায় এসআই পারভেজকে ক্লোজড করা হয়।

এর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থানায় থানায় কর্মরত অবস্থায় ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই শিশু অপহরণকারিকে ধরে মোটা অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার অভিাযোগে ক্লোজড হন এসআই তৌফিক পারভেজ। এর আগে চারঘাট থানায় কর্মরত অবস্থায় ২০১৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর উপজেলার হলিদাগাছিতে গ্রামে অস্ত্র ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে ছেড়ে দেয়ায় এসআই তৌফিক পারভেজকে গণধোলাই দিয়ে আটকে রাখে এলাকাবাসী। পরে পুলিশের কর্মকর্তারা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।

আরও খবর

  • এক দশকে জলে গেল ৩০০০ কোটি টাকা
  • দুদক পরিচালক এনামুল বাছির গ্রেপ্তার
  • বগুড়ায় ছেলেধরা সন্দেহে চারজনকে গণপিটুনি, পিকাআপে আগুন
  • প্রিয়া সাহাকে বহিস্কার
  • আকাশ, স্থল ও নৌ পথে রাজশাহী-কলকাতা যুক্ত শীঘ্রই
  • গুজবে গণপিটুনি ঠেকাতে পুলিশকে কঠোর নির্দেশ
  • রাজশাহীতে ছেলেধরা সন্দেহে ৫ এনজিও কর্মীকে গণধোলাই
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় দুইজন নিহত
  • ডেঙ্গুজ্বরে সিভিল সার্জনের মৃত্যু
  • ভারতে বজ্রপাতে ৩২ জন নিহত
  • রূপপুরে দুর্ণীতি ৬২ কোটি টাকার, জড়িত ৩৪ প্রকৌশলী
  • ছেলেধরা গুজবে কান না দেয়ার আহ্বান রাজশাহী পুলিশের
  • রাজশাহীতে ছেলেধরা সন্দেহে তিনজনকে গণপিটুনি
  • রাজশাহীতে জাল রুপি তৈরীর কারখানা
  • প্রিয়া সাহাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ



  • উপরে