রাজশাহী পলিটেকনিকে ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত, সৌরভ স্থায়ী বহিস্কার

রাজশাহী পলিটেকনিকে ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত, সৌরভ স্থায়ী বহিস্কার

প্রকাশিত: 03-11-2019, সময়: 22:55 |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষকে পুকুরের ফেলে দেয়ার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ছাত্রলীগ শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন সৌরভকে স্থায়ী বহিস্কার করেছে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিতে ছাত্রলীগের সকল কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি রকি কুমার ঘোষ।

তিনি জানান, রোববার রাতে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্রাচার্য স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সৌরভকে বহিস্কার ও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ছাত্রলীগের নির্বাহী সংসদের এক জরুরী সিদ্ধান্ত মোতাবেক এবং রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২ নভেম্বর রাজশাহী পলিটেকনিকের অধ্যক্ষের সাথে অপ্রীতিকর ঘটনার দায়ে ও দলীয় শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগে কামাল হোসেন সৌরভকে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ী বহিস্কার করা হলো। সেই সাথে পলিটেকনিক শাখার সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত করা হলো।

সেমিস্টারের মিডটার্ম পরীক্ষায় ফেল এবং ক্লাশে অনুপস্থিত থাকা পলিটেকনিক শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক কামাল হোসেন সৌরভকে ফাইনাল পরীক্ষায় সুযোগ দেয়ার জন্য শনিবার সকালে নেতাকর্মীরা অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে চাপ দেন। এ নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে তাদের তর্কবিতর্ক হয়। এর জের ধরে দুপুরে ছাত্রলীগ নেতা সৌরভের নেতৃত্বে একদল ছাত্রলীগ নেতাকর্মী অধ্যক্ষকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরের একটি পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়। অধ্যক্ষ তখন মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে নিজের কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলেন।

এ ঘটনায় তিন সদস্যের কমিটি করে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। রোববার এ কমিটি গঠনের পর বিকেলে কমিটির তিন সদস্য রাজশাহী পৌঁছে তদন্ত শুরু করেন। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সিসিটিভির ফুটেজ দেখেন।

এ সময় তদন্ত দল ক্যাম্পাসে একটি টর্চার সেলের সন্ধান পায়। পুকুরের পশ্চিম পাশের ভবনের ১১১৯ নম্বর কক্ষে এ টর্চার সেল থেকে লোহার রড, পাত ও পাইপ পাওয়া যায়। পরে সেগুলো পুলিশ হেফাজতে দেয়া হয়। এ সময় তদন্ত কমিটির কাছে কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্র জানায়, ওই টর্চার সেলটি ছাত্রলীগের। ওই কক্ষের সামনে ছাত্রলীগের টেন্ট। ছাত্রলীগের নেতাদের কথা না সুনলে সেখানে নিয়ে গিয়ে টর্চার করা হতো।

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব ও পরিচালক (প্রশাসন) স্বাক্ষরিত তদন্ত কমিটির আহবায়ক করা হয়েছে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব ও পরিচালাক (পিআইডব্লিউ) এসএম ফেরদৌস আলমকে। এছাড়াও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালাক (কারিকুলাম) ড. মো. নুরুল ইসলাম কমিটির সদস্য এবং রাজশাহী মহিলা পলিকেনিটক ইনিস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ওমর ফারুককে সদস্য সচিব করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির আহবায়ক এসএম ফেরদৌস আলম বলেন, রোববার সকালে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। বিকেলে তারা দুইজন ঢাকা থেকে বিমানে রাজশাহী আসেন। আর কমিটির অপর সদস্য রাজশাহীতে ছিলেন। রাজশাহী পৌঁছেই তারা তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তারা তদন্ত করে তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবেন বলে জানান তিনি।

টর্চার সেল নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ফেরদৌস আলম বলেন, সব বিষয় নিয়ে তারা তদন্ত করছেন। তারা অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। এখনই যদি তদন্তের সব কথা বলে দিই তা হলে তদন্ত থাকে না। তবে সব বিষয় তদন্ত প্রতিবেদনে থাকবে বলে জানান তিনি।

অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, ওই কক্ষটি জোর করে নিয়ে ছাত্রলীগের ছেলেরা ব্যবহার করতো। সেখানে বসে তারা বিভিন্ন সময় আড্ডা বা মিটিং করতো। তবে শুনেছি তারা ওই কক্ষটি টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতো। তবে এ নিয়ে কেউ কোনদিন তার কাছে অভিযোগ দেয়নি। ছাত্রলীগের ছেলেদের বিরুদ্ধে শিক্ষক বা ছাত্র সবাই অভিযোগ দিতে ভয় পায়।

এদিকে, রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষকে টেনেহিঁচড়ে পুকুরের পানিতে ফেলে দেয়ার ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। রোববার সকাল ১১টা থেকে তারা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে। এ সময় তারা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধসহ পাঁচদফা দাবি জানান। দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে ঘোষণা দেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

পলিটেকনিট শিক্ষক প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক ও ছাত্ররা পাঁচদফা দাবি নির্ধারণ করে আন্দোলনে নেমেছে। দাবি পুরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানান তিনি। দাবিগুলো হলো- অভিযুক্তদের দ্রুত বিচার, তাদের স্থায়ীভাবে ছাত্রত্ব বাতিল, ছাত্র রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ, শিক্ষক ও ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের আটক ২৫ ছাত্রের মধ্যে পাঁচজনকে অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন আহমেদের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এরা হলো- পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী শাফি শাহরিয়ার (২৩), সোহেল রানা (২২), বাঁধন রায় (২০), আরিফুল ইসলাম (২৩) ও মেহদী হাসান রাব্বি (২১)।

নগরীর চন্দ্রিমা থানার ওসি শেখ গোলাম মোস্তফা বলেন, শনিবার রাত থেকে রোববার ভোর পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে পলিটেকনিকের ২৫ ছাত্রকে আটক করা হয়। ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্ত করে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পরে ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা গিয়ে অধ্যক্ষকে পুকুর থেকে টেনে তোলেন। এ ঘটনায় রাতে চন্দ্রিমা থানায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন অধ্যক্ষ। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এতে আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়। এরা হলো- প্রতিষ্ঠানটির কম্পিউটার বিভাগের অষ্টম পর্বের ছাত্র কামাল হোসেন সৌরভ, ইলেকট্রনিক্সের পঞ্চম পর্বের মুরাদ, পাওয়ারের সাবেক ছাত্র শান্ত, ইলেক্ট্র্যিালের সাবেক ছাত্র বনি, মেকাট্রনিক্সের সাবেক ছাত্র হাসিবুল ইসলাম শান্ত, ইলেকট্র মেডিক্যালের সাবেক ছাত্র সালমান টনি, এই বিভাগের সপ্তম পর্বের ছাত্র হাসিবুল এবং কম্পিউটারের সাবেক ছাত্র মারুফ। বাকি আসামিরা অজ্ঞাত।

Leave a comment

উপরে