রাজশাহীতে অনুপ্রবেশকারী তালিকা দীর্ঘ

রাজশাহীতে অনুপ্রবেশকারী তালিকা দীর্ঘ

প্রকাশিত: 02-11-2019, সময়: 15:26 |
Share This

নিজস্ব প্রতিবেদক : আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো তালিকা করা হয়নি। জেলা-উপজেলার নেতারাও কেন্দ্রে কোনো তালিকা জমা দেননি। ফলে বাধ্য হয়ে দলীয় সভানেত্রী নিজের তত্ত্বাবধানে পাঁচ হাজার অনুপ্রবেশকারীর তালিকা করে ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতে দিয়েছেন। এতে টনক নড়েছে দায়িত্বপ্রাপ্তদের। এ তালিকার প্রায় দেড় হাজার অনুপ্রবেশকারী এখন আওয়ামী লীগের গুরুত্বপুর্ণ পদে রয়েছেন।

জানা গেছে, বিএনপি ও জামায়াত ছেড়ে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকে। আর এই অনুপ্রবেশ বেড়ে যায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর। বিশেষ করে চারদলীয় জোটের সহিংস আন্দোলন দমে যাওয়ার পর থেকে তৃণমূল পর্যায়ে ভিড়ে যান বিএনপি-জামায়াতের অনেক নেতাকমী। আর আওয়ামী লীগ সরকার এবার টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় পর্যায়ে যেন সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে।

রাজশাহীতে এখন পর্যন্ত কি পরিমান নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেছে তার তথ্য দিতে পারেনি দলটির স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। তবে অনেকের ধারণা গত পৌনে ১১ বছরে রাজশাহী জেলা ও নগর আওয়ামী লীগে ভিড়েছেন কয়েকশো বিএনপি-জামায়াত নেতা। যাদের মধ্যে অর্ধশত নেতা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ন পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।

২০০৭ সালের তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন কাঁকনহাট পৌরসভার মেয়ল আবদুল মজিদ মাস্টার। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই বাগিয়ে নিয়েছেন কাঁকনহাট পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ। একই সঙ্গে নৌকা নিয়ে তিনি কাঁকনহাট পৌরসভার মেয়রও নির্বাচিত হয়েছেন। গত সম্মেলনে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য পদও পেয়েছেন।

একই উপজেলার যুবদলের সভাপতি রবিউল আলম এখন গোদাগাড়ী পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান কামরু এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। গোদাগাড়ী উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি ও মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুল ইসলাম ২০১১ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক।

মো. ইসহাক আলী গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। গত বছরের ১৫ আগস্ট তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। তবে এখনো তিনি কোন পদ-পদবি পাননি। আর এ উপজেলার এক সময়ের শিবির নেতা শহিদুল ইসলাম এখন জেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। জামায়াত নেতা আবুল কালাম আজাদ বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক। এছাড়াও বিএনপি নেতা মাইনুল ইসলাম বর্তমানে ওয়ার্ড সৈনিক লীগের সভাপতি, জামায়াত নেতা জাহিদুল ইসলাম যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা ও পশ্চিম জেলা ছাত্রশিবির সভাপতি এবং জঙ্গি নেতা বাংলাভাইয়ের সহযোগী মোল্লা এম আলতাফ হোসেন। এখন তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। বাগমারা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি নূরুল ইসলাম আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। আগামী সম্মেলনে পদের আশায় রয়েছেন তিনি।

জেলার পুঠিয়া উপজেলা জামায়াতের রোকন আরিফ হোসেন। তিনি এখন উপজেলার জিউপাড়া ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি। জামায়াত কর্মী মজিবর রহমান এখন জিউপাড়া ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক। এছাড়াও উপজেলার পুঠিয়া পৌরসভার বিএনপির সভাপতি আলী হোসেন, পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল লতিফ বিশ^াস, পুঠিয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান, জিউপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ইমরুল ইসলাম আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। এদের মধ্যে আতিকুর রহমান যোগ দিয়েই পৌরসভায় চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন।

মোহনপুর উপজেলা জাতীয় পার্টির নেতা রুস্তম আলী ও জাতীয় পার্টির সহযোগি সংগঠন জাতীয় যুব সংহতি নেতা কামরুজ্জামান রানা বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। জাতীয় পার্টির আরেক নেতা রোকনুজ্জামান টিটু কেশরহাট পৌরসভা যুবলীগের সভাপতি।

চারঘাট উপজেলার চারঘাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কাবিল উদ্দিন, শলুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি তৌফিক ইসলাম, চারঘাট পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন, ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সভাপতি শফিউর রহমান, যুবদল নেতা জাহিদুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আবদুল কাদের ও ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতা আবদুল মান্নান আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। তারা এখন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা।

পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মফিদুল ইসলাম বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। তিনি পবা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তার সঙ্গে ওই ইউপির সদস্য ও বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, মহিলা সদস্য রেশমা বেগম এবং রাশেদা বেগম আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। এছাড়াও আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন তানোর উপজেলার কলমা ইউপির ওয়ার্ড পর্যায়ের বিএনপি নেতা আব্বাস উদ্দিন, আতাউর রহমান ও রেজাউল করিম।

রাজশাহী নগরের ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মনির হোসেন, বিএনপি নেতা ও ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুস সোবহান, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। এছাড়াও নগর বিএনপি ও সহযোগি সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগের সদস্য হয়েছেন।

গত পৌনে ১১ বছরে রাজশাহীতে অনুপ্রবেশকারীরা জায়গা করে নিয়েছে আওয়ামী লীগে। শুধু তাই নয়, তাদের অনেকের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে দলটির ত্যাগী ও প্রবীন নেতা-কর্মীরা। এছাড়াও দলের অনুপ্রবেশকারীরা জড়িয়ে পড়েছে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জমিদখল এমনকি মাদক চোরাচালন নিয়ন্ত্রণে।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘‘দলে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা করে পাঠানোর কোন নির্দেশনা আমরা পায়নি। তবে অনুপ্রবেশকারীরা যেন পদ না পায় সে ব্যাপারে সতর্ক করে কেন্দ্র থেকে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু কারা কারা অনুপ্রবেশকারী তার তালিকা দেয়া হয়নি।’’ কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান তিনি।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘‘আমার জানা মতে গত ১০ বছরের মধ্যে অনুপ্রবেশকারীদের কেউ আওয়ামী লীগের পদ পায়নি। আগামীতে সম্মেলনেও তারা পাবে না। এ ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে যে নির্দেশনা এসেছে সে ভাবেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’’

Leave a comment

উপরে