আইনের ফাঁকে ঠকছে মানুষ

আইনের ফাঁকে ঠকছে মানুষ

প্রকাশিত: ২১-১১-২০১৯, সময়: ০০:১৬ |
খবর > মতামত
Share This

এম. আব্দুল বাতেন, গোদাগাড়ী : বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় পেঁয়াজ। দেশের জনগণ যখন পেঁয়াজের অতিরিক্ত দামের বিড়ম্বনায় কাহিল, ঠিক সেই মূহুর্তে আরেকটি বিড়ম্বনা যোগ হয়েছে লবণ। হঠাৎ করেই লবণের সংকট হবে দেশ জুড়ে দাম হতে ১০০ টাকা এই গুজবে সারাদেশ তোলপাড় হয়ে গেলো।

হুজুগে জনগণ সেই কথায় তাল মিলিয়ে আজ ১৯ নভেম্বর মঙ্গলবার দুপুরের পর হতে লবণ ক্রয়ের জন্য দোকানে ভীড় জমাতে থাকে। সুবিধাবাদি ব্যবসায়ীরাও এই গুজবকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত মুনাফায় লবণ বিক্রয় করতে থাকে। সামাজিক গণমাধ্যম গুলোতে লবণের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি ঝড় তুলে। পেঁয়াজ আর লবণের দাম বৃদ্ধির ইস্যুতে চলছে সরকারের সমালোচনা।

পেশায় সংবাদকর্মী হওয়ায় দুপুরের পর হতে লবণের দাম বৃ্িদ্ধর খবরটি মোবাইলে আসতেই থাকে। প্রথমে গুরুত্বই দেয়নি। বিকেল ৫ টার পর বাসা হতে বের হতেই রাস্তার দোকানদার আর জনসাধারণ লবণের দাম ১০০ টাকা হবে আর সেই লবণ ক্রয় করতে জনগণের হুড়োহুড়ি এই আলোচনায় মুখরিত।

ঠিক সময় যতই গড়াতে লাগলো ততই বুঝতে পারলাম আসলেই লবণ বেশী দামে আর একেকজন ৪-৫ প্যাকেট করে নিয়ে বাসায় ফিরছে। প্রেস ক্লাব যেতেই চোখে পড়লো একেক জন বেশী করে লবণ নিয়ে বাড়ী ফেরার দৃশ্য।

এবার বাজারে প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো এবার পেঁয়াজ নয় লবণের ঝাঁজে জনগণ হতভম্ব। এসব দেখে নিজেই উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে ফোন দিলাম বিষগুলো অবহিত করার জন্য। উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজেই জানালেই আমরা অলরেডি মাঠে আছি ব্যবস্থা নিচ্ছি কোথায় আপনি? আমি নিজে গিয়ে দেখা করলাম আর দেখলাম লবণ নিয়ে মানুষের তুলকামাল কান্ড। তবে উপজেলা প্রশাসন ও গোদাগাড়ী থানার ওসির তৎপরতা দেখে খুব ভালো লাগলো। তারা তাদের নিজেদের মত উপজেলার বিভিন্ন বাজার মনিটরিং করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

পেশায় সাংবাদিক হওয়াতে উৎসক জনগণ লবণ বেশী দামের ক্রয়ের বিষয়টি প্রেস ক্লাবে এসে অবহিত করলো। নিজেরা বাজারটিকে আরো যাচাই বাছাই করার জন্য অন্য দোকান হতে লবণ ক্রয় করানো হলো। তাতে দেখা গেলো গৃহিনী নামক ব্যান্ডের লবণ একই বাজারে কেজিতে ১০ টাকা কম আর বেশীতে বিক্রয় করা হচ্ছে।

স্বাভাবিক ভাবে যে কারো মনে রাগ আর ক্ষোভ জন্মানোরই কথা। এসব চোখে দেখে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করা হলে থানার ওসিকে নিয়ে সেই দোকানে গেলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার । মহুর্তের মধ্যেই দোকান ঘিরে জড়ো হলো উৎসুক জনতা।

আমাদের সাথে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবার আল-মামুন স্টোরের সেই দোকানদার কে জিজ্ঞেস করলেন এই লবণ কত টাকা কেজি বিক্রয় করছেন। তিনি উত্তর দিলেন ২০ টাকা কেজি স্যার। লক্ষ্য করুন মাত্র কিছুক্ষণ আগে যে দোকানদার অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রয় করলেন ২৫ টাকা কেজি সেই দোকানদার একই মুখে বলছেন ২০ টাকা কেজি। এবার বেশী দামের ক্রেতারা ওই দোকানদারের সামনেই অভিযোগ করলেন ২৫ টাকায় বিক্রয় করেছেন। এবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লবণের প্যাকেটের গাঁয়ে দেখতে লাগলেন মূল্য কত টাকা আছে। প্যাকেটের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২৫ টাকা দেখে বললেন দাম বেশী নেয় নি এই দামে বিক্রয় করতে পারবেন। এটি আইন পরিপন্থি হয়নি তাই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন না। ভোক্ত অধিকার আইনে আছে প্যাকেটের গায়ে নির্ধারিত মূল্যের বেশী দামে কোন পণ্য বিক্রয় করলে ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন হয় । এই আইনের বেড়াজালে ওই ব্যবসায়ী পার পেয়ে গেলেন।

তবে সব চেয়ে অবাক করার বিষয় হলো একই বাজারের অন্য ব্যবসায়ী সেই লবণটিই মাত্র ১৫ টাকা কেজিতে বিক্রয় করলেন। যিনি ১৫ টাকা কেজিতে লবণটি বিক্রয় করছেন তিনি কি ব্যবসায় লাভ করছেন না ? নাকি লস করে ব্যবসা করছেন। আবার খবর আসলো সেই লবণ বেশী করে নিলে ১৪ টাকাতেও পাওয়া যাবে।

আইনের বেড়াজালে মাত্র ১ কেজি লবণে ১২-১৪ টাকা লাভ করছে আবার কেউ মাত্র ৪-৫ টাকা লাভ করছে। অতচ ওই ব্যবসায়ী অন্যান্য দিন ১৫-১৬ টাকা কেজিতে বিক্রয় করছেন। আমার প্রশ্ন গুজবের সুযোগে ওইসব অসাধু ব্যবসায়ীরা যেমন ১৫ টাকার জিনিস ২৫ টাকায় বিক্রয় করলো কিন্ত আইনের কি এতটা ফাঁক থাকা প্রয়োজন ? । সামান্য লবণে যদি প্রায় শতভাগ মুনাফা অর্জন করে ব্যবসায়ীরা তাহলে আর সব পণ্যে কি অবস্থা তা জনগণই জানেনা। মধ্যে থেকে জনগণই ঠকে মরছে।

উচিত হবে এসব ভোক্ত অধিকার আইনের সংশোধণ করে সর্বনিন্ম মাত্রায় ব্যবসায়ীদের লাভ করার সুযোগ দেবার। শুধু লবণ নয় দেখা গেছে বিভিন্ন কীটনাশন ঔষধ ও মানুষের খাবার ঔষধের গায়ে অনেক বেশী মূল্য ফেলা থাকে যা জনগণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েই আসছে। অথচ সেই সব পণ্য প্যাকেটের গায়ে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দাম নিয়েও থাকে। সুযোগে এসব অতিরিক্ত মূল্য তারা আদায় করে ক্রেতাদের কাছে।

এই লবণ অভিযানের সময় ওই ক্রেতা আরেকটি অভিযোগ করলেন তিনি এসিআই ব্যান্ডের লবণ কিনতে গিয়ে পাননি। তার দোকানে নেই আগামীকাল সকাল ১০ টায় পাওয়া যাবে। তবে সেই বাজারের অধিকাংশ জনগণের অভিযোগ ছিলো তার গোডাউনে লবণ মজুত করা আছে তা তল্লাশী করা হোক। জনগণের দাবির মুখে আমিও বললাম যখন সবাই চাইছে তখন একটু দেখা হোক। কিন্ত হঠাৎ গোদাগাড়ী থানার ওসির প্রতিক্রিয়া দেখলাম অন্যরকম। তিনি বললেন সে ব্যবসায়ী তার গোডাউনে লবণ মজুত থাকতেই পারে। অবাক হলাম একজন দায়িত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছ হতে এমন মন্তব্য শুনে। ওই ওসি উল্টো ওই লবণ ক্রেতাকে শাসাতে লাগলেন, বললেন আপনি কয় প্যাকেট লবণ কিনেছেন ? বাড়ীর সদস্য কয়টা । সে বললো দুই দোকানে দুই কেজি বাড়ীর সদস্য ৬ টি । আমি বাজার যাচাই করার জন্যই এসব লবণ কিনেছি। ওসি আবার হুমকি দিয়ে বললেন ৬ জন মানুষের দুই কেজি লবণ কেন কিনেছেন এভাবে নানান কথা । একজন ওসির এমন মনমানসিকতায় ভেস্তে গেলো গুদামে লবণ দেখার কাজটি।

একটু ভাবেন একজন অতিসাধারণ মানুষ যখন এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার জন্য চেষ্টা অব্যহত রেখে সাহসী কাজে এগিয়ে আসছে তখন একজন থানার ওসি সেটিকে বাধা গ্রস্থ করছে। তবে মনের মধ্যে একটি চিন্তা বলেন আর ভাবনায় বলেন সেই ওসির গুদাম তল্লাসীতে বাঁধা দেবার কারণ কি?।

তবে আমাদের উচিত হবে এসব গুজবে কান না দিয়ে নিজেদের ঠকানোর দলে না ভিড়িয়ে সব তথ্য যাচই বাছাই করে কোন কাজে অগ্রসর হওয়া। আমাদের দেশে গুজনের প্রবণতা বেশী তাই এটি সম্পর্কে নিজেদের সচেতনের বিকল্প নেই। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে তাই ছেলে ধরা গুজব, চাঁদে সাঈদীকে দেখার গুজবের প্রভাব কি ভয়াবহ হতে পারে তা আমরা দেখেছি।

নিজেরাই অতি উৎসাহী হয়ে লবণ কিনতে গিয়ে ঠকছি সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। আসুন আমরা অতি জনসাধারণ, ব্যবসায়ী হতে শুরু করে সকল স্তরের মানুষ নিজের মনমানসিকতা পরিবর্তণ করে দেশের কলাণ্যে সামান্যতম অবদান রাখি।

লেখক- এম. আব্দুল বাতেন, সাংবাদিক, রাজশাহী।

Leave a comment

উপরে