একজন অসাধারণ কর্মবীর শেখ হাসিনা

একজন অসাধারণ কর্মবীর শেখ হাসিনা

প্রকাশিত: ২৭-০৯-২০১৯, সময়: ২৩:২৭ |
Share This

আজাদুল ইসলাম আদনান : শেখ হাসিনা, একটি নাম, একটি বিস্ময়। সমকালীন বিশ্বে এমন এক রাষ্ট্রনায়ক যিনি কেবল বাংলাদেশের চতুর্থদফা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বেই নিয়োজিত নন, তিনি একমাত্র রাজনীতিবিদ যিনি টানা চার দশক ধরে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

তার নেতৃত্বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ রুপান্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমেই জাতির ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে।

১৯৭৫ সালে একদল বিপথগামী সেনাদের হাতে শাহাদাত বরণ করেন জাতির পিতা। সে সময় পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। ফলে, এ ন্যাক্কারজনক হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা। পরবর্তী ছয় বছর লন্ডন ও দিল্লিতে স্বদেশ ছেড়ে থাকতে হয় তাদের।

১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ ও কোরবান আলীর সঙ্গে ঢাকায় রওনা হন। বিমানবন্দরে নামলে তাকে স্বাগত জানাতে লাখ লাখ মানুষ ভিড় জমান। এসময়ই তিনি বুঝতে পারেন, বঙ্গবন্ধুর রেখা যাওয়া স্বপ্নগুলো বাস্তবে রুপ দিতে লাখো মানুষের এ ভালবাসা তার পথচলার পাথেয় হবে। ঠিক তখন থেকেই জীবনের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করেন শেখ হাসিনা। তবে, এ পর্যন্ত আসতে তাকে পোহাতে হয়েছে নানান প্রতিকূলতা ও দুর্যোগ।

এমনকি তাকে প্রাণে মেরে ফেলতে সরাসরি ১৯ বার তার ওপর বিভিন্নভাবে হামলা চালানো হয়েছে। তারপরও, বাবার রেখে যাওয়া স্বপ্নের বাস্তবায়ন ও গোটা বাঙালি জাতির ভাগ্যোন্নয়নে এক মূহুর্তের জন্য নিজের পথ থেকে সরে যাননি। ফলে কুচক্রীদের তাকে সহ্য না হলেও, তার প্রতি এ দেশের মানুষের ভালবাসা তাকে তার স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলতে আরও বেশি শাণিত প্রেরণা জুগিয়েছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর দীর্ঘ ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া একমাত্র দল আওয়ামী লীগ। এ সময় ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের হাল ধরেন শেখ হাসিনা। সে সময় বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশেকে প্রথম ডিজিটালে রুপান্তরিত করার স্বপ্ন দেখেন।

কিন্তু পরবর্তীতে ২০০১-০৮ সাল পর্যন্ত চার দলীয় জোট ও তত্ত্বাবধায়কের সময় বাংলাদেশ এক অন্ধকার সময় পার করে। এ সময় স্থবির হয়ে পড়ে দেশের অর্থনীতি। কালো মেঘে ঢাকা পড়ে দেশের রাজনীতি। ফলে, নিজেকে পর্দার অন্তরালে নিয়ে যান জয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ‘দিন বদলের সনদ’ নিয়ে ক্ষমতায় আসে। শুরু হয় বাংলাদেশের নতুন যাত্রা। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধীদের শাস্তি নিশ্চিত করেন। এতেও তাকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। তবুও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ওপর যারা অত্যাচার, নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে বিন্দুমাত্র পিছপা হননি তিনি। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে নতুন করে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের ফলে বিশেষ করে টানা তৃতীয়বার দেশ পরিচালনার জন্য অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের অগ্রগতির ইতিহাস এখন সমৃদ্ধ। দেশের প্রতিটি সূচকে এগিয়ে আছি আমরা। শেখ হাসিনার সরকারের চতুর্থ মেয়াদের এই মুহূর্তে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বর্তমান সরকারের সাড়ে সাত বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে, জিডিপিও বেড়েছে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট (৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা) হয়েছে এবার।

প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৬৪.৫ থেকে ৭০ হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের সব সূচকেই উন্নতি হয়েছে। উন্নতি হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তার। ব্যাপকভাবে বেড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। চার হাজার ৫৮৩ মেগাওয়াট থেকে সেটি ১৩ হাজার ২৮৩ মেগাওয়াট হয়েছে। অন্যদিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ হয়েছে ব্যাপকভাবে।

মোবাইল ব্যবহারকারী দ্বিগুণ হওয়া, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১২ লাখ থেকে সোয়া চার কোটি হওয়াসহ সব খাতেই আমাদের সম্মুখগতি দৃশ্যমান।

বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এ রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানদের মধ্যে ইতোপূর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো আর কেউ ডিজিটাল রূপান্তর বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে তত্ত্বীয় বা প্রায়োগিক কোনো কাজ করেননি।

সব দেশেই মহান নেতারা দেশের অগ্রগতিকে সামনে নিয়ে যান। শেখ হাসিনাও তেমনিই আমাদের সেই রাষ্ট্রনায়ক। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ হতে চলেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন এ দেশের স্বাধীনতার রূপকার, তেমনি ‘আধুনিক’ ও ‘ডিজিটাল’ ‘জ্ঞানভিত্তিক’ বাংলাদেশ শেখ হাসিনার হাতেই গড়ে উঠেছে। এ বিষয়ে তার অবদান সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে।

বঙ্গবন্ধুর সময় যেখানে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৭৫ ছিল আর দারিদ্র ছিল ৭০ শতাংশ, সেখান থেকে আজ প্রবৃদ্ধির চাকা ঘুরছে ৭ শতাংশের ওপরে। আর দারিদ্র কমে ২১ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে।

তার নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত রুপ নিয়েছে। দেশব্যাপী ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার পরিকল্পনার হাতে নিয়েছেন তিনি। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উন্নত রাষ্ট্রে রুপ দিতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। আর ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের মধ্যদিয়ে রুপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

তার সময়ই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো মহাকাশে নভোযান পাঠিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নতুন করে পরিচিতি লাভ করে। ফলে বিশ্বের বুকে আজ আর কেউ বাংলাদেশকে অবহেলার সাহস পায় না।

শুধু অর্থনীতি ও রাজনীতি নয়, শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়েছে। স্বাক্ষরতার হার এখন ৫৭ শতাংশ। প্রাইমারি ও মাধ্যমিকে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দেয়ার ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার সংখ্যা এখন নেই বললেই চলে। শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক জ্ঞানের পাশাপাশি বিজ্ঞান ভিত্তিক পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। নারী শিক্ষার প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান ও কারিগরী শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। ফলে, পূর্বের তুলনায় বেকারত্বের হার অনেক কমে যায়।

এছাড়া, বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে শেখ হাসিনা বিশ্বের বুকে একজন মহিয়সী। দেশের প্রতিটি খাতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমতা বিধানে অন্যবদ্য ভূমিকা ও পরিকল্পনা হাতে নেন শেখ হাসিনা। ফলে, বাংলাদেশ আজ অনেকটা বাল্য বিয়ের হাত থেকে মুক্তির পথে। এ জন্যই বিশ্বের অন্যান্য ক্ষমতাধররা তাকে ভিন্ন চোখে দেখেন। যা বিশ্বজুড়ে তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সবশেষ, মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের বুকে তিনি আজ স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। মানবতার বিরল দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের মধ্যদিয়ে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশকে যেমন অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তেমনি বিশ্বের বুকে নিজের নেতৃত্বের গুণাবলিকে কাজে লাগিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে একটি ভঙ্গুর দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়।

ফলে বিশ্বব্যাপী ক্ষমতাধর শীর্ষ নারীদের একজন তিনি। মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসা ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত শেখ হাসিনাকে ‘প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা’ বিভাগে সেরা ১০ চিন্তাবিদের তালিকায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ফরেন পলিসি।

এছাড়া, তার অর্থনৈতির প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনসহ প্রতিটি খাতে তার নেতৃত্বের বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নতির পাশাপাশি শেখ হাসিনার ঝুলিতে জমেছে অনেকগুলো অর্জন। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক অনেক সম্মাননা পদক। এ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে দেওয়া আন্তর্জাতিক পুরস্কারের সংখ্যা প্রায় ৪০টি।

১৯৯৬ সালে প্রথমবার যখন বাংলাদেশের হাল ধরেন, সে সময় ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো থেকে ‘হুপে-বোয়ানি’ শান্তি পুরস্কার লাভের মাধ্যমে জাতিসংঘের সম্মাননা অর্জনের পর প্রথম আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার মাধ্যমে প্রায় দুই দশকের বেশি পুরানো সংঘাত অবসানের একবছর পরে তিনি এই সম্মাননা লাভ করেন।

এছাড়া, বাংলাদেশে নারী শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে অসামান্য নেতৃত্বের জন্য প্রধানমন্ত্রী গত বছরের ২৭ এপ্রিল গ্লোবাল উইমেন’স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

চলতি বছরের মার্চে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে ‘লাইফটাইম কন্ট্রিবিউশন ফর উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করে ইনস্টিটিউট অব সাউফ এশিয়ান উইমেন। বার্লিনে ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এ পদক গ্রহণ করেন সেখানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ইমতিয়াজ আহমেদ।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর ‘ড. কালাম স্মৃতি ইন্টারন্যাশনাল এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০১৯’ পেয়েছেন শেখ হাসিনা। খ্যাতনামা বিজ্ঞানী, ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জে আব্দুল কালামের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এ পুরস্কার প্রবর্তিত হয়।

জাতিসংঘের চলতি অধিবেশনে যোগ দিয়ে গত সোমবার (২৩ সেপ্টেম্বর) টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সফলতার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কার দিয়েছে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন এবং ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই)।

আর বৃহস্পতিবার তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে শেখ হাসিনাকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ শীর্ষক পুরস্কারে ভূষিত করেছে ইউনিসেফ। এছাড়া, বিভিন্ন দেশ থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

উপরে