অনলাইনের অপব্যবহারে ঝুঁকির মধ্যে আমাদের প্রিয় শিশুরা

অনলাইনের অপব্যবহারে ঝুঁকির মধ্যে আমাদের প্রিয় শিশুরা

প্রকাশিত: ১৬-০৯-২০১৯, সময়: ১৩:১৯ |
Share This

ফাতিন ইশরাক নিয়ন : সহজলভ্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে পুরো বিশ্বের মানুষ পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা করতে পারছে। শিশু-কিশোররাও এর বাইরে নয়। ক্রমবর্ধমান হারে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৮ সালের হিসাব অনুসারে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্য ৯ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ইন্টারনেটে তথ্য আদান-প্রদান, বিশ্লেষণ এবং চর্চার মাধ্যমে জ্ঞানের পথ উন্মুক্ত করে কিংবা প্রসারিত করে এটা অতীব সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, সবাই যে ইন্টারনেটের ব্যবহারের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে তা নয়, বরং এর অপব্যবহারের মাধ্যমে অনেকে নানা অপরাধ, হয়রানির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে বিশেষত নারী, শিশুরা নানা ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লীল, অপমানজনক মন্তব্য করা, অনুমতি ছাড়া কোনো মেয়ের ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, ছবি বিকৃত করে বা ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, পর্নো ছবি বা অশ্লীল কোন পোস্ট ট্যাগ করে দেওয়া, ছবি ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার বা বিকৃত করার হুমকি দিয়ে নানাভাবে যৌন হয়রানি করছে।

জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ‘বাংলাদেশের শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গেছে যে, দেশের ২৫% শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল বিশ্বে প্রবেশ করে, যাদের মধ্যে ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইনে হয়রানি, সহিংসতা, ভয়ভীতি ও নিগ্রহের শিকার হয় (০৬.০২.২০১৯, দৈনিক প্রথম আলো)। জরিপটি ১২৮১ শিশুর উপর চালানো হয়।

জরিপে আরো দেখা গেছে, ৯৪ শতাংশেরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট আছে, ৬৩% শিশু নিজের ঘরে বসে ইন্টারনেট ব্যবহার করে, ফলে তাদের ওপর অভিভাবকদের নজরদারি কম থাকে। জরিপ থেকে আরো জানা গেছে, ১৪ শতাংশ শিশু ইন্টারনেটে পরিচয় বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেছে, ১৭ শতাংশ শিশু অপরিচিতদের সাথে ভিডিওতে কথা বলেছে, ১১ শতাংশ শিশু তাদের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে বন্ধুদের জানিয়েছে, ১৬ শতাংশ শিশুর অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হয়েছে এবং ৯ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো সময় ধর্মীয় উস্কানিমূলক বার্তা পেয়েছে।

জরিপ থেকে প্রাপ্ত ফলাফল সুখবর নয়, প্রায় এক তৃতীয়াংশ শিশু অনলাইনে হয়রানি, সহিংসতা, ভয়ভীতি ও নিগ্রহের শিকার হচ্ছে; এটাতো যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো তথ্য। আমি, আমরা, আমাদের সমাজ, আমাদের রাষ্ট্র কিন্তু বিষয়টা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন তেমনটি মনে হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার কারণে, না ভাবার কারণে, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণে সমাজের অভ্যন্তরে বিশেষত শিশু সমাজের অভ্যন্তরে ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে যা হবে অপূরণীয়। কাজেই বিষয়টি নিয়ে সকলকে ভাবতে হবে এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

দিন দিন শিশুর প্রতি হিংস্রতা বাড়ছেই। চলতি বছরের (২০১৯) প্রথমার্ধে গড়ে মাসে অন্তত ৪৩টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অথচ গত বছর এই হার ছিল এর অর্ধেকের মতো। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, বিচারহীনতা, সামাজিক- পারিবারিক জটিলতা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে এমন ঘটনা বাড়ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে মোট ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৬৩০টি। দেখা যায় এদের সিংহভাগের বয়স ১৮ বছর বা তার নীচে। আর ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার কারণে শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২১টি। ধর্ষণের শিকার সবচেয়ে বেশি হয়েছে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা। ( সূত্র: ১০.০৭.২০১৯, দৈনিক প্রথম আলো)

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমরা শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তা একেবারেই নিশ্চিত করতে পারিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার, মাদকাসক্তি, শিশু-কিশোরদের আচরণগত সমস্যাকে গুরুত্ব না দেওয়ায় এমন ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। সমাজে প্রকৃত যৌনশিক্ষার অভাব রয়েছে। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

সরকার ইন্টারনেট সেবা সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করে চলেছে। এ জন্য অপব্যবহার রোধে ইন্টারনেট বন্ধ সমাধান নয়। এটা সম্ভবও নয়। কারণ কোন সাইট বন্ধ করলেও বিকল্পভাবে সেটা ব্যবহার করা যায়। তবে সরকার পর্নো সাইট নিয়ন্ত্রণে কাজ করে চলেছে। পর্নো সাইটে যাতে সহজে কেউ প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। অনলাইনে যৌন নির্যাতন রোধে এখনই কাজ করতে হবে। এর দুটি উপায় রয়েছে- একটা প্রতিরোধ এবং অন্যটি বিচার ব্যবস্থা।

প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শিশুদের প্রতি কঠোর না হয়ে তাদের মনোভাব বুঝতে হবে। তাদের ইন্টারনেটের সুফল-কুফল সম্পর্কে ধারনা দিতে হবে। মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে কাজ করতে হবে। পারিবারিক সম্পর্ক বাড়াতে হবে। পিতামাতাকে ইন্টারটের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা রাখতে হবে। শিশুরা ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভুলের শাস্তি কঠোর না হয়ে ভালোবাসায় পরিণত করতে হবে। আমরা সন্তানের ভবিষ্যত সুরক্ষিত করার জন্য চিন্তিত এবং প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। কিন্তু সেই সস্তানকেই আমরা পর্যাপ্ত সময় দেইনা। শিশুর সময় কাটানোর জন্য বা বিনোদনের জন্য আমরা অভিভাবকরা শিশুর হাতে প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছি। কিন্তু প্রযুক্তি কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, এর ভালো দিক, মন্দ দিক সম্পর্কে অবহিত না করেই শিশুর হাতে প্রযুক্তি তুলে দিচ্ছি। ফলে শিশুরা এর অপব্যবহারের শিকার হচ্ছে। সন্তান যেন একা একা ইন্টারনেট ব্যবহার না করে সে ব্যাপারে পিতামাতাকে খেয়াল রাখতে হবে। সন্তান কার সাথে অনলাইনে যুক্ত থাকছে সেটা নজরদারিতে রাখতে হবে। কোনভাবেই ১৮ বছরের আগে শিশুকে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতে দেয়া যাবেনা। শিশুর সাথে এমন সম্পর্ক গড়তে হবে যাতে কোন ধরনের হয়রানির শিকার হলে প্রথমে এবং স্বাভাবিকভাবে বাবা মায়ের কাছে বলতে পারে। সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। শিশুকে শেখাতে হবে কিভাবে অনলাইনের মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করা যায়।

পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থায়ও ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ শিশুর জন্য বন্ধুভাবাপন্ন নয়। পাঠ্য পুস্তকের বাইরে কোন কিছুই শিশুরা শিক্ষকের সাথে শেয়ার করেনা বা করার পরিবেশ নেই। পাঠ্যপুস্তকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নির্দেশিকা সংযোজন করে পাঠদানের মাধ্যমে শিশুদের সচেতন করতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ইন্টারনেটে শিক্ষামূলক কন্টেন্ট বাড়াতে হবে। কোন কোন সাইটে শিক্ষামূলক কন্টেন্ট পাওয়া যায় সে ব্যাপারে শিশুদের ওরিয়েন্টেশন দিতে হবে। বিভিন্ন মিডিয়াতে ইন্টারনেটের অপব্যবহার বিষয়ে প্রচারনা চালাতে হবে। শিশুরা যাতে কোনভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত কোন তথ্য, ছবি বা ভিডিও আপলোড না করে সে ব্যাপারে সচেতন করতে হবে।

স্থানীয় সরকার বা ইউনিয়ন পরিষদ অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। প্রতি ওয়ার্ডে ওয়ার্ড মিটিং করার সময় ইন্টারনেটের অপব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে লিফলেট তৈরি করে বিতরণ করতে পারে। আর এ কাজ বাস্তবায়নে সরকারকে সঠিক নির্দেশনা প্রদান করতে হবে।

অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও এটা প্রতিরোধ করতে হবে। যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুরা সহজে থানায় মামলা করতে পারে না। পুলিশ এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সহায়তা করেনা। অনেক সময় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নিতে চায় না। অনলাইনে শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে কোন আইনে মামলা হবে, জেরায় কেমন প্রশ্ন থাকবে তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ মামলার ক্ষেত্রে নির্যাতিতরা পুলিশের দ্বারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়। সে জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আইন বাস্তবায়নে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সাইবার অপরাধ রোধে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সংস্থার সাথে সম্পর্ক বাড়াতে হবে। যারা প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেয় তাদের বিজ্ঞাপনের একটা অংশ যাতে ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কিত হয় তা আইনের দ্বারা নিশ্চিত করতে হবে।

নির্যাতনের শিকার প্রতিকারে চালু করা হেল্প লাইনের ব্যবহার পদ্ধতি খুব সহজ নয়। এগুলো সহজ করতে হবে। একটি মাত্র নম্বরের মাধ্যমে এই সেবা চালু করতে হবে। ইন্টারনেটের পর্নোগ্রাফি নিয়ে কাজ হলেও সাইবার বুলিং নিয়ে তেমন একটা কাজ হয়নি। কিন্তু সাইবার বুলিং অনলাইনে অপরাধের অন্যতম মাধ্যম। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী সাইবার বুলিংয়ের শিকার বা জড়িত। অনেক সময় সাইবার অপরাধগুলোর পক্ষে আদালতে উপযুক্ত প্রমান হাজির করা সম্ভব হয়না। এ জন্য একটি কাঠামো প্রয়োজন যেন ইন্টারনেটের হয়রানির শিকার শিশু-কিশোররা সহজে তথ্য জানাতে পারে। পর্নো কন্টেন্টের আরেকটি বড় উৎস স্থানীয় পর্যায়ের অনিবন্ধিত ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। এরা বিভিন্নভাবে বিকল্প সার্ভারের মাধ্যমে পর্নো কন্টেন্ট ছড়িয়ে দিচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। অনলাইনে শিশুদের অপরাধ বা অপরাধের শিকার শিশুদের বিচার নিয়ে বাংলাদেশে কোনো আইনে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। শিশুদের জন্য সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন জরুরি। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংস্থা যারা অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করে তাদের সঙ্গে নিয়ে সরকারের একটি কর্মপরিকল্পনা করা প্রয়োজন যাতে আমাদের শিশুরা নিরাপদে অনলাইন জগতে প্রবেশ করে আমাদের দেশকে তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক দেশে পরিণত করতে পারে।

এ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি) উত্তরবঙ্গের রাজশাহী জেলার রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এবং চারঘাট ও গোদাগাড়ী উপজেলায় ইন্টারনেটের অপব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ বিষয়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের সমন্বয়কারীর মতে, প্রতিনিয়ত শিশুরা ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হচ্ছে। ইন্টারনেটের ঝুঁকি সম্পর্কে তার অবগত নয় এমনকি অভিভাবকরাও অবগত নন। শিশুরা নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে না জেনে বা প্রশিক্ষিত না হয়েই ইন্টারনেট জগতের সাথে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে শিশুরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে শিশুরা হয়রানির শিকার হলেও বাবা-মা’র সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে না। আমাদের অতি প্রিয় শিশুদের ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে সুরক্ষায় পিতা-মাতাকে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে হবে। বাবা-মা কে সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। শিশুদেরকে অভিযুক্ত না করে তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। পিতা-মাতা হবে শিশুরে আস্থার জায়গা। একই সাথে পিতা-মাতা, অভিভাবককেও ইন্টারনেটের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।

উপরে