২১ শে আগস্ট : অভিশপ্ত বিকেলে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশ

২১ শে আগস্ট : অভিশপ্ত বিকেলে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১-০৮-২০১৯, সময়: ১৭:০০ |
খবর > মতামত
Share This

হাবিবুল্লাহ নিক্সন : রাতের চেয়েও ঘোরতর অন্ধকার ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সকাল। ঠিক তার ৩০ বছর পর প্রখর রোদে তপ্ত দুপুরের চেয়েও উত্তপ্ত ছিল ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের বিকেল! পরিবারের সকল সদস্যদের হারিয়েও শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে পিতার অপূর্ণ ইচ্ছা পূর্ণ করতে সোনার বাংলা গড়ার অভিপ্রায়ে এদেশের শোষিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষের ভাগ্য বদলের জন্য সকল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় পিতা মুজিবের মতো তাকেও পঁচাত্তরের প্রেতাত্মারা নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিল বারংবার!

এ পর্যন্ত ১৯ বারের অধিক তাকে হত্যা চেষ্টা চালিয়েছে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিসহ পর্দার আড়ালে থাকা ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যাকারীদের রক্তের উত্তরসূরী ও দলগত অনুসারীরা। তাদের এই ঘৃণ্য চেষ্টা সফল হয়নি। মহান সৃষ্টিকর্তার অসীম কৃপা ও বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের অকৃত্রিম ভালবাসায় তিনি আজও বেঁচে আছেন, কাজ করে যাচ্ছেন আমাদের সোনার বাংলা নির্মাণে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে সারাদেশে জঙ্গিদের বোমা হামলা এবং গোপালগঞ্জে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে ২০১৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেই সমাবেশে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ শেষ করেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মঞ্চ লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয় গ্রেনেড। মাত্র এক থেকে দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। গ্রেনেড ছুঁড়েই শান্ত হয়নি নরপিশাচরা, শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য তার গাড়িতেও একের পর এক বৃষ্টির মত গুলি চালানো হয়। তৎক্ষনাৎ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজ জীবন তুচ্ছ জ্ঞান করে মানব ঢাল তৈরি করে প্রাণ বাঁচান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার। সেই সময়ে শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন পাঁচ শতাধিক মানুষ।

ভয়াবহ এ গ্রেনেড হামলার পরদিন ২২ আগস্ট একটি মামলা দায়ের হয়। মামলাটি প্রথমে তদন্ত শুরু করে থানা পুলিশ। এরপরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হয়ে তদন্তের দায়িত্ব গড়ায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের হাতে। অপরদিকে ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচারপতি মোঃ জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করার নামে প্রহসন করে সরকার। মাত্র এক মাস ১০ দিনের মাথায় একই বছরের ২ অক্টোবর কমিশন সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার নামে মাত্র তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। যার বেশিরভাগ তথ্যেরই ছিল না কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র।

লোমহর্ষক সেই গ্রেনেড হামলার ঘটনা ধামাচাপা, ভিন্ন খাতে প্রবাহিত ও আলামত নষ্টসহ এহেন কোন কাজ নেই যা করেনি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। ভয়াবহ এ হামলার নেপথ্য নায়কদের আড়াল করতে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় এই মামলার তদন্তে চলে সর্ব্বোচ্চ রকম নোংরামি। মঞ্চস্থ করা হয় জজ মিয়া নাটক। হামলার মূল হোতা ও নকশাকারীদের বাঁচাতে নানা নিগৃহীত কাজ করে তৎকালীন বিএনপি-জামাত সরকার।

পরে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলাটির তদন্ত শুরু হয় ২০০৮ সালের ১১ জুন তদন্ত রিপোর্টে নিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল-জিহাদ-আল-ইসলাম নেতা মুফতি আবদুল হান্নান এবং তৎকালীন বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর নাম আসে। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রপক্ষের অধিকতর তদন্তে আবেদনে ২০১১ সালে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপি’র অন্যতম শীর্ষ নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরসহ ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেয়া হয়।

দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর নারকীয় সেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন এবং বাকি ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়।

২১শে আগস্টের ষড়যন্ত্রকারীরা সেদিন যদি সফল হতো পাল্টে যেত এই বাংলাদেশের ইতিহাস! ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত ও ২ লক্ষ মা-বোনেরা ইজ্জতের দামে কেনা এই বাংলাদেশের পবিত্র ভূমিতে লাল সবুজের পতাকাবাহী গাড়িতে চড়ে বেড়াতো স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি, যুদ্ধাপরাধী নিজামী, মুজাহিদ, দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মত স্বীকৃত রাজাকাররা। গণতন্ত্রের চর্চা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকত না। বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে চলত বোমা হামলা, গ্রেনেড বিস্ফোরণের মহা উৎসব। সবুজ বাংলাদেশ রক্তে রঞ্জিত হত প্রতিনিয়ত! বাংলা ভাই, শায়েখ আবদুর রহমানের মতো জঙ্গীদের নেতৃত্বে চলতো হত্যা, খুন, ধর্ষণ ও একের পর এক নৃশংস বোমা হামলা। চারদলীয় জোট সরকারের ছায়ায় বিএনপির-জামাত এর আর্থিক ও প্রশাসনিক মদদে স্বাধীনতাবিরোধী, উগ্রবাদী, মৌলবাদী, জঙ্গী সংগঠন ত্রাসের রাজত্ব কায়েক করে বেড়াতো।

বিএনপি-জামাতের জোট সরকারের আমলে দুর্নীতিতে টানা ৫ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া দেশটা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারতো না। সারাবিশ্বের কাছে এইদেশ দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী ও জঙ্গী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেত।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট যা ঘটেছিল তা মনে করলেও শরীর শিউরে ওঠে। যন্ত্রণাদগ্ধ হয়ে যায় বিবেক। সে ঘটনায় পুরো জাতির বিবেকই স্প্লিন্টারবিদ্ধ হয়েছিল। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ছত্রছায়ায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সন্তান তারেক রহমান ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদের হাওয়া ভবনে করা নীল নকশায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর সহযোগিতায় স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকে নির্মূল করার জন্য সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ও ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলা। ২১ আগস্টের আঘাতে আমাদের হৃদয় এখনো ক্ষতবিক্ষত। এই ঘটনার বিচারপ্রক্রিয়া এবং রায় জাতির ওপরে চেপে বসা ইতিহাসের দায় শোধ করে ইতিহাসের কলঙ্ক মোচনের একটা প্রয়াস।

রক্তস্রোত-মৃত্যুর নারকীয় সেই গ্রেনেড হামলার ১৫ তম বার্ষিকী আজ। ২১ শে আগস্ট দেশরত্ন শেখ হাসিনা ও মৃত্যুর দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড! সেইদিন নিজ দলের কর্মীরা জীবনকে তুচ্ছ করে শেখ হাসিনার জীবন রক্ষা করেছিলেন। কারণ সেইসব নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করতেন, ‘শেখ হাসিনা যদি না বাঁচে, বাংলাদেশও বাঁচবে না।’ আজ ২০১৯ সালে এসে আমরা প্রকৃত অর্থেই প্রমাণ পাচ্ছি সেদিন মহান আল্লাহর কৃপায় শেখ হাসিনার দৈবক্রমে বেঁচে যাওয়া ছিল ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পাওয়া বাংলাদেশের পুনরায় জীবন পাওয়া।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে আকুল আবেদন ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমানসহ অপর দন্ডিত আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আইনি প্রক্রিয়ার রায় কার্যকর করার ব্যবস্থা করুন। এদেশ থেকে হত্যা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের চির অবসান ঘটুক এবং আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হোক। বিশ্বের বুকে জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হোক উন্নত, সমৃদ্ধ, সুখ ও শান্তির দেশ।

লেখক:
সহ-সভাপতি,
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

উপরে