পিতা মুজিব ও তাঁর মূল্যায়ন

পিতা মুজিব ও তাঁর মূল্যায়ন

প্রকাশিত: ১৯-০৮-২০১৯, সময়: ১৪:৩১ |
খবর > মতামত
Share This

মামুন-অর-রশিদ : বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া বাংলাদেশ ভাবা যায় না। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কম নেতাই স্বরণীয় হয়ে আছেন। ইতিহাসের মহানায়ক শেখ মুজিব তাঁর জীবদ্দশায় যে ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন তা বিরল। তিনি শিক্ষাদীক্ষাহীন ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করে রাজনীতি সচেতন হয়ে দেশের স্বাধীনতা নিয়ে ভাবার মত দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন।বঙ্গবন্ধু উত্তরাধিকার থেকে যে সম্পত্তি পেয়েছিলেন তা তাঁর জীবন পরিচালনার জন্য যথেষ্ট ছিলো। কিন্তু তিনি নিজের কথা না ভেবে পরাধীন দেশের মানুষ কিভাবে স্বাধীনতার মুখ দেখতে পাবে তা নিয়ে তাঁর ভাবনার অন্ত ছিলো না। প্রতিবাদী মুজিব অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে সবসময় অবস্থান নিয়েছিলেন। অনলবর্ষী বক্তৃতা দিয়ে জনসাধারণকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করতো। ‘ক্যারিশম্যাটিক লিডার’ হিসেবে খ্যাত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনদর্শন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে,পাকিস্তানি শোষকদের দমন পীড়নের চরম পর্যায়েও তিনি নেতাকর্মীদের আশ্রয়ের একমাত্র জায়গা ছিলেন।

স্বল্প জীবনে প্রায় ১৪ টি বছর কারাগারে কাটিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত কারনে তিনি কখনও কারাবরণ করেননি।উল্লেখ যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের যৌক্তিক আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশের কারনেও তাকে কারাভোগ করতে হয়েছিলো। জনপ্রিয় নেতাকে জেলে রাখাকে জনগণ মেনে নিতে পারেনি। পাকিস্তানি সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে জেলে আটকে রাখলে জনগণ রাজপথে নেমে শ্লোগান দেয়”জেলের তালা ভাঙবো,শেখ মুজিবকে আনবো”। অসাম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধু কখনই সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেননি। সমমনাদের সাথে বিভিন্ন সময় মতানৈক্য দেখা দিলে তিনি জনগণের পক্ষ নিয়ে বলতেন”জনগণ চলেছে পায়ে হেঁটে,আর আপনারা আদর্শ নিয়ে উড়োজাহাজে চলছেন। জনগণ আপনাদের কথা বুঝতেও পারবেনা, আর সাথেও চলবে না।যতটুকু হজম করতে পারে ততটুকু জনগণের কাছে পেশ করা উচিত।”

বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি জাতির পিতা বলার সার্থকতা হলো,ঐতিহাসিক ৭ ই মার্চের ঘোষণায় তিনি বলেছিলেন”আমি প্রধানমন্ত্রীত্ত্ব চাই না, এদেশের মানুষের অধিকার চাই”। পাকিস্তানি সরকার বঙ্গবন্ধুকে মন্ত্রীত্ত্ব দিতে চেয়েছিলো কিন্তু তিনি জানতেন তাঁর উদ্দেশ্য সফল হলেও বাঙালী পরাধীন থেকে যাবে। যা তাঁর সারা জীবনের বাসনা ব্যর্থ হবে।

বাংলাদেশেরর এমন কোন আন্দোলন সংগ্রাম নেই, যে আন্দোলন সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর অবদান ছিলো না। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন ও একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের ডাক জাতির পিতাই দিয়েছিলেন। সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে,একটি দেশের স্বাধীনতার বীজ বপন করা থেকে শুরু করে চূড়ান্তভাবে ফললাভের আগ পর্যন্ত যার নেতৃত্ব ছিলো,তাকে অবলীলাক্রমে জাতির পিতা বলা যায়।এ উপাধি শুধু বঙ্গবন্ধুর জন্যই প্রযোজ্য।

পাকিস্তান সৃষ্টিরর পর থেকে মুসলিম লীগ নেতারা ধর্মের আফিম খাওয়ানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারিনি। ধর্মের নামে হত্যা,শোষন, বৈষম্য চলমান ছিলো। এ কারনে পাকিস্তান রাষ্ট্র টিকেনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট ছিলো একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। সেনাবাহিনীর একটি ক্ষমতালোভী চক্র খন্দকার মোশতাককে প্রলোভন দেখিয়ে কার্যসিদ্ধি করে পরবর্তীতে তাঁকে সরিয়ে দেয়। শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, তাঁর পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করাই ছিলো ষড়যন্ত্রকারীদের মূল উদ্দেশ্য। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, আত্মীয়সহ ১৭ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর যে শরীরে পাকিস্তানি সরকার স্পর্শ করার সাহস পায়নি, সেই শরীরে বাঙালীরা পাকিস্তান ও আমেরিকার সহায়তায় ১৮ টি বুলেটবিদ্ধ করেছিলো। এ বুলেট শুধু বঙ্গবন্ধুর শরীরে বিদ্ধ হয়নি,হয়েছিলো বাংলাদেশের মানচিত্রে,বাংলাদেশের সংবিধানে। পাকিস্তানি ভাবাদর্শে দীক্ষিত ঘাপটি মেরে থাকা পুরনো শকুনদের উদ্দেশ্য সাময়িক সফল হয়েছিলো।

বঙ্গবন্ধুর লাশ সেদিন ঢাকা শহরে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। রাতের আধারে হেলিকপ্টারে করে গোপালগঞ্জে নেওয়া হয়েছিলো। শুধু হত্যাকান্ড নয়,তার লাশ যেভাবে দাফন-কাফন করা হয়েছিলো তা ছিলো জাতির জন্য কলঙ্কজনক। যে পিতা তার সারাটি জীবন একটি জাতির জন্য জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর সময় প্রাপ্য সম্মান টুকুও দিতে পারিনি।

হে পিতা আমরা লজ্জিত।
আমাদের ক্ষমা করো।শোকাবহ আগস্টে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক:
সাধারণ সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও
শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

উপরে