বিপদ ঘাড়ে নি:শ্বাস ফেলছে

বিপদ ঘাড়ে নি:শ্বাস ফেলছে

প্রকাশিত: ০৬-০৭-২০১৯, সময়: ২১:৫৪ |
খবর > মতামত
Share This

ইলিয়াস আরাফাত : বরগুনা শহরে দিনে-দুপুরে স্ত্রীর সামনে রিফাত হোসেন নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি বেশ আলোচিত। রিফাত হোসেনকে কয়েকজন সন্ত্রাসী হাঁসুয়া দিয়ে কোপাচ্ছে আর কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখেছে মানুষ। চোখের সামনে কোপানো হয়েছে রিফাতকে। মানুষ এগিয়ে আসেনি। খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল ৭ থেকে ৮ জন। আর আশেপাশেই ছিল আরো অন্তত ১০০ মানুষ। পাশের কলেজের ছাদ থেকেও অনেক দাঁড়িয়ে দেখেছে। মোবাইল ফোনে ছবি তুলেছে। কিন্তু কেউ প্রতিরোধের চেষ্টা করেনি।

রিফাত শরীফের সঙ্গে থাকা স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নি সন্ত্রাসীদের থামানোর চেষ্টা করেছেন। সে সময় আশেপাশের মানুষের প্রতি চিৎকার দিয়ে আহ্বানও করেছেন এগিয়ে আসার জন্য। জাগেনি কারো মন।

বহু মানুষের চোখের সামনে দিনে দুপুর এমন একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে গেলেও কেন মানুষজন প্রতিরোধের চেষ্টা করলো না? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই। প্রশ্নটা আদালতেরও। রিফাত হত্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের নিরবতা নিয়ে আদালতও প্রশ্ন তুলে বলেছেন, প্রকাশ্যে এভাবে কুপিয়ে হত্যা করল, অথচ স্ত্রী ছাড়া তাকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসলে না। সবাই পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল আর ভিডিও করল। এটা আমাদের জনগণের ব্যর্থতা। দেশের মানুষ তো এমন ছিল না। সামাজিকতা এখন কোথায় দাঁড়িয়েছে? রিফাতকে বাঁচাতে মানুষ এগিয়ে আসেনি কেন? প্রতিরোধ করার চেষ্টা কেন করেননি?

এতো গেল হত্যার মতো ঘটনা। মানুষ এখন আর ছোট ছোট অন্যায়ের ঘটনাগুলোতেও এগিয়ে আসে না। আশেপাশে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা বলি। বাবা-ছেলে পুকুরের লিজের টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে কয়েকজন হামলাকারি তাদের উপরে হামলা করে।

হামলাকারিরা তাদের কাছ থেকে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেয়। এরপরে তাদের সঙ্গে থাকা চার লাখ টাকাও ছিনিয়ে নেয়। শুধু তাই না, হামলাকারিরা বাবা-ছেলের মধ্যে ছেলেকে অটোরিকশায় তুলে নিয়ে অপহরণের চেষ্টা করে। কিছু পথ যাওয়ার পরে ছেলেটি অটোরিকশা থেকে লাফিয়ে প্রাণে রক্ষা পায়। এ ঘটনাটি ঘটেছে একটি হাটের মধ্যে। হাটে অনেক মানুষ। সেখানেও বাবা-ছেলের সহযোগিতায় মানুষ এগিয়ে আসেনি। প্রতিরোধ করার চেষ্টা কেন। কিন্তু কেন?

হয় তো উত্তর তো একটাই। সাহস। সাহস হয়নি তাই এগিয়ে আসেনি। মানুষের মধ্যে থেকে প্রতিবাদের ভাষা, প্রতিরোধের শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। তাহলে সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? প্রশ্নটা করার মনে হয় সময় পার হয়ে গেছে। আমাদের সামাজিক অবস্থা মোটেও ভালো নেই। অন্তত আশেপাশের ঘটনাগুলো তারই কথা বলে।

সমাজকে আপনি শরীরের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। আপনি যদি শরীরের ভেতরে প্রতিরোধ শক্তি গড়ে না তোলেন তাহলে বিপদ। বাহির থেকে নানান ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস আপনার শরীরে আক্রমন করবে। আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন।

সমাজটাও তেমন। সমাজে বসবাস করা মানুষগুলো যদি প্রতিরোধের শক্তি ও প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলে তাহলে দুর্বৃত্তায়ন ঘিরে ধরবে। যেটার কবলে আমাদের সমাজ এখন পড়ে আছে।

দুর্বৃত্তায়ন ঘিরে ধরেছে বলেই আমরা ক্রমশ ভীত হয়ে পড়ছি। আমাদের মধ্যে থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নাগরিক বোধ। দুর্বৃত্ত নামের দানব সামাজিক অধিকারগুলো গিলে খাচ্ছ। মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে। আর হারিয়ে ফেলছে প্রতিবাদের শক্তি। আর ধীরে ধীরে সমাজে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করছে সন্ত্রাস। অবকাঠামো দিক দিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মানবিক বিষয়ক আমাদের ভাণ্ডার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

মানুষ যদি কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তাহলে দেখা যায় বিপদের শেষ নেই। এমন এক প্রতিবাদের নাম ছিল নুসরাত। মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়ানোর মতো মানুষের নাম ছিল নুসরাত। আর তাই তো নির্মম নির্যাতনের শিকার নুসরাত জাহানকে আগুনে পুড়ে প্রাণ দিতে হলো।

নুসরাত প্রতিবাদী হয়ে উঠলেও সমাজ, প্রশাসন, রাজনীতি কোন ক্ষেত্র থেকেই সে সহযোগিতা পাননি। আর তাই তো নুসরাতকে পুড়তে হয়েছে আগুনে। শুধু নুসরাত না। এমন সহযোগিতা এখন আর কেউ পায় না। সমাজের আসল চিত্রটাই এমন। আর তাই তো মানুষ প্রতিবাদকে এখন বিপদ মনে করে। সবার মধ্যে গা ছাড়া ভাব। সমাজ যেমন চলছে চলুক। নিজে ভালো থাকলেই হলো।

মানুষ বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার হয়ে গেছে। মনের সংবেদনশীলতা ও মূল্যবোধের অভাবের কারণেই এমনটা হযেছে। আমরা কেউ একজন আরেকজনের সাহায্যে এগিয়ে আসছি না। মানবতাবোধ আমাদের কমে গেছে।

এভাবে কি কেউ ভালো ভাবে বাঁচতে পারে? কখনোই না। যে বিপদ দেখেও আমরা চুপ করে থাকি সে বিপদ আপনার দরজায় আসতে কতোক্ষণ? যখন আপনার কেউ নুসরাতের মতো পুড়বে, রিফাতের মতো জখম হয়ে মরবে? তখন কি করবেন? সে দিনও হয় তো বেশি দুরে নেই।

জঙ্গল থেকে কোন পশু এসে তো আমাদের সমাজে হামলা করে না। মানুষই সমাজ নষ্ট করে। এর জন্য আমাদের সমাজের গুটি কয়েক মানুষই দায়ী। এই অল্প সংখ্যক মানুষের জন্য আমাদের সোনার বাংলা শেষ হতে পারে না।

প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করাটা আজ ভিষণ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সবাইকে আরো বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। প্রতিবাদকারীর পাশে দাঁড়াতে হবে। যদি দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম বুকে নিয়ে সব শ্রেণিপেশার মানুষ কাজ করতে হবে। তবেই না আমাদের বেঁচে থাকা সম্ভব।

লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক ও গল্পকার

উপরে