প্রসঙ্গ: অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন

প্রসঙ্গ: অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন

প্রকাশিত: ০৪-০৭-২০১৯, সময়: ২২:৪৬ |
খবর > মতামত
Share This

সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী জালাল উদ্দিন উজ্জল

এ্যাডভোকেট মো: জালাল উদ্দিন উজ্জল : বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষি হচ্ছে এই দেশের এক তৃতীয়াংশ আয়ের উৎস এবং দুই তৃতীয়াংশ মানুষের জীবিকার অবলম্বন। তাই বাংলাদেশের ভূমি সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। ভূমি হচ্ছে মৌলিক প্রাকৃতিক সম্পদ যা মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী, শিল্প পণ্য, ভোগ বিলাস, স্বাস্থ্য রক্ষার উপকরন ইত্যাদি সব কিছুর উৎস। তাই ভূমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা ও যথেচ্ছ ব্যবহার প্রতিরোধ করা আমাদের একান্ত দায়িত্ব। জাতীয় কৃষি নীতিতে ফসল উৎপাদনের জন্য জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের লক্ষ্যে যে সব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে সেগুলো যথাযথ ভাবে বাস্তবায়ন করা অতি জরুরী। উর্বর কৃষি জমি যেখানে বর্তমানে দুই বা ততোধিক ফসল ফলে বা এমন জমি যা এরুপ ফসল উৎপাদনের জন্য সম্ভাবনাময় তা কোন ভাবে নষ্ট ও ধ্বংস করা উচিত নয়। জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা মতে কৃষি জমি ব্যক্তিমালিকানা সম্পত্তি হলেও এর ব্যবহার সার্বিক জাতীয় ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তার সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ রাখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকই ক্ষুদ্র প্রান্তিক। এর একটি বিরাট অংশ বর্গা চাষী। এসব ক্ষুদ্র প্রান্তিক চাষীদের স্বার্থ সংরক্ষন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ভূমির ব্যবহার এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে এরা ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। তাই ভূমির ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা অনুসরন করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কারন ইহাতে পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছে কৃষি জমি যতটুকু সম্ভব কৃষি কাজে ব্যবহার করতে হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া জমির প্রকৃতগত পরিবর্তন আনা সম্পূর্ন নিষেধ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইহার দৃশ্য বিপরীত।

বিশেষ করে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলার ১৫টি উপজেলায় সেখানে বিন্দু মাত্রা মান্য করা হয় না সরকারের জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালার নির্দেশনা। ফলে ইতিমধ্যেই ঐ সকল জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার হেক্টর আবাদি কৃষি জমি এবং নিধন হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির বনজ ও ফলজ অসংখ্য বৃক্ষাদির বাগান। এই বিষয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পত্র-পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে সংবাদ পরিবেশন হওয়ায়, একটি মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন ল’ইয়াস সোসাইটি ফর ‘ল’ ইহাতে দৃষ্টিভুত হয়ে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলার যেমন বাগমারা, দূর্গাপুর, পুঠিয়া, মোহনপুর, পবা, গোদাগাড়ী, নাটোর সদর, নলডাঙ্গা, বাগাতিপাড়া, গুরুদাসপুর, সিংড়া, পাবনা সদর, ঈশ্বরদী, সুজানগর ও আটগড়িয়া উপজেলার আবাদি কৃষি জমিতে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে উক্ত সোসাইটি স্ব-প্রনোদিত হয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে ৪৩৫৩/২০১৭, ১৮০১/২০১৯ এবং ২৪৭৬/২০১৯ নং রীট পিটিশন দায়ের করলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ শুনানীনান্তে উল্লেখিত উপজেলা গুলোতে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে সংশ্লিষ্ট বিবাদীগণের প্রতি রুলনীশি জারী করতঃ উহা বন্ধে মনিটর ও তাৎক্ষনিক জরুরী পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের উক্ত আদেশ সংশ্লিষ্ট বিবাদীগণের প্রতি যথারীতি জারী হয়েছে। কিন্তু আদালতের আদেশ কার্যকর ও বলবৎ থাকা স্বত্ত্বেও ঐ সকল উপজেলা গুলোতে অবৈধ পুকুর খননকারীরা নানা উপায়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ব্যাপক হারে অবৈধ পুকুর খনন করেছেন এবং এখনও তাদের ঐ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু আদালতের আদেশ মতে তা কোনভাবেই কাম্য নয়। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের প্রদত্ত আদেশ সংশ্লিষ্ট বিবাদীগণের প্রতি বাধ্যকর হওয়া স্বত্তেও ঐ সকল উপজেলাগুলোর মধ্যে অধিকাংশ উপজেলায় বাস্তব ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা নানা গড়িমশি পর্যবেক্ষন করেছি। আমরা ল’ইয়াস সোসাইটি ফর ‘ল’ এর পক্ষে অবৈধ পুকুর খনন বিষয়ে উল্লেখিত উপজেলার প্রশাসনদের নানাভাবে তথ্য উপাত্ত প্রদান করে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের জন্য মৌখিক ও লিখিতভাবে অনেকবার বিভিন্ন সময়ে অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু আদালতের আদেশ মতে উক্ত উপজেলায় অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে মনিটর করার নির্দেশ সংশ্লিষ্ট বিবাদীগনের প্রতি থাকা স্বত্তেও ২/১ টি উপজেলা ব্যতিত প্রকৃত পক্ষে অন্যান্য উপজেলায় যথাযথ মনিটর না থাকার কারনে বর্তমানেও ঐ সকল উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের আবাদি কৃষি জমিতে কিছু সংখ্যক অবৈধ পুকুর খনন অব্যাহত রয়েছে। বিগত ২০১৭ ইং থেকে অদ্যবধি পর্যন্ত অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে আমাদের। কোন কোন উপজেলায় আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে সন্তুষজনক কাজ হলেও আবার কিছু কিছু উপজেলায় কোন কোন স্থানে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে আদালতের আদেশ যথারীতি বাস্তবায়ন হয় নাই।

এছাড়াও কিছু কিছু স্থানে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে আমাদের ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছে এবং বর্তমানে হচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহী জেলার ৬টি উপজেলার মধ্যে অধিকাংশ উপজেলায় পূববর্তী জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মহোদয়গণের আইনগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ঐ সকল উপজেলায় অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ করায় ২/১ জন উপজেলা নির্বাহী মহোদয় আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট নয়। আসলেই বাস্তবিকভাবেই আমরা কেউ কারো প্রতিদ্বন্ধি নই। সবার প্রচেষ্টায় আবাদি কৃষি জমিতে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে আমরা সবাই আন্তরিক থাকতে চাই। প্রকৃত পক্ষে অবৈধ পুকুর খননের মত এই মারাত্মক মহামারী রোগ প্রতিরোধ কল্পে সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা একান্ত প্রয়োজন। যে কারনে বাংলাদেশের মানুষ আমাদের আইনের প্রতি আরোও শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্চনীয়। তাছাড়া এইক্ষেত্রে আইনের শাসন বাস্তবায়ন করা মোটেও সম্ভব নয়। নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে অনেকাংশে সাফল্য হলেও এই অর্জন কার্যত সময় সময় রাতের আধাঁরে হারিয়ে যাচ্ছে।

ল’ইয়াস সোসাইটি ফর ‘ল’ এই ক্ষেত্রে আশা করেন, উক্ত উপজেলাগুলোর দায়িত্ববান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ দেশের আইন আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ঐ সকল উপজেলায় বর্তমান স্থিতিবান আবাদি কৃষি জমি রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের প্রনয়নকৃত জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা ও মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের প্রদত্ত আদেশ প্রতিপালনে সকলেই কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। ল’ইয়াস সোসাইটি ফর ল একটি স্বেচ্চাসেবী মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন। ইহার মহাসচিব জনাব এ্যাডভোকেট মোঃ মেজবাহুল ইসলাম (আসিফ) তিনি জনস্বার্থে মানবাধিকার ও পরিবেশ বিষয় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে দীর্ঘদিন দরে কাজ করে আসছেন।

ইতিমধ্যে তিনি রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলায় কৃষি জমিতে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ করা ছাড়াও পাবনা জেলায় লাইসেন্স বিহীন অবৈধভাবে চালিত করাত কল বন্ধে, রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় লাইসেন্স বিহীন অবৈধভাবে পরিচালিত বেসরকারী হাসপাতাল বন্ধে, পাবনা মানসিক হাসপাতালে বর্তমানে সুস্থ্য ২৩ জন মানুষকে হাসপাতাল থেকে মুক্ত করার জন্য, রাজশাহী ও পাবনা জেলায় অবৈধভাবে পরিচালিত ইট ভাটা বন্ধে, মানব দেহে এনার্জি বিষয়ক ক্ষতিকারক উপাদান উৎপাদন ও বাজারজাত করন বন্ধে এবং পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলার মধ্যে প্রবাহিত পদ্মা নদীর উভয় পশ্বেও ভুখন্ড সংশ্লিষ্ট জেলার সহিত সংযুক্ত করে ঐ এলাকায় বসবাসরত মানুষের নাগরিক ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ইত্যাদি বিষয়ে মহামন্য হাইকোর্ট বিভাগে রীট পিটিশন দায়ের করেছেন। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ শুনানীনান্তে উক্ত উল্লেখিত অধিকাংশ বিষয়ে অর্ন্তবতি আদেশ প্রদান করেছেন যা যথারীতি কার্যকর হচ্ছে। এছাড়াও ল’ইয়াস সোসাইটি ফর ‘ল’ মানবাধিকার ও পরিবেশ বিষয়ক আরো কিছু বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কাজ করছেন।

লেখক- এ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সদস্য ল’ইয়াস সোসাইটি ফর ‘ল’, বাংলাদেশ

উপরে