প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময় কমানো জরুরি

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময় কমানো জরুরি

প্রকাশিত: ১৫-০৬-২০১৯, সময়: ২১:৪১ |
খবর > মতামত
Share This

ইলিয়াস আরাফাত : প্রসঙ্গটা, বলা যায় পুরানো। এরমধ্যেই অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে। তবে সমস্যাটা বেশ গুরত্বর। এ জটিলতার প্রভাব ধিরে ধিরে পড়ছে আমাদের পরিবার, সমাজ থেকে শুরু করে পুরো দেশের উপরে। তাই বিষয়টি নিয়ে বারবার কথা বলা প্রয়োজন। আমরা অনেকটা চোখ খুলেই শিশুদের উপরে নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছি। নষ্ট করছি তাদের শৈশব, মানসিক বিকাশ। এতে আমরা সুন্থ হিসেবে কাউকেই আগামীর জন্য তৈরি করতে পারছে না।

আমাদের দেশে শিশুরা সবচেয়ে বেশি মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। একেবারে দীর্ঘ সময় তাদের থাকতে হয় বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের সময়সূচি সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। একেবারে সাড় ৭ ঘণ্টা। একবার নিজেকে নিয়ে ভেবে দেখি তো। আমাদের কাউকে যদি একটি বাড়ির মধ্যে সাড়ে ৭ ঘণ্টা বন্ধ করে রাখা হয়, আমরা কতোদিন সুস্থ থাকতে পারবো? অথচ কোমলমতি শিশুরা দীর্ঘ ৫টি বছর বিদ্যালয়ে এভাবে বন্দি অবস্থায় তাদের জীবন কাটায়।

এতো গেলো শুধু বিদ্যালয়ের সময়সূচি। এর উপরেও একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে আসতে ও বাড়ি ফিরে যেতে আরো দুই ঘণ্টা সময় লাগে। তাহলে একটি শিশুর বিদ্যালয়ে আসার কার্যক্রম শুরু হয় সকাল ৮টায় আর শেষ হয় বিকেল সাড়ে ৫টায়। বিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থানের বিষয়টি শিশুর মানসিক নির্যাতনের মধ্যে পড়ে বলে অনেকেই অভিমত দেন। শিশুরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে দীর্ঘ সময় পাঠ গ্রহনের পরে আর কোনকিছু করার মতো মানসিক ও শারীরিক শক্তি থাকে কি না তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।

শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক মনে করেন, দীর্ঘ সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর জন্য কোনভাবেই উপযোগী নয়। কারণ, দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে থাকলে শিক্ষার্থীর খিদে পায়, শরীর দুর্বল হয়, পড়া মনে থাকে না, মানসিকভাবে শক্তি হারিয়ে ফেলে।

এবার শহর অঞ্চলের চিত্র তুলে ধরি। শহরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুরা লেখাপড়া করে। অনেক বিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংকটেও আছে। এর অন্যতম কারণে বিদ্যালয়ের দীর্ঘ সময়। সচেতন অভিভাবকরা সবাই জানেন, একজন শিশু দীর্ঘক্ষণ বিদ্যালয়ে থাকলে সে মানসিকভাবে শেষ হয়ে যাবে।

শহরের যারা ধনী শ্রেণির মানুষ তাদের শিশুরা নামিদামি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ে। ইদানীং মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও কিন্ডারগার্টেনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

কেন এমন হচ্ছে? একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকের চেয়ে অনেক ভালো মানের শিক্ষক প্রাথমিকে আছে। যাদের কাছ থেকে শিশুরা আরো ভালো লেখাপড়া করতে পারবে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা ওই এক জায়গায়। তা হলো সময়। শহরে যেসব কিন্ডারগার্টেন, বিদেশি স্কুল, ব্যক্তি উদ্যোগে চলা বিদ্যালয়গুলো আছে সেগুলো ছুটি হয়ে যায় দুপুরে। বেশিরভাগের সময়সীমা সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা। ওইসব শিশুরা বিদ্যালয় ছুটির পরে বাড়ি ফিরে খেয়ে, রেস্ট নিয়ে বিকেলে খেলতে যেতে পারে। তারা যখন খেলা শেষে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেয় তখন একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিশুকে বইয়ের ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরতে দেখা যায়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুরা ছোটবেলায় বেশি চাপে থাকলে তারা বড় হয়ে বাস্তব পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপ মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়ে। তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে? আমরা নিজ হাতে শিশুদের মানসিক বিকাশ নষ্ট করছি।

আশেপাশের রাষ্ট্র থেকে শুরু করে উন্নত অনেক রাষ্ট্রের কোনোটিতেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের কৌশল ও সময়সূচি আমাদের দেশের মতো এত দীর্ঘ নয়। আমাদের দেশের দিকেই চোখ ফেরাই। প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া শিক্ষার অন্যান্য স্তরের সময়সূচি কিন্তু দীর্ঘ নয়। বয়সে বড় শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সময়সূচী অনেক কম। তাহলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সময়সীমা এতো বেশি কেনো?

এতো গেলো যারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে সেসব শিশুদের কথা। এবার শিক্ষকদের কথা বলি। সময়সীমা যেহেতু সাড়ে ৭ ঘণ্টা তাই শিক্ষকদের স্কুলে ওই সময়ই থাকতে হয়। কথা বলতে হয় দীর্ঘ সময়। এক ধরনের মানসিক চাপ শিক্ষকদের উপরেও পড়ে ব্যাপকভাবে। প্রাইমারীতে নারী শিক্ষকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। মায়ের মতো মমতা ও স্নেহ দিয়ে শিশুদের শিক্ষাদানে সহযোগিতা করেন তারা। দীর্ঘক্ষণ ক্লাসে থেকে তারাও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বাড়ি ফিরে আর অন্যকিছু করার শক্তিটুকুও তার থাকে না। তারা নিজ সন্তানকেই ঠিকমতো সময় দিতে পারেন না। সেসব শিশুগুলোও বঞ্চিত হয় মা-বাবার কাছ থেকে খুব মূল্যবান সময়গুলো থেকে। এই বঞ্চনা শিশুদের মানসিক সমস্যার কারণ হয়।

শিশুর মানসিক বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। শিশুদের ভয়ভীতির মাধ্যমে পাঠদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, আনন্দঘণ পরিবেশে পাঠাদান। এ সবকিছুই শিশুর মানসিক বিকাশের দিকে লক্ষ রেখে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। কিন্তু আসল জায়গাটি নিয়ে দেখেও সবাই যেনো না দেখার ভান করে থাকেন। তা হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের সময় কমিয়ে আনা। এমন না হলে সব ভালো প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যাবে বলে মনে করি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিশুদের উপরে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের বিষয়টির কঠোর বিরোধিতা করেন। এমনকি শিশুকে কতটুকু ভয়মুক্ত রাখা যায় সে ব্যাপারে তিনি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। অনেক দিন থেকেই প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে শিশুকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে হতো। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সে বিষয়টি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে থেকে কোন শিশু বা শিক্ষকই মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারে না। শিশুরা কি মানসিকভাবে এ চাপ বয়ে বেড়াতে সক্ষম? লাখ লাখ শিশুর মানসিক বিকাশ আমরা নিজ হাতে হত্যা করছি। বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেনও বিদ্যালয়ের সময় কমিয়ে আনার বিষয়ে কথা বলছেন প্রায়। তার কথায় বিদ্যালয়গুলোর সময়সীমা কমানোর বিষয়টি নিয়ে তারা আলোচনা করছেন। বিষয়টিকে আরো গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। সোনার বাংলাদেশ গড়তে আমাদের অবশ্যই মানসিকভাবে সুস্থ শিশু প্রয়োজন। তাই, প্রাথমিকের সময়টা কমিয়ে আনাটা অতি জরুরিভাবে করা প্রয়োজন।

লেখক- ইলিয়াস আরাফাত, শিক্ষক ও গল্পকার, উপশহর, বোয়ালিয়া, রাজশাহী

উপরে