শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

প্রকাশিত: ১২-০৬-২০১৯, সময়: ১৯:৪৪ |
খবর > মতামত
Share This

অতিসম্প্রতি“এসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট , রাজশাহী” এর আয়োজেনে ইউসুফপুর ডিগ্রি কলেজ চারঘাট, রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হলো‘অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধ’ বিষয়ক মতবিনিময় সভা।সভায় অনলাইনে শিশু নির্যাতনের মাধ্যম, অনলাইনে শিশু নির্যাতনের ধরন, আইনি বিধান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ তে অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতনের প্রতিকার পেতে কী কী ঘাটতি রয়েছে তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। উল্লেখিত মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করে আমি অনলাইনে শিশু যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধ বিষয়ে অবগত হয়েছি এবং বিষয়টি আমার মনকে নাড়া দেয়। আমার মনে হয় শিক্ষক হিসেবে শুধু পাঠদান করাই আমাদের একমাত্র কাজ নয়। শিশুরা কিভাবে নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে সেটা নিশ্চিত করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সে তাড়না থেকেই আজকের এ লেখার প্রয়াস।

জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ‘বাংলাদেশের শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গেছে যে, দেশের ২৫% শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল বিশ্বে প্রবেশ করে , যাদের মধ্যে ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইনে হয়রানি, সহিংসতা, ভয়ভীতি ও নিগ্রহের শিকার হয়( ০৬.০২.২০১৯, দৈনিক প্রথম আলো)। জরিপটি ১২৮১ শিশুর উপর চালানো হয়। জরিপে আরো দেখা গেছে ৯৪ শতাংশেরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট আছে, ৬৩% শিশু নিজের ঘরে বসে ইন্টারনেট ব্যবহার করে, ফলে তাদের ওপর অভিভাবকদের নজরদারি কম থাকে। জরিপ থেকে আরো জানা গেছে, ১৪ শতাংশ শিশু ইন্টারনেটে পরিচয় বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেছে, ১৭ শতাংশ শিশু অপরিচিতদের সাথে ভিডিওতে কথা বলেছে, ১১ শতাংশ শিশু তাদের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে বন্ধুদের জানিয়েছে, ১৬ শতাংশ শিশুর অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হয়েছে এবং ৯ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো সময় ধর্মীয় উসকানিমূলক বার্তা পেয়েছে।
জরিপ থেকে প্রাপ্ত ফলাফল সুখকর নয়, প্রায় এক তৃতীয়াংশ শিশু অনলাইনে হয়রানি, সহিংসতা, ভয়ভীতি ও নিগ্রহের শিকার হচ্ছে; এটাতো যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো তথ্য। আমি, আমরা, আমাদের সমাজ, আমাদের রাষ্ট্রকিন্তু বিষয়টা নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন তেমনটি মনে হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার কারণে, না ভাবার কারণে, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণে সমাজের অভ্যন্তরে বিশেষত শিশু সমাজের অভ্যন্তরে ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে যা হবে অপূরণীয়। কাজেই বিষয়টি নিয়ে সকলকে ভাবতে হবে এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটির বেশী। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৯৪ শতাংশ মূলত মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এবং ৬ শতাংশ ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী সংস্থার মাধ্যমে এ সেবা গ্রহণ করছে। ইন্টারনেট মানুষের জীবনযাত্রাকে বহুমাত্রিকভাবে সহজ করেছে, জ্ঞানের পথকে উন্মুক্ত করেছে-এটা খুবই সত্য কথা। আবার অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবনযাত্রাকে বিশেষত নারী ও শিশুদের জীবনকে অনেক ক্ষেত্রে কঠিন করে তুলেছে। বিপুল জনগোষ্ঠীর সবাই যে ইন্টারনেটের প্রকৃত ব্যবহারের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছে তা নয়, বরং এর অপব্যবহারের মাধ্যমে অনেকে নানা অপরাধ, হয়রানির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। নারীরা, বিশেষত শিশুরা নানা ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এ ধরনের হয়রানি নানাভাবে করা হয়ে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপমানজনক, অশ্লীল মন্তব্য করা, কোনো মেয়ের ছবি তার অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া, ছবি বিকৃত করে বা ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, পর্নোগ্রফি বা অশ্লীল কোন পোস্ট ট্যাগ করে দেওয়া, ছবি, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার বা বিকৃত করার হুমকি দিয়ে কোনো কিছু হাসিলের চেষ্টা করা বা হাসিল করা, ফেক আইডি থেকে বাজে মেসেজ বা ভিডিও শেয়ার করা। প্রায়শ ইমেল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা ইন্টারনেট ব্যবহার করে কোনো কিশোরীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে অশালীন কথা, বার্তা, ছবি কিংবা ভিডিও পাঠানো, আবেগীয় সম্পর্ক স্থাপন করে নানা যৌনকর্মে লিপ্ত করা, বিবিধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিংবা অর্থ বা কোনো উপহার প্রদানের মাধ্যমে তাকে নানা যৌনতামূলক অঙ্গভঙ্গি কিংবা আচরণে প্ররোচিত করা হয়। অনেক সময় অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা এই রকম হয়রানি সংঘটিত হলেও কিছু কিছুক্ষেত্রে পরিচিতজনরাও এরূপ হয়রানি করে থাকে।
শিশু নির্যাতন নিয়ে আমাদের সমাজে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। এ ভ্রান্ত ধারণাগুলো সমাজে যৌন নির্যাতন প্রতিহত করার পথে বাধা তৈরী করে। প্রচলিত ধারণাগুলি হলো: শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার সবসময় বড়দের দ্বারা হয়; যৌন নির্যাতনের কথা প্রকাশ করা লজ্জার ব্যাপার; শিশুরা অপরিচিত ও অনাত্মীয় দ্বারা বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়; একই লিঙ্গভুক্ত শিশুদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের আশঙ্কা নাই; শিশুর সাথে যৌন নির্যাতন সম্পর্কে কথা না বললে সে ঐ অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাবে; ছেলে শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় না; যৌন নির্যাতন আক্রমণাত্মকভাবে না ঘটলে খুব একটা ক্ষতিকর কিছু নয়; শুধু অল্পবয়সী তরুণীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।
যেহেতু ইন্টারনেট বা তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য, সেহেতু অন্তত শিশুদের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ব্যবহার এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরী। শিশুরা ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কি করতে পারবে, কি করতে পারবে না, কোন সাইটে প্রবেশ করা যাবে, কোনটিতে যাবে না, কোনটি শিশুর জন্য ক্ষতিকর ও হুমকি সরূপ তা নির্দিষ্ট করা দরকার। এ কাজগুলির ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ইন্টারনেট অপব্যবহারের এ ভয়াল থাবা থেকে আমাদের প্রিয় শিশু, আমাদের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা শুধু জরুরীই নয় কর্তব্যও বটে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষক সমাজ শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট অপব্যবহারের হাত থেকে রক্ষা এবং শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের সচেতনতা তৈরিতে নিম্নলিখিত কার্যক্রমগুলি বাস্তবায়ন করতে পারে:
ক্স শ্রেণী কক্ষে ইন্টারনেট অপব্যবহারের এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতামূলক পাঠদান;
ক্স স্কুলে যে অভিভাবক সমাবেশ হয় সেখানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা। শিশুদের অনলাইনে যৌন হয়রানি থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বাবা-মাকে সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে এবং দায়িত্বপালন করতে হবে। কিভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হবে সে বিষয়ে সন্তানকে সচেতন করতে হবে। পিতা-মাতার সাথে শিশুদের সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বপূর্ণ। শিশুদের প্রতি কঠোর না হয়ে তাদের মনোভাব বুঝতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ করানোর পূর্বে সন্তানকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে;শিশুকে ইন্টারনেট ব্যবহারের ঝুঁকি এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। এ সকল বিষয়ে নিয়ে আমরা অভিভাবক সভায় আলোচনা করতে পারি। আমার মনে হয় এতে অভিভাবকরা শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন
ক্স শিক্ষক সমাজ ইলেকট্রনিক ও প্রিন্টমিডিয়ায় প্রবন্ধ লিখতে পারেন;
ক্স স্কুলে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা, দেয়ালিকা, নাটক, প্রমাণ্য চিত্র প্রদর্শন ইত্যাদিও আয়োজন করা
ক্স অভিযোগ বাক্স স্থাপন করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর প্রতি পূর্ণসমর্থন প্রদান করা। শিক্ষার্থীরা তাদের অভিযোগ, ঘটনা সম্পর্কে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ বাক্স এর মাধ্যমে জানাতে পারবে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রাপ্ত অভিযোগ, ঘটনা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করবে, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবে, প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
ক্স প্রচার ক্যাম্পেইন (মানব বন্ধন, র‌্যালি) পরিচালনা করা।
ক্স মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে পাঠ দানের যথেষ্ট বিষয় থাকলেও তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বিষয়ে কোন পাঠ অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়নি। এ বিষয়টি সরকারের নজরে আনতে শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব পালন করা জরুরী।
আমাদের দেশের মাধ্যমিক স্কুল এবং মহাবিদ্যালয়গুলি যদি ইন্টারনেটের আপব্যবহারে শিশুদের যৌন নির্যাতনের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করে এবং উল্লেখিত কর্যক্রমসমূহ বাস্তবায়ন করে তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবে আমাদের প্রিয় শিশুদের বহুলাংশে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিবেশ এবং ইন্টারনেটের অপব্যবহারের হাত থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবো।
অন্যদিকে আমরা বলতে পারি; আমাদের প্রিয় এবং আদরের শিশুদের ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে সুরক্ষা দিতে প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা বা ব্যবস্থা। এ দায়িত্ব কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারকে পালন করতে হবে। সরকারকে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। আইনকে যুগপোযোগী করতে হবে, শিশু বান্ধব করতে হবে। ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২’, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬’, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ এর ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের বিচার পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে আবার নির্যাতনকারী শিশুরর শাস্তির বিধান রাখা প্রয়োজন। আর এর জন্য আইন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এর এ সকল বিষয়ে শিক্ষক সমাজকে দাবী তুলতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সরকারে সম্মিলিত উদ্যোগেই আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে পারি, শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারি। আর এর মধ্য দিয়ে আমরা পাবো মেধাবী এক প্রজন্ম যারা আমাদের এ সোনার বাংলাকে উন্নত থেকে উন্নততর অবস্থানে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ হবে নিরাপদ তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ-এটাই হউক আমাদের প্রত্যাশ।
সূত্র:
১. নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা বিষয়ক নির্দেশিকা, শিশু অধিকার ইউনিট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, দ্বিতীয় সংস্করণ আগস্ট ২০১৮।
২. বুলেটিন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), মার্চ ২০১৯।

মো. সাইফুর রহমান, প্রভাষক, ইউসুফপুর ডিগ্রি কলেজ, চারঘাট, রাজশাহী।

উপরে