ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট খোলা চিঠি

ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট খোলা চিঠি

প্রকাশিত: ৩১-০৩-২০১৯, সময়: ১১:৪২ |
খবর > মতামত
Share This

আবদুল কুদ্দুস : বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি জাতির কালের মহাকালের আয়না। সেই আয়নায় ওই জাতির সভ্যতা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় চরিত্রের লাইভ প্রদর্শনী হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারক বাহকগণ যদি একটু ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্রের হোন, তবে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার গায়ে কালিমা লেপন হয়ে যায়। তাই বলেই মনে হয়, বাংলাদেশের বৃহত্তম দুটি বিশ্ববিদ্যালয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়কে নিয়ে, ১০ জুলাই ১৯৬৬, রবিবার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘কারাগারের রোজনামচা’ নামক গ্রন্থের ডায়েরির পাতায় বড় আক্ষেপ করে এক করুণ পরিস্থিতি বর্ণনা করে গেছেন। তিনি লিখেছেন, “ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন শেষ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ডান্ডা চালাতে সক্ষম হবেন। অবস্থা যে কি হবে! বোধ হয় শিক্ষিত সমাজ একটু ঘাবড়াইয়া গিয়েছেন। ভয় নাই, কলম ফেলে দিন। লাঠি, ছোরা চালান শিখুন। আর কিছু তেল কিনুন রাতে ও দিনে যখনই দরকার হবে নিয়ে হাজির হবেন। লেখাপড়ার দরকার নেই। প্রমোশন পাবেন, তারপর মন্ত্রী হতেও পারবেন। শুধু ভাবি ব্যাপরটা কি হলো! কোথায় যেতেছি!” (পৃ. ১৫৬)।

জাতির পিতার এমন হতাশা বাক্যের সাথে অনেক হতাশা মিশিয়ে অর্ধশত বছরের বেশী সময় পরে এসে সহমত পোষণ করতে আমাদের বাধ্য হতে হতে হচ্ছে। জাতির পিতার এই হতাশা বাক্য দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আজও প্রাসঙ্গিক। এই মহান নেতাকে শ্রদ্ধা জানাই এ জন্য যে, তিনি রাজনীতির পাশাপাশি দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষিত সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তবে সাথে একথাটুকুও স্বীকার কওে নিতে চাই যে, এই বীর বাঙালি জাতি গঠনে রাজশাহী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান কম নয়। দেশের অভ্যন্তরে এবং দেশের বাহিরে পৃথিবীর নানা দেশে, সমুদ্রে কিংবা আকাশে সব জায়গায় ওই বিশ্ববিদ্যলয়সমূহের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে রাজনৈতিক, একাডেমিক ও বৈজ্ঞানিক সকল ক্ষেত্রে দুর্দান্ত নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। স্বাধীনতার পর আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশের যাঁরা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তাঁরা সবাই এসব বিশ্ববিদ্যলয়ের থেকে লেখাপড়া শিখে মানুষ হয়েছেন। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে প্রথম যিঁনি প্রাণ দিয়েছেন তিনি তো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিথযশা শিক্ষক। তিনি হলেন ড. শামসুজ্জোহা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব বুদ্ধিজীবি অকাতরে দেশের জন্য ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন যাঁদের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমরা এই দেশকে এবং আমাদের মাতৃভাষাকে কিনেছি তাঁরা অধিকাংশই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের হয় শিক্ষার্থী, নয়তো শিক্ষক। আজও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ নিজের উদ্যোগে নিজের খরচে গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তবু আমাদের শঙ্কার শেষ নেই! এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্তধারী এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সময়ে কিছু কর্মকান্ডে পুরো বাঙালি জাতিকে মাথা নিচু করতে হয়েছে বারবার! দেশের একজন নগন্য নাগরিক হিসেবে এমন লজ্জাজনক ঘটনা থেকে পরিত্রান পেতে চাই। এই পরিত্রান দিতে পারে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের একটু সদিচ্ছা।

মাননীয় কর্র্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল সিদ্ধান্তে দেশের আপমর জনগণের আশা আকাংক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। শিক্ষার্থীদের মনের মণিকোঠা হতে উৎসরিত চাওয়া-পাওয়া বিষয়টি পাবে সর্বাধিক সম্মান। এই বিশ্ববিদ্যালয় কোন বিশেষ গোষ্ঠীর নয়। সুতরাং একটি গোষ্ঠীর চেতনা ধারণ করে ‘বিদ্যাপীঠকে’ ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ এ পরিণত করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় যেমন শিক্ষিত পন্ডিতের তেমনি একজন নিরক্ষর মানুষেরও। নিরক্ষরের নিকট হয়তো শিক্ষা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকারীতা নাও থাকেতে পারে। তবে এটি এজন্য যে, একজন নিরক্ষর পিতামাতাও তার সন্তান জন্মদানের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন দেখে থাকতে পারেন। কেননা আজকের দিনে বাংলাদেশের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের অধিকাংশ মেধাবী শিক্ষার্থী গ্রাম গঞ্জের নিরক্ষর ঘরের সন্তান। তাই একজন নিরক্ষরের নিকট বিশ্ববিদ্যাললে জবাবদিহিতা কম নয়। সেজন্য আমরা পত্র-পত্রিকায়, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য’ এমন খবর দেখতে চায় না। দেখতে চায় না মি. ‘ক’ অমুকের থিসিস চুরি করে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন! সম্প্রতি দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়ে হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নেওয়া এই যুগান্তকারী পদক্ষেপকে আমরা প্রাণভরেই সাধুবাদ জানাচ্ছি। তবে এই নির্বাচনকে ঘিরে যেসমস্ত অভিযোগ উঠেছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ আর একটু যত্নশীল হলেই হয়তো এসব সমালোচনা হতে মুক্ত থাকা যেত। বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন পাঠনে, শিকক নিয়োগে গবেষণা কর্মে সর্বশ্রেষ্ঠদের প্রাধান্য দিবেন এই প্রত্যাশা আমাদের সবসময়।

অন্যদিকে আমার প্রিয় বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এক সময়ের রক্তাক্ত মতিহারের চত্ত্বর বর্তমান উপাচার্য মহোদয়ের দ্বিতীয় মেয়াদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এখন সেশনজট বিহীন প্রাণবন্ত সবুজ চত্বর। শিক্ষা শান্তি ও প্রগতির পথে দীপ্তিমান। উপাচার্য প্রফেসর ড. এম. আবদুস সোবহানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় সামনের দিকে গতিশীল আমরা বলতেই পারি। কিন্তু কিছু হতাশার কথা এই পত্রের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তপক্ষকে অবহিত করতে চাই। এই বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্র সংসদ অর্থাৎ রাকসু নির্বাচন নিয়ে স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা চলছে অনেক দিন ধরে। নির্বাচন প্রায় আসন্ন। এই নির্বাচনে বাঙালি জাতি এবং অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হবে আশা করছি। মাননীয় কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়ে আজকের দিনে কোন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হলে বহু মেধাবীরা ভয় পায় এই বলে যে, লোকবল হয়তো আগে থেকেই নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে আছেন! কেননা, নিয়োগের শর্তে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরণের নমনীয় ও কোমলীয় শর্ত জুড়ে দিয়ে পক্রিয়াকে সন্দেহের তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। তবে আশার বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের কর্মকর্তা নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করেই লিখে দেওয়া হয়েছে,“চাকরী প্রাপ্তির জন্য প্রার্থী কর্তৃক যেকোন ধরণের তদবীর প্রার্থী নিজে করলে অথবা অন্য কারো মাধ্যমে করলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল বলে গন্য হবে”। মাননীয় কর্তৃপক্ষ এমন অঙ্গিকার এবারের নিয়োগে সত্যে পরিনত করতে পারলে মানুষের মধ্যে থেকে সকল হতাশা ও ভয় দূর হতে পারে বলে আমি মনে করি।

মাননীয় কর্তৃপক্ষ, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তিতে গ্রেডিং পদ্ধতিতে পাশকৃত এসএসসি ও এইচএসসি ফলাফলের ক্ষেত্রে কোন কোন বিভাগ একটিতে নূন্যতম ৪.০০/৫.০০ এবং অন্যটিতে ৩.৫০/৫.০০ পেতে হবে উল্লেখ করা থাকলেও কিছু বিজ্ঞপ্তিতে এই শর্ত ৪.৫০/৫.০০ ও অন্যটিতে ৩.৫০/৫.০০ থাকতে হবে এমন উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে সনাতন পদ্ধতিতে একটি প্রথম শ্রেণি ও অন্যটিতে দিবতীয় শ্রেণি শর্ত থাকছে। এমন সব ভাসমান শর্ত চাকরি প্রত্যাশীদেরকে ভীষণভাবে চিন্তিত করে তোলে। নিয়ম এক ও অভিন্ন না হওয়ায় তরুণ চাকরি প্রত্যাশীদের মাঝে হতাশা বাড়ছে যা দশের জন্য সুখবর নয়। সে ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করে অর্থাৎ সেটি প্রথমোক্ত শর্ত হোক আর শেষোক্ত শর্তটিই হোক নির্ধারিত হলে জনমনে সন্দেহ ও ভীতি উভয়ই দূর হবে।

মাননীয় কর্তৃপক্ষ, আজও বাঙালি জাতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পরম ভক্তির সাথে দেখে। বীর বাঙালি জাতি শিক্ষকদের দেখতে চাই আদর্শের বাতিঘর হিসেবে। দক্ষতা ও গবেষণার সাফল্যে হিমালয়েল চূড়্য়া। চন্দ্রে ও মঙ্গল গ্রহের কল্পিত দুনিয়ায় আবাস বানানোর সাফল্যের প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে। অথচ আমরা আজ ব্যথিত হই যখন কোন শিক্ষকের নিকট শুনি আমাকে ওই বিষয়ে প্রশ্ন করো না! আমি ‘ক” বা খ’, গ্রুপের নই। আমি উপাচার্যের গ্রুপের লোক নয়। আমি সাদা বা নীল দলের নেতা নয়। তখন আমাদের ভয় হয়! ভীষণ হতাশা লাগে! শিক্ষকদের পরিচয় তো সাদা-কালো, লাল-নীলে হওয়ার প্রত্যাশা আমাদের কখনো ছিলো না! জনগণের টাকায় যতটা স্বাধীনতা দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লালন পালন করা হচ্ছে তার কতটুকু ফল, কতটুকু সম্মান, কতটুকু অবদান জাতি গঠনে আমাদের শিক্ষক মন্ডলী রাখতে পারছেন? এটি আজ জাতির হতাশার বিষয় হবার কথা নয়! আজ আমরা আশা করি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের বর্তমান কর্তৃপক্ষ তাঁদের সম্মোহনী শক্তির বলে জাতির আয়নায় একটি উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত করবেন।

লেখক: শিক্ষক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ
নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভাসিটি, রাজশাহী।

আরও খবর

  • বাবাকে নিয়ে মেয়র লিটনের স্মৃতিচারণ
  • অকাল মৃত্যুর মিছিল বন্ধে পদক্ষেপ জরুরি
  • প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময় কমানো জরুরি
  • শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
  • নদীতে পানির বড় আকাল
  • ই’তিকাফ অর্থ স্থির থাকা
  • বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমাতে তালগাছ রোপণ জরুরী
  • তারাবীহর নামায সুন্নতে মোয়াক্কাদাহ (পর্ব-৩)
  • পেনশনের দ্বৈতনীতি সংশোধন প্রয়োজন
  • রমজানে মুমিনের রিযিক বাড়িয়ে দেয়া হয়
  • মুজিব বর্ষ ২০২০-২০২১ উদযাপনে কিছু পরামর্শ
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের উৎপাদন-রোগ বালাই ও কৃষকের চাহিদা
  • অকাল মৃত্যুর মিছিল বন্ধে তামাকপণ্যের কর বৃদ্ধি জরুরি
  • ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট খোলা চিঠি
  • বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও শিশু ভাবনা, পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা



  • উপরে