অবৈধ ইটভাটার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে

অবৈধ ইটভাটার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে

প্রকাশিত: ১৪-০৩-২০১৯, সময়: ২৩:০৭ |
খবর > মতামত
Share This

সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী জালাল উদ্দিন উজ্জল

জালাল উদ্দিন উজ্জল : বাংলাদেশের পরিবেশ আজ ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখি। আমাদের দেশের ভূমির পরিমান স্বপ্ন হলেও সবুজে ঘেরা এই দেশটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ভূমির উর্বরতা এবং ইহার যথাযথ ব্যবহারের কারণে অতিতে তেমন বিপর্যয় দেখায় যায়নি। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের বিপন্ন পরিবেশ সারাদেশের মানুষকে চিন্তিত করে তুলেছে। কৃষি, বন, মৎস্য সম্পদ, বন্যপ্রাণী, শক্তি সম্পদ সহ বাংলাদেশকে ঘিরে থাকা সামগ্রিক পরিবেশ আজ মানুষের কর্মকান্ড দ্বারা নানা ভাবে ক্ষতি গ্রস্থ হচ্ছে। জীব বৈচিত্র্য ভয়ানক ভাবে হ্রাস পেতে শুরু করেছে। ফলে পরিবেশ তার নিজস্ব ভারসাম্য হারাচ্ছে।

পরিবেশ সংরক্ষন ও পরিবেশগত মান উন্নয়নে বিভিন্ন আর্থ সামাজিক সমস্যার মধ্যে ভূমির অপরিকল্পিত ও খাম-খেয়ালী ব্যবহার একটি প্রতিবন্ধকতা হিসাবে দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবেশ বিপর্যয় এবং ইহার নানা বিধ বিরূপ প্রভাবের প্রেক্ষাপটে সরকার পরিবেশ সংরক্ষন ও উন্নয়নের প্রতি লক্ষ্য রেখে জাতীয় কৃষিনীতি, জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি, পরিবেশ নীতিসহ অন্যান্য জাতীয় নীতিমালা প্রনয়ন করেছেন। তথাপিও ভাবে সরকারের প্রনয়নকৃত ঐ সকল জাতীয় নীতি মালা মাঠ পর্যায়ে নানা ভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে।

দিনের পর দিন পরিবেশগত বিভিন্ন বিরূপ প্রভাব দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে মানব জীবন, উদ্ভিদ, বন্য পশু প্রাণী সহ আবাদী ফসল। তাই বিশেষ দৃষ্টান্ত হিসাবে রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলা একটি উল্লেখযোগ্য। যেখানে ৮০% লোক আবাদী কৃষি জমির উপর নির্ভরশীল। সেখানে জাতীয় কৃষিনীতি, জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি এবং পরিবেশ নীতিমালা লংঘন করে উৎপাদনশীল আবাদী কৃষি জমি বিনষ্ট করে ব্যাঙের ছাতার মত ওলি-গলি বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলা হয়েছে অপরিকল্পিত ইট ভাটা। তাও আবার সেগুলো পরিচালিত হচ্ছে, পরিবেশগত ছাড়া পত্র ও লাইসেন্স ছাড়াই। যদিও সরকার ইট প্রস্তু ও ভাটা স্থাপনের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠান কল্পে ইট প্রস্তুতি ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইন, ২০১৩ প্রনয়ন করেছেন। এক্ষেত্রে বাগমারা উপজেলায় স্থাপিত ও পরিচালিত ইট ভাটার তথ্য ২০১৫ অনুযায়ী লাইসেন্স বিহীন ইট ভাটার সংখ্যা ৩৯টি। যা ক্রমান্বয়ে দিনের পর দিন বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮ সালে বর্তমানে ইহার সংখ্যা দাড়িয়েছে ৪৬টি। হয়তো অবৈধ ইট ভাটার প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশী। শুধু তাই নয় বাগমারা উপজেলায় ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইন ২০১৩ এর ধারা ৪, ৫, ৬, ৭ ও ৮ সুস্পষ্ট ভাবে লংঘন করে দীর্ঘদিন ধরে চলছে প্রশাসনের চারপাশে অবৈধ ইট ভাটার বাণিজ্য। কিন্তু এই আইনের প্রতিটি ধারার লংঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তা সত্তে¡ও স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতায় বাগমারা উপজেলায় অসংখ্য লাইসেন্স বিহীন অবৈধ ইট ভাটার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত ঐ সকল ইট ভাটার বিরুদ্ধে কোন কার্য্যকরি প্রদক্ষেপ গ্রহন করা হয় নাই।

এ সংক্রান্ত বিষয়ে দৈনিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় অনেক বার সংবাদ পরিবেশন হওয়া সত্তে¡ও দায়িত্বরত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তরফ থেকে বাগমারা উপজেলায় লাইসেন্স বিহীন ঐসকল অবৈধ ভাবে পরিচালিত ইট ভাটা বন্ধে আইনগত তেমন কোন পদক্ষেপ আমাদের চোখে পড়ে নাই। ক্রমান্বয়ে পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির সম্মুখীন হওয়ার দরুন আমি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবি হিসাবে স্বপ্রনোদিত হয়ে বাগমারা উপজেলায় অবৈধ ভাবে পরিচালিত ইট ভাটাগুলো বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তাদের প্রতি আইনগত নোটিশ দিয়ে অনুরোধ জানিয়েও তা অদ্যবধি আমলে নেওয়া হয় নাই।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইন, ২০১৩ একটি যুগপোযোগী আইন হওয়া সত্তে¡ও উক্ত আইনের বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন রহস্য জনক ভাবে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। জানিনা, সরকারের জাতীয় নীতিমালা ও প্রচলিত আইনের বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার, প্রশাসনের না আইনজীবিদের। যেখানে দেশের প্রচলিত আইনের বিধান অনুযায়ী জাতীয় কৃষি নীতি, ভূমি ব্যবহার নীতি এবং পরিবেশ নীতি লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহন করেন। কিন্তু বাস্তবে তা সম্পন্ন ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে অবৈধ ইট ভাটার ক্ষেত্রে। আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়কে বাগমারা উপজেলায় পরিচালিত অবৈধ ইট ভাটার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।

তার প্রেক্ষিতে হয়তো দুই চারটি অবৈধ ইট ভাটায় অভিযান পরিচালনা করে কিছু জরিমানা আদায় করা হয়েছে মাত্র। কিন্তু তা সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ হয়নি ঐ সকল অবৈধ ইট ভাটার কার্যক্রম। যদিও চোখের সামনে রাস্তার চার পাশে উল্লেখিত বেশ কিছু ইট ভাটা রয়েছে তা দৈনিক চলাচলের পথে স্থানীয় প্রশাসনের নজরে পড়ে। কিন্তু কি কারনে তা আজও বন্ধ হচ্ছে না। যে ভাটাগুলো শুরু থেকেই অবৈধ অর্থাৎ প্রচলিত ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী পরিবেশগত ছাড়পত্র ও লাইসেন্স ছাড়া ইট ভাটা ইট প্রস্তুত করা অপরাধ। কিন্তু সেখানে শুধু মাত্র মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে কিছু জরিমানা আদায় করলে কি তা বৈধতা পায়? হ্যাঁ বৈধ বা লাইসেন্সধারী ইট ভাটা যদি প্রচলিত আইনের অন্য কোন বিধি বিধান লংঘন করে, সেক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে তা সতর্ক করা আইনগত পদক্ষেপের অংশ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু আইন অনুযায়ী অবৈধ ভাবে পরিচালিত ইট ভাটার কার্যক্রম বন্ধ করা বাধ্যতামূলক।

বাগমারা উপজেলায় বেপোরোয়া ভাবে পরিচালিত লাইসেন্স বিহীন অবৈধ ইট ভাটাগুলোর মধ্যে পি.কে.বি ব্রিকস, এম.ডি.টি ব্রিকস, হোম ব্রিকস, এন.এফ.এস ব্রিকস, এম.এস.টি ব্রিকস, এম.এম.বি, এ.কে.সি, এম.টি.ডি, এ.জেট.কে, জে.বি.কে, এস.বি.কে, এ.এস.এম, এস.এম, এস.এম, আর.এম। ভি.আই.পি ব্রিকস, এম.এম.বি, এস.কে.ওয়াই, দিঘী ভিটা, এম.আর হিরো ব্রিকস, এস.ইউ, ডাবলু, এস.এস.বি, ডি.এম.পি, তামিম ব্রিকস, পি.আর.বি, এম.আর. এস ব্রিকস, টাটা ব্রিকস, এম.আর.এফ ব্রিকস, সোন ব্রিকস, ষ্টার ব্রিকস, মোন ব্রিকস, ২০১৪, এম.ইউ এ.এস, ডি.ই.এস.টি, আর.ও.এস.ই, এস.এইচ.আর.বি, রতন, বি.এইচ.এম, এম.এ.এস, রুমান, এম.এস.টি, বি.কে.এস এবং জি.ডি.বি.এল উল্লেখযোগ্য। ঐ সমস্ত ভাটাগুলোর বেপরোয়া কার্যক্রমের ফলে যেমন একদিকে ব্যাপক ভাবে আবাদী কৃষি জমি নষ্ট করা হয়েছে, পাশাপাশি অন্যদিকে চলছে অধিকহারে বনজ-ফলস বৃক্ষদি উজাড়। তা কয়লার বিপরীতে জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে দিবালোকে।

এছাড়াও নিয়ন্ত্রনহীন ভাবে চলছে কয়লার বিপরীতে অতিমাত্রায় সালফার, আ্যশ, মারকারি, যার কারনে এলাকায় মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়াও অপরিকল্পিত ভাবে যেখানে-সেখানে অবৈধ ইট ভাটা স্থাপনের কারনে এলাকার সর্বত্র ফলজ বৃক্ষাদি ও উৎপাদনশীল ফসলগুলো নানা রোগে ব্যাপক আক্রান্ত হয়েছে। তবুও ক্ষতিকারক ঐ সকল অবৈধ ইট ভাটাগুলো বহাল তবিয়াতে প্রশাসনের ছত্র ছায়ায় নিরবিচ্ছিন্ন ও একক ছত্র ভাবে ইট ভাটার বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ইট ভাটার সাথে সম্পৃক্ত ঐ সকল ব্যক্তিরা কোন ভাবেই দেশের নিয়ম কানুন ও প্রচলিত আইন তোয়াক্কা করছে না। মনে হয় তারা দেশের আইনের উর্ধ্বে। কারন তাদের উক্ত রূপ অন্যায় ও অবৈধ কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কোথাও কোন অভিযোগ করে প্রতিকার তো দূরের কথা অভিযোগকারীকে হতে হয় হেস্তনেস্ত। এইরূপ অবস্থার কারনে আমাদের উপজেলায় প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য দিনের পর দিন বিপদগামী হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে জরুরী ভিত্তিতে সরকারের প্রনয়নকৃত জাতীয় কৃষি নীতিমালা, জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতিমালা ও পরিবেশ নীতি মালার সঠিক বাস্তবায়ন অপরিহার্য। তাই এই অঞ্চলের মানুষের পরিবেশ বান্ধব জীবন যাপনে প্রশাসনকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত।

প্রশাসনের জোরালো হস্তক্ষেপ ছাড়া ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইন, ২০১৩ কোন ভাবেই মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা আদৌ সম্ভব নয়। সব ক্ষেত্রেই আদালতের হস্তক্ষেপ গ্রহন করা সমীচিন নয়। আদালত মানুষের সর্বশেষ আশ্রয় স্থল। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনগণ সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করলে বাগমারায় লাইসেন্স বিহীন অবৈধ ভাবে পরিচালিত কোন ইট ভাটা ১ ঘন্টাও চলতে পারে না। প্রশাসনের নিস্ক্রীয়তা সম্পূর্ণ রূপে আইনের প্রতি অসম্মান দেখানো। যা কখনও আমরা দেশের সাধারন মানুষ সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিকট থেকে এরকমটি আশা করি না। বাগমারা উপজেলায় বিত্তশীল ব্যক্তিরা দেশের প্রচলিত আইন অমান্য করে অবৈধ ভাবে ইট ভাটা পরিচালনার মাধ্যমে আবাদী কৃষি জমি নষ্ট করে ও ব্যাপক ভাবে পরিবেশ দূষন যে অপরাধ করছে কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের কড়া নজর থাকার কথা থাকলেও কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায় না।

তবে সমাজের নি¤œবিত্ত কোন মানুষ দেশের প্রচলিত আইন লংঘন করে ছোট খাটো কোন অপরাধ করা মাত্রই তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইনের বিধান শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া সত্তে¡ও উক্ত আইন লংঘন করে লাইসেন্স বিহীন ভাবে অবৈধ প্রক্রিয়ায় ইট ভাটা পরিচালনার মাধ্যমে ব্যাপক ভাবে পরিবেশ দূষণ করছেন। কিন্তু তাদের ঐ সমস্ত কর্মকান্ড তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে আমলে নেওয়া হচ্ছে না। তাই একজন বিবেকবান ও সচেতন মানুষ হিসাবে দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রতি অনুরোধ রাখছি, বাগমারায় মাটি, মানুষ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন লাইসেন্স বিহীন অবৈধ ভাবে পরিচালিত ইট ভাটাগুলো বন্ধে আশু কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। লইয়ার্স সোসাইটি ফর’ল এ বিষয়ে বিশেষ ভাবে অবগত রয়েছেন।

লেখক : মোঃ জালাল উদ্দিন উজ্জল, এ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোট

উপরে