সংস্কৃতির সংকট : একুশের চেতনা

সংস্কৃতির সংকট : একুশের চেতনা

প্রকাশিত: ২৭-০২-২০১৯, সময়: ১৪:১৮ |
খবর > মতামত
Share This

মামুন অর রশিদ : পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন হতে শুরু করে মানুষের সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। অর্ধশত কিংবা শত বছর আগে যে সামাজিক রীতি পালন করা হতো তা আজ সেকেলে হয়ে গেছে। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলেই মূলত এ পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে। কোন নিদৃষ্ট স্থানের মানুষের আচার ব্যবহার,জীবিকার উপায়,সঙ্গীত,নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতিনীতি, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় তা ঐ স্থানের সংস্কৃতি।

বাঙালী জাতি হাজার বছর ধরে যে সংস্কৃতি লালন করে আসছে সেটাই বাঙালী সংস্কৃতি।উত্থান পতন ও পরিবর্তনের মাধ্যমে বাঙালী সংস্কৃতি আজ অপ-সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। অপ-সংস্কৃতি বলতে নিজের সংস্কৃতির সাথে মানানসই নয় এমন বোঝায়।

সপ্তম শতাব্দীতে চর্যাপদ ও তার পরবর্তী সময়ে মধ্যযুগে লোকগীতি ও পালাগানের প্রসার লক্ষ করা যায়। এছাড়া ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন সাহিত্যিক ও কবিদের কবিতায় আমাদের বাংলা সাহিত্য ভান্ডার অনেক সমৃদ্ধ করেছে। সঙ্গীত মূলত মানুষের মনের ক্ষুধা নিবারণ করে। সঙ্গীত চর্চা বহুকাল থেকে লক্ষ্য করা যায়। একসময় গ্রাম বাংলায় সঙ্গীতের বেশ কদর ছিলো। মানুষের মুখে মুখে গান প্রচার প্রসার হতো। বিশেষ করে বাউল গান, জারি, সারি, মারফতি, মুর্শিদী, গম্ভীরা, ভাটিয়ালী,ভাওয়াইয়া গান বহুল প্রচলিত ছিল এবং এসব গানকে শ্রুতিমধুর করার জন্য একতারা, দোতারা, ঢোল, হারমনিয়াম, বাঁশি ও তবলার ব্যবহার ছিল।

দুঃখের বিষয় এই যে, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গেলে এসব যন্ত্রের দেখা মেলেনা। গানের সুর ও কথা বিকৃত করে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গান শুনে শ্রোতারা তৃপ্ত হতে পারছেনা। বাণিজ্যিকি কারণে এটি ঘটছে। বাঙালী ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও প্রসারের জন্য খুব কম লোকই কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিকে লক্ষ্য করলে বাংলা লেখাকে ইংরেজিকরন করে মনের ভাব প্রকাশ করা হচ্ছে। এর ফলে ভাষার চর্চা ও বাংলার ব্যবহার কমে যাচ্ছে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পায় যে, ভাষার জন্য একমাত্র বাঙালীরাই জীবন দিয়েছে। মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল বলে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে এবং অধিকার আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু তাদের স্মরণ করার জন্য আমরা শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখই বেছে নিচ্ছি।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখলাম যে, পিতা তার সন্তানকে শহীদ মিনারে ফুল দিতে এসে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলন হয়েছিলো বলে মন্তব্য করে। এটি ভাষা শহীদদের প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলার নিদর্শন। আমরা বিশেষ দিন ঠিক করে ঐদিন বাঙালী সংস্কৃতি ধারণ করছি। ভালোবাসার ভাষা ও ভাষা শহীদদের কতটুকু মূল্যায়ন করতে পারছি তা আমাদের ভাবতে হবে।

বাঙালী সংস্কৃতি ধারণ করতে পারছিনা বলে আজ বিদেশি সংস্কৃতি আমাদের উপর চেপে বসেছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা মাসের কত তারিখ তা আমরা কতজন জানি? কিন্তু আমরা বিদেশী ভাষা সাহিত্য-সংস্কৃতিকে নিজেদের করে নিচ্ছি ঠিকই। অনুরূপভাবে বাঙালী সংস্কৃতিকে বিদেশিরা কি আমাদের মত ধারণ করছে? বিদেশি সংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করে প্রকৃত বাঙালী হওয়া সম্ভব নয়।বিশ্ববিদ্যালয়েরর মত জায়গায় সাংস্কৃতিক চর্চা সঠিকভাবে না থাকার কারনে শহীদমিনার মুক্তমঞ্চের মত জায়গায় ব্যান্ড সংঙ্গীত ও মিলনায়তনে অশ্লীল নৃত্য পরিবেশন করা হচ্ছে। এটি একজন সাংস্কৃতিক কর্মীর জন্য পীড়াদায়ক।

অবিলম্বে এসকল অপসংস্কৃতি বন্ধ করা হোক। আসুন দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে নতুন প্রজন্মকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবেই সংস্কৃতির সংকট দূর হবে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a comment




উপরে