আমার গ্রাম-আমার শহর ও উন্নত বাংলাদেশ ভাবনা

আমার গ্রাম-আমার শহর ও উন্নত বাংলাদেশ ভাবনা

প্রকাশিত: ০৬-০২-২০১৯, সময়: ২৩:০৫ |
খবর > মতামত
Share This

আবদুল কুদ্দুস : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব বিষয়ে বলা হয়েছে যে, “নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবন যাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করিবার উদ্দেশ্যে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিকরণের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।” বিলম্বে হলেও স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে যাবার কাছাকাছি সময় এসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের গ্রাম উন্নয়নের জন্য “আমার গ্রাম-আমার শহর” স্লোাগানে একটি দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনাসমেত নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছে। বিষয়টি সব সমালোচনার ঊর্ধে ধারণ করে একটি সুষম গ্রাম উন্নয়নের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে দেশের সর্বস্তরের মানুষের একসাথে কাজ করার সময় এসেছে। পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রপ্রধানগণ গ্রামের উন্নয়নের কথা বলেছেন অকপটে। যেমন আমাদের বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রামকেই দেখেছেন।

তিনি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন “প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। তোমাদের হাতে যা কিছু আছে তাই নিয়েই শক্রুদের মোকাবেলা কর।” বাংলাদেশকে শক্রুর হাত থেকে মুক্ত করতে তিনি যেমন গ্রামের মানুষকে সংঘবদ্ধ হতে বলেছেন। অন্যদিকে ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ এক ভাষণে তিনি গ্রামীণ সমবায়ের ভাবনার কথা বলেছেন এভাবে-“প্রতি গ্রামে যৌথ চাষ হবে এবং ফসলের ভাগ যাবে মালিক, শ্রমিক ও গ্রাম তহবিল-এই তিন জায়গায়।” বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা তাঁর অনবদ্য রচনা ‘ওরা টোকাই কেন” গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ ‘স্মৃতির দক্ষিণ দুয়ার’-এ বলেছেন “গ্রামের উন্নয়ন পক্রিয়া বলতে আমি কোন ছিটেফোঁটা বা সাময়িক ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসী নই। যুগ যুগ ধরে অন্ধকারে পড়ে থাকা পশ্চাৎপদ জীবনযাত্রার অভ্যস্ত কৃষি-ব্যবস্থার প্রচলিত ধ্যান-ধারনার সামগ্রিক সংস্কার করে আধুনিক গ্রাম গড়ে তুলতে হবে। আমি কোন অনুদানমূলক বা প্রতিশ্রুতিপূর্ণ উন্নয়ন নয়, ‘টোটাল’ বা সামগ্রিক উন্নয়ন চাই। এজন্য প্রয়োজনবোধে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং শিক্ষিত সচেতন তরুণ সমাজকে কাজে নামাতে হবে।” তিনিও অনুভব করেছেন গ্রাম বাংলাদেশের প্রাণ। তিনি গ্রামের সার্বিক উন্নয়ন চান। সেই উন্নয়ন অনুদানে ভরপুর নয়। মিছিল মিটং-স্লোগানের উন্নয়ন নয়। সেই উন্নয়ন হবে টেকসই উন্নয়ন।

ভারতের জাতির পিতা মহাত্না গান্ধী বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে বলেছিলেন “The soul of India lives in its Villages” তাঁর সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে ভারতে “The Mahatma Gandhi National Rural Employment Act 2005” শীর্ষক (সংশোধিত ২০১৭) একটি আইন পাশ করা হয়েছে। ওই আইনের মূল লক্ষ্য হলো- দেশটির গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে প্রতিটি পরিবারের একজন কর্মক্ষম মানুষকে পরিবারে/গ্রামের অভ্যন্তরেই একটি অর্থবছরে ১০০ দিনের কাজের ব্যবস্থা করা। এখানে তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পেয়ে থাকবে। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে এমন ভাবনা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

অন্যদিকে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপ্রতি এপিজে আবদুল কালাম আধুনিক গ্রাম নির্ভর সুখি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে “Target 3 Billion” শীর্ষক একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। বিশ্ব কাঁপানো এই বিজ্ঞানী তাঁর বইটিতে “Providing Urban Amenities in Rural Areas” শীর্ষক প্রকল্পে আধুনিক সুবিধাসমৃদ্ধ গ্রাম বিনির্মাণে একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা নকশা তুলে ধরেছেন। লেখক গ্রন্থটিতে ব্রাজিলের প্রখ্যাত ‘সোসাল এন্ট্রেপ্রেনিয়ার’ ফেবিও রোজা কর্তৃক দেশটির রুরাল ডিসট্রিক্ট এর একটি গ্রাম Palmares কে সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে বৈদ্যুতিকায়ন, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি চালুকরণ ও তথ্য প্রযুক্তির কার্যকরী ব্যবহারের নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি উন্নত গ্রামে পরিণত করার নানামাত্রিক কৌশল তুলে ধরেছেন। এছাড়াও গ্রন্থটিতে তিনি ভারতের মাহারাষ্ট্র রাজ্যের অন্তর্গত পিউন গ্রামকে “Magarpatta” প্রকল্পের আওয়তায় এনে প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সতিস ম্যাগারের নেতৃত্বে সেখানে বাণিজ্যিক এলাকা প্রতিষ্ঠা, আবাসিক এলাকা নির্মাণ, বিশেষায়িত হসপিটাল, শপিং মল, রেস্টুরেন্ট, জিমনেসিয়াম, পার্ক এবং স্কুল প্রতিষ্ঠা করে একটি আধুনিক গ্রামে পরিণত করার বর্ণনা স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। এই গ্রামটিতে এখন একটি বাণিজ্যিক প্রাঙ্গন “Destination Centre” বিশ্ব গ্রাম ধারণাকে আজো আলোকিত করে চলেছে। লেখক কর্তৃক বর্ণিত এসব ঘটনা এখন বিশ্ব গ্রামের নির্মাণের রোল মডেল। লেখক বইটি উৎসর্গ করতে গিয়ে বলেছেন “আমার কাছে একটি ১০ বছরের মেয়ে অটোগ্রাফ চাইতে এসেছিলো। আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম “তোমার এ্যাম্বিশন কী? সে বলেছিলো আমি একটি উন্নত রাষ্ট্র ভারতে বাস করতে চাই!” মেয়েটির এমন সাহসিক উচ্চারণের প্রতি মুগ্ধ হয়েই লেখক সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই আধুনিক সুবিধাসমেত গ্রাম নির্ভর উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়েছেন গ্রন্থটিতে।

এছাড়াও গ্রন্থটিতে বিধৃত হয়েছে যে কিভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আধুনিক গ্রাম নির্মাণ করা যায়। অতীতের চাষাবাদ পদ্ধতিসমূহ ও আগামীর সমস্যা এই দুইয়ের মধ্যে সেতু বন্ধন নির্মাণ করতে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। গ্রামের ওই কৃষক শ্রেণির মানুষ যাতে অন্যদের সাথে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী ভবনে প্রবেশের সমান সুযোগ পায় সেই পথ নির্দেশনাও তিনি দিয়েছেন। গ্রামের মানুষের সাথে বজায়যোগ্য জ্ঞান ও দক্ষতার আলোকে প্রযুক্তি নির্মাণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির প্রতি তিনি জোর দিয়েছেন।

বর্তমান সরকার ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ তারিখে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মহূর্তে আধুনিক সুবিধা সমৃদ্ধ গ্রাম নির্মাণের কতিপয় লক্ষ্য ও পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। এসব পরিকল্পনা ও লক্ষসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো-উন্নত রাস্তঘাট, যোগাযোগ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্বাস্থ্য সেবা ও সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সরবরাহ বৃদ্ধি, কম্পিউটার ও দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মানসম্পন্ন ভোগ্য পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক শহরের সকল সুবিধাদি দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রামের বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সরবরাহ আরও বাড়ানো ও নির্ভরযোগ্য করার লক্ষ্যে গ্রুপভিত্তিতে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও সৌরশক্তিপ্যানেল বসানোর উৎসাহ ও সহায়তা দেওয়া হবে। গ্রাম পর্যায়ে কৃষিযন্ত্র সেবাকেন্দ্র, ওয়ার্কশপ স্থাপন কওে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ গ্রামীন যান্ত্রিকায়ন সেবা সম্প্রসারণ করা হবে এবং এসবের মাধ্যমে গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান করা হবে। অকৃষি খাতের এসব সেবার পাশাপাশি হাল্কা যন্ত্রপাতি তৈরী ও বাজারজাত করতে বেসরকারী খাতের প্রান্তিক ও ক্ষদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া হবে।

শহরের সকল সুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়ার যে দৃঢ় প্রত্যয় বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এই উদ্দেশ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের মতো বাংলাদেশেও একটি “Our village-Our city Implementation Act” প্রণয়ন করা যেতে পারে। জাতিসংঘ কর্তৃক এসডিজি’স অর্থাৎ “Transformimg Our World: The 2030 Agenda for Sustainable Development” এর যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তার সাথে মিল করে আমাদের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা দরকার। দরকার এলজিআরডি মন্ত্রনালয় হতে পৃথক করে ‘পল্লী উন্নয়ন” মন্ত্রনালয় গঠন করা। নবগঠিত ওই মন্ত্রনালয়কে সর্বপ্রথম পরিবেশের উপর প্রভাবমুক্ত উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন হবে। প্রয়োজন হবে অংশিদারিত্বপূর্ণ শান্তিময়, সাম্য-স্বাধীনতা সম্মানের সাথে বসবাসের উপযোগি উন্নত গ্রাম নির্ভর সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণ।

লেখক: শিক্ষক, বিজনেস স্টাডিজ বিভাগ
নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী।

উপরে