রাজিয়ার সংগ্রাম ও আমাদের বিবেক

রাজিয়ার সংগ্রাম ও আমাদের বিবেক

প্রকাশিত: ০২-০২-২০১৯, সময়: ১৩:৫২ |
খবর > মতামত
Share This

জামসেদ আলম সবুজ : আমরা মানুষ, শ্রেষ্ঠ জাতি। জ্ঞান, বিজ্ঞান, বিবেক, মানবতা- কোন কিছুতেই আমাদের তুলনা চলে না। কিন্তু শ্রেষ্ঠ জাতি হয়েও নিজেকে নির্লজ্জ মনে হয় কখনও কখনও। অসহায় লাগে নিজেকে। যখন দেখি শারীরিক অক্ষমতার শিকার আমারই কোন এক সহপাঠী বা ছোট ভাই-বোন শত প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মত এত বড় জায়গায় পড়তে এসেও ঝরে পড়ার আশঙ্কায় ঝুলছে। এতদূর এসেও সামান্য সহযোগীতা বা কিছু সুবিধার অভাবে তাদের পক্ষে ক্লাস করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে বেশ সাড়া ফেলেছে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগে ভর্তি হওয়া প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানা রুমকি। জন্ম থেকেই সে শারীরিক প্রতিবন্ধীতার শিকার। হুইলচেয়ার ছাড়া তার চলাফেরা করার উপায় নেই। এই প্রতিকূলতা নিয়েও সে বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় শত সংগ্রাম করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। শিক্ষা জীবনের প্রতিটি স্তরেই রেখেছে মেধার স্বাক্ষর। মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৪.৩৯ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে মানবিক বিভাগ থেকে ৪.০৮ পেয়েছে। এরপর ভর্তি হয়েছে স্বপ্ন পূরণের প্লাটফরম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজিয়ার স্বপ্ন, সে শিক্ষক হবে। পড়াশোনা শেষ করে তার মত প্রতিবন্ধীতার শিকার যারা, তাদের নিয়ে সে কাজ করবে।

কিন্তু এতদূর এসেই যেন তার স্বপ্ন থমকে যেতে বসেছে। কারণ হলো রাজিয়ার আরবি বিভাগের ক্লাস হয় শহীদুল্লাহ কলাভবনের ৩য় তলায়। তাকে ক্লাস করাতে হলে হুইলচেয়ারে করে দুই-তিন জনকে তিনতলায় নিয়ে যেতে হবে। আমি দেখেছি, তার মা একা কিভাবে মেয়েকে কোলে করে নিয়ে তিন তলায় ওঠে। এভাবে মায়ের কোলে করে তিনতলায় উঠে বা নেমে তার ক্লাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজিয়া সম্পূর্ণই তার মায়ের ওপর নির্ভরশীল। এভাবে চার বছর ধরে সে মায়ের কোলে চড়ে তিনতলায় গিয়ে ক্লাস পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। আর আরবি বিভাগে নিয়মিত ক্লাস না করলে তার টিকে থাকাও মুশকিল। ফলত তার স্বপ্ন আর বোধ হয় পূরণ হচ্ছে না।

এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এসবের ভূক্তভোগী কেবল রাজিয়াই নয়, তার মত আরও অনেকেই আছে। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৫ ভাগ কোটা নিয়ে রাজিয়ার মত বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়। কিন্তু এই বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের বিশেষ চাহিদাগুলো পূরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ব্যবস্থাই নেই। অনেক পুরাতন এই একাডেমিক, প্রশাসনিক, গ্রন্থাগার, হলের ভবনগুলোতে র‌্যাম্পওয়ে, লিফট সুবিধা নেই। ফলত রাজিয়ার মত শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার শিক্ষার্থীদের পক্ষে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে ক্লাস করা সম্ভব নয়। দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধিতার শিকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার বা বিভাগের সেমিনার গুলোতে নেই ব্রেইল বা অডিও বুক। ফলত দেখা যাচ্ছে ৫ ভাগ কোটা সুবিধা নিয়ে এত বড় প্লাটফরমে এসেও তাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বপ্নপূরণ হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ৫ ভাগ কোটা সুবিধা দিয়ে পড়াশোনারই সুযোগ দিয়েছে কেবল, কিন্তু তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অন্য ভৌত বা অভৌত সুবিধাগুলো দেয়নি। খুব দুঃখ করেই এই কথাটা বলতে হয়। এটা তাদের জন্য দয়া নয়, এটা তাদের অধিকার। যে অধিকার তাদের দিয়েছে এই রাষ্ট্র, এই সংবিধান। তাদের মেইনস্ট্রিমে আনার স্বপ্ন দেখেছেন আমাদের মহানায়ক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর সেই স্বপ্নটিকে বাস্তবায়নের জন্য শত উদ্যোগ নিয়েছেন তারই যোগ্য উত্তরসূরী, দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আমার হাত-পা সচল আছে, মস্তিষ্ক, চোখ, কান সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। শারীরিক সকল সুবিধা নিয়ে আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। কিন্তু আমারই কোন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সহপাঠী বা ছোট-বড় ভাইবোন শত প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে সংগ্রাম করছে। তারা কিন্তু আমাদের চেয়েও বেশি সংগ্রাম করে। সুতরাং তাদের এই সংগ্রামকে যদি আমরা উৎসাহ না দেই, সুযোগ-সুবিধা না দেই তবে তারা ঝরে পড়বে। বর্তমান সরকার তাদের মেইনস্ট্রিমে নিয়ে এসে নিজেদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার যে ভিশন দেখেছে, তা ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের এভাবে সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে তাদের বোঝা হিসেবে দেখতে চাই না। আমাদের সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তাদেরকে আমাদের সমকক্ষ হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে দেখতে চাই।

এজন্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আকূল আবেদন, রাজিয়ার মত অসংখ্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তির কথা বিবেচনা করে অন্তত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের চাহিদাগুলো পূরণ করা হোক। তারা বোঝা নয়, হোক দেশের সম্পদ। হোক তারা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার একেকটি স্বর্ণখন্ড। আর পৃথিবীতে বয়ে যাক সাম্যের বাতাস, সম অধিকারের ছুঁয়ে যাক প্রতিটি হৃদয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মত আমরাও ‘গাহি সাম্যের গান’।

লেখক : শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
এবং শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

আরও খবর

  • অকাল মৃত্যুর মিছিল বন্ধে তামাকপণ্যের কর বৃদ্ধি জরুরি
  • ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট খোলা চিঠি
  • বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও শিশু ভাবনা, পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা
  • অবৈধ ইটভাটার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে
  • রাষ্ট্র ও এর মানুষের অধিকারের কথা
  • সংস্কৃতির সংকট : একুশের চেতনা
  • গর্বিত বীরগঞ্জের বীর চিকিৎসকদের জন্য
  • ড. জোহা হত্যা: আমার স্মৃতি
  • আবাদি জমি রক্ষায় প্রয়োজন কৃষক ঐক্য
  • আমার গ্রাম-আমার শহর ও উন্নত বাংলাদেশ ভাবনা
  • অনুপ্রেরণার উৎস যে জীবন
  • রাজিয়ার সংগ্রাম ও আমাদের বিবেক
  • উত্তরবঙ্গের মাটির নিচে সোনা-রুপা
  • উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টাল পদ্মাটাইমস২৪.কম
  • এক অনন্য অসাধারণ উচ্চ মর্যাদার বাংলাদেশের কথা



  • উপরে