বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা আইন ও আমাদের ভাবনা

বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা আইন ও আমাদের ভাবনা

প্রকাশিত: ১২-১১-২০১৮, সময়: ১৬:১৭ |
খবর > মতামত
Share This

ডাঃ মাহফুজুর রহমান রাজ

ডাঃ মাহফুজুর রহমান রাজ : মানুষ যতক্ষণ না জানছে থ্যালাসেমিয়া কি? কেন হয়? ততক্ষণ বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার আইন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বুমেরাং হয়ে দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করছেন থ্যালাসেমিয়া নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞগণ। বিয়ের সময় যখন রক্ত পরীক্ষার কাগজ চাওয়া হবে, মানুষ বিষয়টা বাধ্যবাধকতার কারণ বুঝতে পারবে না। বিয়ের পার্টিতে এটা নিয়ে নানান আলোচনা সৃষ্টি হবে এবং থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে নানান গুজব চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। এইটা একটা সামাজিক সংকট সৃষ্টি করবে।
তবে যখন মানুষ বুঝতে পারবে যে এটা এমন একটা রোগ যা একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায় না, এটা মানুষের জন্মের সাথে সম্পর্কিত। জন্মের পর যদি থ্যালাসেমিয়া না থাকে তাহলে আর পরবর্তীতে কখনো নিজে আক্রান্ত হবার কোন সম্ভাবনাই নাই। থ্যালাসেমিয়া রোগী জন্ম নেয় শুধুমাত্র যদি দুইজন থ্যালাসেমিয়া জিন বাহকের মধ্যে বিয়ে হয়। আলাদাভাবে ওই দুইজন বাহক ও সুস্থ মানুষ। একজন জিন বাহকের সাথে অন্য যে কারো বিয়ে হলে কোন থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্মের সম্ভাবনা নেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে দুই জন জিন বাহকের যদি বিয়ে না হয় তাহলেই সম্ভব।

বর্তমানে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞগণ বলছেন যে, মানুষ যখন জানবে তখন আইন করলে মানুষ তা সহজে গ্রহণ করবে এবং নিজেদেরই আগ্রহ থাকবে ছেলে মেয়ে বাহক কিনা বিষয়টা নিশ্চিত হওয়ার। যদি দেখা যায় উভয়েই বাহক সে ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সকলে মিলে তাদের নিবৃত্ত করবে বিয়ে করা থেকে। থ্যালাসেমিয়া কতটা বিপদজনক রোগ তা বোঝা যায় ৫০ ভাগের বেশি রোগী ২৫ বছর বয়স হবার অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করে। প্রতিটা পরিবার থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে বাচ্চা জন্মের পর দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। জীবনের শখ-আহ্লাদ বলতে কিছু থাকে না। জীবনটা আটকে যায় একটা লাল ব্যাগ এর ভিতরে যেখান থেকে চিকন পাইপে লাল রক্ত নেমে আসে।

থ্যালাসেমিয়া রোগ আক্রান্ত একটি বাচ্চার পিছনে খরচ কত সে সম্পর্কে ইদানিং কোন স্টাডি বা রিসার্চ হয়নি। প্রতিটি থ্যালাসেমিয়া বাচ্চাকে মাসে ন্যূনতম দুই ব্যাগ রক্ত দিতে হয় সেই সময় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ তাদের একটা ভালো পরিমাণ খরচ হয়। এরপর প্রতি মাসে ২ বার রক্ত দেবার কারণে বাচ্চার শরীরে আয়রন জমা হতে থাকে এই আয়রনকে বের করে ফেলার জন্য আলাদা করে ওষুধ প্রয়োজন হয় যা আয়রন চিলেটিং এজেন্ট নামে পরিচিত। একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল খুব ভাগ্যবান বাচ্চা কপালে এটা জোটে। যাদের জোটে না তাদের স্প্লীন ধীরে ধীরে এত বড় হয়ে যায় যে বাচ্চাগুলার নিঃশ্বাস নিতে অনেক কষ্ট হয়। এই বাচ্চা গুলো ১০-১২ বছরের ভিতরেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে।

চিকিৎসা বলতে এটাই। বোন মারো ট্রানস্প্লান্ট এর মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া বাচ্চারা সুস্থ হতে পারে তবে এটা খুবই ব্যয়বহুল এবং এই মুহূর্তে বাংলাদেশ এই এলোজেনিক ট্রানস প্লান্ট হচ্ছে না। আশার কথা এটাই যে ঢাকা মেডিকেলে অবস্থিত বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট ইউনিট এর প্রধান অধ্যাপক মহিউদ্দিন খান খান স্যারের আন্তরিক চেষ্টায় এবং সরকারের সহযোগিতা জন্য আগামী ডিসেম্বরের ভিতরেই এলো জেনিক ট্রানস্প্লান্ট শুরু হবে। তবে যেটা করণীয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন ওয়ার্ড এর সাথে একই ভবনে বি এম টি ইউনিট টি সম্পূর্ণ আলাদা একটি ভবনে স্থাপন করা প্রয়োজন কারণ এটা খুবই স্পর্শকাতর একটি সেবা। বিশেষজ্ঞগণ দাবি করেছেন যে আমাদের আসলে একটি স্বতন্ত্র হেমাটোলজি ইনস্টিটিউট করা এখন একান্ত জরুরী যেখানে হেমাটোলজি বিভাগ এবং বিএমটি ইউনিট থাকবে।

একই সাথে আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে রিসার্চ খুব কম হয়েছে। এক্ষেত্রেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে এদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের রিসার্চ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যারা থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বেশকিছু রিসার্চ’ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। রিসার্চ প্রতিষ্ঠানটি বায়ো মেডিক্যাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা বি আর এফ নামে পরিচিত। উদ্যোক্তা সহকারি অধ্যাপক মো: সারোয়ার হোসাইন তাদের সাম্প্রতিক একটি রিসার্চ থেকে জানিয়েছেন এদেশের ৭০ ভাগ এর বেশি মানুষ থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে কিছুই জানেনা। স্বাভাবিকভাবেই এই মুহূর্তে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা আইন না করে সচেতনতা মূলক কর্মসূচি গ্রহণ থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া এবং থ্যালাসেমিয়া নিয়ে একটি ন্যাশনাল পলিসি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী বলে অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে তিনি একমত পোষণ করেছেন।

থ্যালাসেমিয়া আমাদের দেশ ও সমাজের জন্য একটি অবহনযোগ্য বোঝা। এদেশের মানুষকে যে পরিমাণ রক্ত দান করা হয় তার ৪০ ভাগ রক্তই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য ব্যবহার হয়। এমনিতেই আমাদের দেশে রক্ত পাওয়া এক কঠিন সংগ্রামের বিষয়। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন সচেতনতা সৃষ্টির জন্য যে প্রচারণা তার টার্গেট হচ্ছে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ, মসজিদের ইমাম, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। এর পাশাপাশি যে সকল প্রস্তাব তারা দিয়েছেন যে প্রতিটা গর্ভবতী মায়ের থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কি না তা পরীক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে একই সাথে বাবা মা দুই জনেই যদি দেখা যায় যে ত্রুটিপূর্ণ থ্যালাসেমিয়া জিনের বাহক তবে প্রিনেটাল রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে গর্ভস্থ ভ্রুণ থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে বেড়ে উঠছে কিনা। যদি এমনটা দেখা যায় তখন ন্যাশনাল পলিসিতে যেমনটা থাকবে তেমনটাই করতে হবে।

লেখক: চিকিৎসক, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

Leave a comment

আরও খবর

  • সংসদ নির্বাচনে পরিবর্তন চাই
  • বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা আইন ও আমাদের ভাবনা
  • কলঙ্কের কালোরাত: ৩রা নভেম্বর জেল হত্যা দিবস
  • জীবন বাঁচাবার জন্য ডাক্তার হবার প্রয়োজন নেই
  • ‘শেখ হাসিনা’ উন্নয়নশীল বিশ্বের রোল মডেল হওয়ার রহস্য
  • চেইঞ্জ মেকার মেয়রকে নগর ভবনে স্বাগতম
  • দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সত্যায়ন
  • সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড
  • বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক বন্ধন ও আজকের বাঙালির জন্য পথনির্দেশ
  • ‘মেসে থাকি তো একটু সাশ্রয়ী হতেই হয়’
  • হৃদয়বিদারক শোকের দিন আজ
  • প্রিয় দেশবাসী…
  • বামরা শ্রমিক স্বার্থের কথা বলছে না কেন?
  • বন্ধুত্ব স্বার্থহীন ভালোবাসার এক সুদৃঢ় বন্ধন
  • অভিনন্দন নবনির্বাচিত নগর পিতা এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন


  • উপরে